প্রকাশিত :  ০৬:৪৫
২৫ মে ২০২৬

প্রস্তাবিত চুক্তিতে কী আছে, যা থামাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত?

প্রস্তাবিত চুক্তিতে কী আছে, যা থামাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত?

দীর্ঘ তিন মাস ধরে চলা সামরিক উত্তেজনা, হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার পর অবশেষে আলোচনার টেবিলে কিছুটা কাছাকাছি এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান। উভয় পক্ষ এখন একটি ‘মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ (এমওইউ) বা সমঝোতা স্মারকের খসড়া নিয়ে আলোচনা করছে, যা কার্যকর হলে সাম্প্রতিক সংঘাতের স্থায়ী অবসানের পথ তৈরি হতে পারে।

তবে এই চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। তারপরও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এই খসড়াই হতে পারে যুদ্ধ থেকে আলোচনায় ফেরার সবচেয়ে বড় ভিত্তি।

যুদ্ধ থামানোর মূল লক্ষ্য

সম্ভাব্য সমঝোতার কেন্দ্রীয় উদ্দেশ্য হলো চলমান যুদ্ধ ও পাল্টাপাল্টি হামলার স্থায়ী ইতি টানা। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে দুই দেশই চাপে পড়বে- একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের চাপ মোকাবিলা করছেন, অন্যদিকে ইরানের অর্থনীতি নিষেধাজ্ঞা ও যুদ্ধের ধাক্কায় বিপর্যস্ত। এই বাস্তবতায় উভয় পক্ষই আপাতত ‘পূর্ণাঙ্গ সমাধান’ নয়, বরং সংঘাত নিয়ন্ত্রণে একটি অন্তর্বর্তী সমঝোতায় আগ্রহী বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার রূপরেখা

সমঝোতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় স্বাভাবিক করা। বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ যুদ্ধের সময় কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে বৈশ্বিক তেলের বাজারে বড় ধাক্কা লাগে।

চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, ধাপে ধাপে প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হতে পারে। একই সঙ্গে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নৌ অবরোধ শিথিলের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। তবে এখানেই সবচেয়ে বড় টানাপোড়েন। ইরান চাইছে অবরোধ আগে উঠুক, আর যুক্তরাষ্ট্র বলছে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি স্বাক্ষরের আগে অবরোধ পুরোপুরি প্রত্যাহার হবে না।

যদিও সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, চুক্তির অংশ হিসেবে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হবে। তবে ইরানি গণমাধ্যম বলছে, প্রণালিটি পুরোপুরি আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে যাচ্ছে না; বরং ইরানের তত্ত্বাবধান বজায় রেখেই ধাপে ধাপে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা হবে।

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আপসের চেষ্টা

চুক্তির আরেকটি বড় বিষয় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান যেন উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদন বন্ধ করে এবং পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা থেকে সরে আসে।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, ইরান নতুন করে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত এবং বিদ্যমান মজুত নিয়ে আলোচনায় রাজি হয়েছে। তবে তেহরান বলছে, যুদ্ধের অবসান নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা পারমাণবিক ইস্যুতে কোনো চূড়ান্ত প্রতিশ্রুতি দেবে না।

এদিকে ইরানের আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, খসড়ায় এখনো ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর, স্থাপনা বন্ধ বা পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর অঙ্গীকারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।

ফলে খসড়ায় আপাতত পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ না করার নীতিগত অবস্থান থাকলেও ইউরেনিয়াম মজুত কোথায় যাবে বা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

জব্দ সম্পদ ও নিষেধাজ্ঞা

দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় বিপর্যস্ত ইরান বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ফেরত চায়। তেহরান মনে করছে, অর্থনৈতিক স্বস্তি ছাড়া কোনো সমঝোতা টেকসই হবে না।

ইরান চাইছে, চুক্তির প্রথম ধাপেই অন্তত কিছু অর্থ ছাড় করা হোক। তবে মার্কিন প্রশাসন ইঙ্গিত দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি সচল হওয়ার পরই এ বিষয়ে অগ্রগতি হতে পারে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেছেন, আলোচনার শুরুতেই জব্দ সম্পদের বিষয়টি স্পষ্ট করতে হবে। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সম্পদের একটি অংশ অবিলম্বে মুক্ত না করলে কোনো সমঝোতা হবে না।

তবে মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি চালু হওয়ার পরই ইরানি সম্পদ ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

এদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের আরোপিত বিস্তৃত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেশটির অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। ইরান চাইছে, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে এসব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার রূপরেখা নির্ধারণ করা হোক।

তবে ইরানের পক্ষ থেকেই বলা হয়েছে, স্বল্পমেয়াদি এই সমঝোতায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিস্তারিত চূড়ান্ত হবে না। বরং পূর্ণাঙ্গ আলোচনার পর বিষয়টি নির্ধারিত হবে।

ইরানের হিসাব অনুযায়ী, শুধু তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে দুই মাসে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার আয় সম্ভব।

ক্ষেপণাস্ত্র ও আঞ্চলিক সংঘাত

ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোর বিষয়টি এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত হয়নি। বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে ঘিরে ইসরায়েল ও ইরানের দ্বন্দ্ব ভবিষ্যতে আবারও উত্তেজনা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদিও ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেছেন যে, লেবাননসহ যেকোনো ফ্রন্টে ‘নিরাপত্তা হুমকি’ মোকাবিলায় ইসরায়েল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

তবে আলোচনায় জড়িত কূটনীতিকেরা বলছেন, আপাতত মূল লক্ষ্য যুদ্ধ বন্ধ রাখা এবং মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সংঘাত ঠেকানো।

সব মিলিয়ে প্রস্তাবিত সমঝোতা চুক্তি এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। কিