প্রকাশিত :  ০৬:২৬
২৯ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৩:৫৪
২৯ মে ২০২৬

বোবা পরান

বোবা পরান
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদআগলঝাড়া গ্রামের পূর্ব আকাশে তখনও ভোরের আলো ফোটেনি। কুয়াশার একটি পাতলা, ভেজা চাদর লেপ্টে আছে ধানের জমির আইলে। বাতাসে শিউলি ফুল আর ভেজা মাটির চেনা সোঁদা গন্ধ। কাঁধে জীর্ণ লাঙল-জোয়াল নিয়ে মাঠের দিকে রওনা হয় প্রান্তিক কৃষক আলী হোসেন। গ্রামীণ জীবনের এই একঘেয়ে টানাপোড়েনে তার কোনো আকাশছোঁয়া স্বপ্ন নেই—আছে শুধু দুবেলা দুমুঠো ডাল-ভাতের ন্যূনতম নিশ্চয়তা। এই অভাবের সংসারে পশুপালনই ছিল তাদের একমাত্র ভরসা; চরম সংকটের দিনে যা হয়ে ওঠে এক টুকরো নগদ সম্বল। তবে চার বছর আগের এক শ্রাবণ রাতে আলী হোসেনের এই স্থবির জীবনে একটি নতুন স্পন্দন জেগেছিল।সেদিন ছিল নিশ্ছিদ্র অমাবস্যা। জীর্ণ টিনের চালে ঝুম বৃষ্টি পড়ছিল। গোয়ালঘরের বুড়ো গাভীটি শেষবারের মতো একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে এক ফুটফুটে বাছুর জন্ম দিয়েই চিরতরে চোখ বুজল। লণ্ঠনের ম্লান আলোয় আলী হোসেন দেখল—কুচকুচে কালো, কপালে একটি ত্রিকোণ সাদা তিলক নিয়ে এক অবোধ জীব এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে এসে কাঁপছে।মায়ের দুধ ছাড়া এই সদ্যোজাত বাছুরটি বাঁচবে না—সবাই এটাই ধরে নিয়েছিল। কিন্তু আলী হোসেন সেদিন এক অদ্ভুত জেদ ধরে বসল। নিজের একমাত্র ছেঁড়া কাঁথাটি দিয়ে সে বাছুরটার গা মুছে দিল। নিজের ঘরের চাল দিয়ে বর্ষার জল টপটপ করে পড়ছিল, সেদিকে খেয়াল না করে সে গোয়ালঘরের খড়ের ছাউনি মেরামত করতে লাগল।স্ত্রী মরিয়ম খাতুন তখন কুপি জ্বালিয়ে উনুনের ধোঁয়াটে অন্ধকারে বিরক্তির সুরে বলেছিল, “মানুষ নিজের ছাওয়ালের (সন্তানের) জন্য এত করে না, হোসেনের বাপ! মা-মরা বাছুর, বাঁচবে না।”আলী হোসেন বাছুরটিকে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে ফিডারে দুধ গুঁজে দিতে দিতে বলেছিল, “মানুষের ছাওয়াল বড় হয়ে ভুলে যায়, বউ। কিন্তু এই বোবা জীব বেইমানি চেনে না। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে দেখ, কেমন করে আমাকে খুঁজছে। আজ থেকে ও আমার ঘরের পরান।”শরৎচন্দ্রের ‘মহেশ’ গল্পের গফুর মিয়া যেভাবে জমিদারের নিষ্ঠুর শোষণের মুখেও তার সন্তানসম ষাঁড়টিকে আগলে রেখেছিল, আলী হোসেনের বুকেও যেন সেই একই আদিম মমতার জন্ম হয়েছিল। তফাত শুধু এতটুকুই—গফুর নিয়তির কাছে হেরে মহেশকে হারিয়েছিল, কিন্তু আলী হোসেনের পরম যত্নে এই বাছুরটি দিনে দিনে ডালপালা মেলার মতো বাড়তে লাগল।আলী হোসেন ভালোবেসে ওর নাম রাখল ‘পঙ্খিরাজ’। মাঠ থেকে ফেরার সময় দূর থেকে পঙ্খিরাজ তার গায়ের গন্ধ পেয়ে এমন এক আকুল ডাক ছাড়ত আর কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকত, মনে হতো যেন ডানা মেলে এখনই উড়ে আসবে তার মালিকের কাছে।আলী হোসেন প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া না জানলেও পঙ্খিরাজের যত্নে কোনো কমতি রাখেনি। সরকারি পশু হাসপাতালের ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মেনে নিয়ম করে কৃমির ওষুধ খাওয়াত; খড়ের সঙ্গে চিটাগুড় আর সামান্য ইউরিয়া মিশিয়ে এক বিশেষ পুষ্টিকর খাবার তৈরি করত। কোনো কৃত্রিম ইনজেকশন নয়, বরং এই দেশীয় ও ঘরোয়া পরিচর্যাতেই পঙ্খিরাজের শরীর ফেঁপে ফেঁপে উঠতে লাগল। কুচকুচে কালো গায়ের চামড়া যেন রোদে চকচক করত। শিং দুটো বড় হতেই নিয়ম মেনে গ্রামের অভিজ্ঞ এক পশুচিকিৎসকের মাধ্যমে অণ্ডকোষ কেটে তাকে বলদ বানিয়ে দেওয়া হলো। কিন্তু তার তেজ কমল না, চলন-বলন রয়ে গেল রাজার মতোই।কিন্তু দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাত একদিন আলী হোসেনের সংসারেও নেমে এল। বড় মেয়ের বিয়ের যৌতুক দিতে গিয়ে বসতভিটা বন্ধক রাখতে হলো সুদখোর মহাজন কুদ্দুস মিয়ার কাছে। তার পরের বছর খরায় সব ফসল পুড়ে ছাই হয়ে গেল। মহাজনের সুদের টাকা শোধ করতে না পারায় পেয়াদারা এসে রোজ দরজায় দাঁড়িয়ে গালিগালাজ করতে শুরু করল। এমনই এক চরম সংকটের মুহূর্তে, এক নিভৃত রাতে মরিয়ম খাতুনের চোখের জলের দিকে তাকিয়ে আলী হোসেন তার হৃদয়ের টুকরো পঙ্খিরাজকে কোরবানির হাটে বিক্রি করার নিষ্ঠুর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়।ঈদের মাত্র কয়েক দিন বাকি থাকতে আলী হোসেন পঙ্খিরাজকে নিয়ে গেল দিনাজপুরের বিখ্যাত ‘আমবাড়ি গরুর হাটে’। হাটে পা রাখতেই আলী হোসেনের বুকটা কেঁপে উঠল। চারদিকে দালাল আর মধ্যস্বত্বভোগীদের চিৎকার। তারা সিন্ডিকেট করে পঙ্খিরাজের মতো রাজকীয় বলদের খুঁত ধরে সস্তায় হাতিয়ে নেওয়ার ধান্দা করছিল। দেড়-পৌনে দুই লাখ টাকার গরুর দাম তারা মাত্র আশি-নব্বই হাজারে নামিয়ে আনার অপচেষ্টা করছিল।এমন সময় দুপুরের প্রখর রোদে ঢাকা থেকে আসা এক খামারি পঙ্খিরাজের সামনে এসে দাঁড়ালেন। অভিজ্ঞ ক্রেতা হিসেবে তিনি পঙ্খিরাজের দাঁত দেখে নিশ্চিত হলেন—তার দুটো স্থায়ী দাঁত উঠেছে; অর্থাৎ বয়স দুই বছর পার হয়েছে, কোরবানির জন্য একদম উপযুক্ত। অভিজ্ঞ চোখে পঙ্খিরাজের বুকের বেড় আর দৈর্ঘ্য মেপে তিনি মনে মনে হিসাব কষে নিলেন, এই গরুর জীবন্ত ওজন অন্তত সাড়ে পাঁচশ কেজি, যা থেকে প্রায় তিনশ কেজির ওপর নিরেট মাংস পাওয়া যাবে। হাটের কসাইরা যেখানে ওজনে ঠকানোর জন্য কম মাংসের অজুহাত দিচ্ছিল, এই শহরের ভদ্রলোক তা করলেন না। তিনি পঙ্খিরাজের ন্যায্য মূল্য হাঁকলেন—দেড় লাখ টাকা। আলী হোসেন বুকভাঙা কষ্ট চেপে এই দামেই রাজি হলো।দাম চূড়ান্ত হওয়ার পর ক্রেতা তাঁর ব্যাগ থেকে ১০০০ টাকার কড়কড়ে নোটের দেড়টি বান্ডিল বের করে আলী হোসেনের হাতে দিলেন। পশুর হাটের এই ভিড়ে জাল নোটের কারবার খুব সাধারণ। আলী হোসেন কাঁপা কাঁপা হাতে নোটগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। সে দেখল, নোটের কাগজটি তুলামিশ্রিত ও বেশ খসখসে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি আর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের বিন্দুর ওপর হাত বোলাতেই উঁচু-নিচু ছোঁয়া পাওয়া গেল। আলোর বিপরীতে ধরতেই বাঘের মাথার নিখুঁত জলছাপ আর হলোগ্রাফিক সুতার সোনালি থেকে সবুজ হয়ে ওঠার খেলা দেখে সে নিশ্চিত হলো—টাকাগুলো সব আসল।লেনদেন শেষ করে ক্রেতা যখন হাসিল দিতে যাবেন, ঠিক তখনই ইজারাদারের কতিপয় চ্যালাচামুণ্ডা এসে আলী হোসেনকে ঘিরে ধরল। ‘খুঁটি খালাস’ আর অবৈধ চাঁদার দাবিতে তারা আলী হোসেনের জামার কলার চেপে ধরল। ঠিক তখনই ঘটল সেই অভাবনীয় ঘটনা। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শান্ত পঙ্খিরাজ হঠাৎ এক অভূতপূর্ব হুঙ্কার দিয়ে উঠল। সে তার পেছনের পা ছুঁড়ে আলী হোসেনের দিকে ধেয়ে আসা লোকগুলোকে ছিটকে ফেলে দিল।পঙ্খিরাজের এই অসীম বিশ্বস্ততা দেখে আলী হোসেনের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠল। তার মনে হলো, যে বোবা প্রাণীটি নিজের জীবন বাজি রেখে তার মালিককে রক্ষা করতে চায়, তাকে দেড় লাখ টাকার বিনিময়ে কসাইয়ের ছুরির নিচে ঠেলে দেওয়া এক জঘন্য অপরাধ। আলী হোসেনের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সে ক্রেতার দেড় লাখ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “বাবা, মাফ করবেন। আমি আমার জান বিক্রি করতে পারব না। পঙ্খিরাজ কোনো পণ্য না, ও আমার ঘরের পরান।”দালালদের উপহাস আর ক্রেতার বিস্ময় অগ্রাহ্য করে আলী হোসেন পঙ্খিরাজের গলার দড়িটি শক্ত করে ধরে আবার নিজের গ্রামের পথ ধরল।কিন্তু গ্রামে ফেরার পর আলী হোসেনের জীবনে নেমে এল তীব্র সামাজিক বিপর্যয়। মহাজন তার ঘরবাড়ি ক্রোকের চূড়ান্ত নোটিশ জারি করল। গ্রাম্য সমাজ তাকে অবাধ্য ও কাণ্ডজ্ঞানহীন বলে টিটকারি মারতে শুরু করল। এমতাবস্থায় মরিয়ম খাতুন ফিসফিস করে বলল, “ঈদের দিন সকালে যখন গাঁয়ের লোক কোরবানি দেবে, আমরা তখন ঘরের কোণে বসে কাঁদব, হোসেনের বাপ? তুমি বরং আল্লাহর রাস্তায় পঙ্খিরাজকে কোরবানি দেওয়ার নিয়ত করো। আমাদের জমি তো যাবেই, অন্তত আখেরাতটা বাঁচুক।”আলী হোসেন নিরুপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত নিয়ত করে ফেলল—হ্যাঁ, লোকদেখানো হাটের পণ্য না বানিয়ে সে পঙ্খিরাজকে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিজের ঘরের আঙিনায় উৎসর্গ করবে।অবশেষে সেই অবরুদ্ধ সকাল নেমে এল। ঈদের নামাজ শেষ করে গ্রামের পুরুষেরা জড়ো হলো আলী হোসেনের উঠানে। কসাই শামসু তার ধারালো চওড়া ছুরি নিয়ে প্রস্তুত। উঠানের মাঝখানে খড় বিছানো হয়েছে, যেখানে পঙ্খিরাজের রক্ত ঝরবে।আলী হোসেন নিজে গিয়ে পঙ্খিরাজের গলার দড়িটি ধরল। পঙ্খিরাজ খুব শান্তভাবে পা বাড়িয়ে উঠানে এল। সে ভাবছিল, হয়তো তাকে মাঠের কাজে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু যখন সে দেখল চারদিকে অনেক মানুষ, সবার চোখে এক অদ্ভুত, নিষ্ঠুর কৌতূহল, আর বাতাসে একটা চেনা রক্তের গন্ধ—তখন সে চমকে উঠল। সে পেছনের পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল।“ধরো ধরো! শক্ত করে দড়ি ধরো!” চারপাশ থেকে চিৎকার উঠল।কয়েকজন জোয়ান ছেলে এসে পঙ্খিরাজের পাগুলো দড়ি দিয়ে বাঁধতে শুরু করল। পঙ্খিরাজ এবার প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেল। সে কাত হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। তার বিশাল শরীরটা ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। সে ছটফট করতে লাগল, তার চোখ দুটো উন্মত্তের মতো চারদিকে খুঁজতে লাগল—কোথায় তার আলী হোসেন? কে তাকে এই নরক থেকে বাঁচাবে?আলী হোসেন পঙ্খিরাজের মাথার কাছে হাঁটু গেড়ে বসল। সে পঙ্খিরাজের চোখের ওপর নিজের কাঁপতে থাকা হাতটি রাখল। আলী হোসেনের চোখের পানি তখন বাঁধ ভেঙে নেমেছে, তার বুক চিরে কান্না বেরিয়ে আসছে।“আমাকে মাফ করে দিস, বাপ... আমাকে মাফ করে দিস! আমি লাচার... সংসার বাঁচাতে, আল্লাহর হুকুম তামিল করতে এটা করতেই হচ্ছে...”ঠিক সেই মুহূর্তে, চারপাশের সব কোলাহল যেন আলী হোসেনের কান থেকে হারিয়ে গেল। বাতাস স্তব্ধ হয়ে গেল। কসাইয়ের ছুরির ঝিলিক, মানুষের চিৎকার—সবকিছু এক অলৌকিক নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। আলী হোসেন দেখল, পঙ্খিরাজ আর ছটফট করছে না। সে তার মাথাটি স্থির করেছে। তার সেই বিশাল, কাজল-কালো চোখ দুটি সরাসরি আলী হোসেনের চোখের ভেতর প্রবেশ করেছে।পঙ্খিরাজ বোবা প্রাণী, প্রকৃতি তাকে মানুষের মতো ভাষা দেয়নি। কিন্তু সেই মুহূর্তে, হৃদয়ের তীব্রতম যন্ত্রণার এক অলৌকিক তরঙ্গে, পঙ্খিরাজের সেই অবোধ চাহনি আলী হোসেনের আত্মার গভীরে এক অমোঘ, স্পষ্ট ভাষায় কথা বলে উঠল। আলী হোসেনের মনে হলো, পঙ্খিরাজ মুখ ফুটে বলছে না, কিন্তু তার চোখ থেকে প্রতিটি শব্দ তীরের মতো এসে বিঁধছে তার হৃৎপিণ্ডে—“তুমি কাঁদছ কেন, আলী হোসেন? এই কান্নার অভিনয় কার জন্য? আজ চার বছর ধরে তুমি আমাকে যে আদর দিয়েছ, যে ভালোবাসা দেখিয়েছ, তা কি তবে কেবলই একটা ছলনা ছিল? তোমাদের এই মানবসমাজে আমাদের মতো বোবা প্রাণীদের জীবনের কি কোনো মূল্যই নেই? তোমরা নিজেদের সৃষ্টির সেরা জীব বলো, কিন্তু আসলে তোমরা এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রাক্ষস! তোমরা আমাদের ভালোবাসার নাটক করো, আমাদের নিঃশর্ত বিশ্বাসকে পুঁজি করো; তারপর ধর্মের নামে, উৎসবের নামে আমাদেরই জবাই করে, আনন্দ-উল্লাস করে রান্না করে খাও। আমাদের রক্তে তোমাদের উৎসবের আঙিনা রাঙিয়ে তোলো!কোরবানির আসল অর্থ তো পশুর গলায় ছুরি চালানো নয়, আলী হোসেন; কোরবানির অর্থ হলো নিজের ভেতরের রাগ, হিংসা, লোভ, লালসা আর সমস্ত অসৎ কাজকে চিরতরে জবাই করা। নিজের ভেতরের সেই কুৎসিত পশুত্বকে হত্যা করে সত্যের পথে অবিচল থাকাই তো আসল কোরবানি। কিন্তু তোমরা তা করো না। তোমরা নিজের ভেতরের লোভ ও হিংসার পশুটিকে নিশ্চিন্তে বাঁচিয়ে রাখো, আর আমাদের মতো একটা নিরীহ পশুকে হত্যা করে ভাবো তোমরা স্বর্গের টিকিট পেয়ে গেছ!”“ওহে আলী হোসেন! কী ভাবছ দাঁড়িয়ে? কসাই এসে পড়েছে, সময় পার হয়ে যাচ্ছে!”মাতব্বরের কর্কশ আওয়াজে আলী হোসেনের ভ্রম ভাঙল। চারপাশের শব্দগুলো আবার বাস্তব হয়ে ফিরে এল। সে দেখল, কসাই ছুরিটি পঙ্খিরাজের গলার কাছে ধরেছে। পঙ্খিরাজ তখনও শান্ত চোখে আলী হোসেনের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সে বলছে—‘নাও, তোমার উৎসবের আয়োজন সম্পূর্ণ করো। বেইমান মানুষের এই বধ্যভূমিতে আমার বিশ্বাসের ইতি ঘটুক।’আলী হোসেনের হাত-পা কাঁপতে লাগল। তার বুকের ভেতর একটা তীব্র ওলটপালট হয়ে গেল। যে ছুরিটি পঙ্খিরাজের গলায় চলার কথা ছিল, সেই ছুরিটি যেন এতক্ষণ তার নিজের বিবেকের ওপর চলেছে। সে বুঝতে পারল, এত বছর ধরে পঙ্খিরাজকে সে যে ভালোবেসেছে, তা যদি আজ এই ছুরির নিচে শেষ হয়ে যায়, তবে তার নিজের মনুষ্যত্বই চিরতরে মরে যাবে। লোকদেখানো কোরবানি আর পশুর রক্ত দিয়ে কখনো পরম করুণাময়ের নৈকট্য লাভ করা যায় না, যদি না মনের ভেতরের লোভ ও অহংকারকে বিসর্জন দেওয়া যায়।“থামো! ছুরি চালাবে না!”আলী হোসেন আচমকা এক বাঘের মতো গর্জন করে উঠল। সে কসাইয়ের হাত থেকে ছুরিটি কেড়ে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল।সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। কসাই হাঁ করে তাকিয়ে রইল। ধর্মীয় অনুশাসনের দোহাই দিয়ে মাতব্বর সাহেব চেঁচিয়ে উঠলেন, “কী বলো মিয়া, পাগল হয়েছ? নিয়ত করেছ, এখন কোরবানি না দিলে গুনাহ হবে! সমাজের লোক কী বলবে?”আলী হোসেন পঙ্খিরাজের পায়ের বাঁধনগুলো নিজের হাতে পাগলের মতো খুলতে লাগল। বাঁধনমুক্ত হতেই পঙ্খিরাজ ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে আলী হোসেনের গা ঘেঁষে দাঁড়াল, যেন এক অজেয় দুর্গ।আলী হোসেন সবার দিকে তাকিয়ে অশ্রুভেজা চোখে, কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় কণ্ঠে বলল, “সমাজ কী বলবে, তা দিয়ে আমার বিচার হবে না, মাতব্বর সাহেব। আমার আল্লাহ অন্তর দেখেন। পবিত্র কুরআনে পরিষ্কার বলা আছে—আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এগুলোর গোশত এবং রক্ত; বরং পৌঁছায় তোমাদের তাকওয়া—মনের পবিত্রতা। আমি যদি আমার ভেতরের লোভ, মহাজনের টাকার ভয় আর সামাজিক অহংকারকে কোরবানি দিতে না পারি, তবে এই নিষ্পাপ জীবটাকে হত্যা করে কোনো সওয়াব নেই। আমার আসল কোরবানি আজ হয়ে গেছে। আমি আমার ভেতরের ভয় ও স্বার্থপরতার পশুটিকে জবাই করছি। আজ থেকে পঙ্খিরাজ মুক্ত। ও আমার ঘরেই থাকবে, আমার সন্তানের মতো।”আগলঝাড়া গ্রামের মানুষগুলো ক্ষোভে, বিস্ময়ে ফিসফিস করতে করতে একে একে চলে গেল। কেউ তাকে পাগল বলল, কেউ বলল কাফের। কিন্তু আলী হোসেনের সেদিকে কোনো ভ্রূক্ষেপ ছিল না। সে পঙ্খিরাজের বিশাল গলার নিচে নিজের মুখটি লুকাল। এবার আর পঙ্খিরাজের চোখে কোনো আর্তনাদ ছিল না, ছিল এক বুক গভীর কৃতজ্ঞতা, শান্তি আর অনন্ত ভালোবাসা।উৎসবের আলোয় মেতে ওঠা আগলঝাড়া গ্রামের আকাশে তখন ত্যাগের আনন্দের তাকবির বাজছিল, আর এক দরিদ্র কৃষকের আঙিনায়, সমস্ত হিংসা, সামাজিক কুসংস্কার ও মোহকে পরাস্ত করে এক মানবাত্মার সত্যিকারের ‘কোরবানি’ সম্পন্ন হলো—যা কোনো পশুর রক্তে নয়, বরং নিজের ভেতরকার পশুত্বকে বিসর্জন দেওয়ার এক মহান মহাকাব্যে রূপ নিল।

Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর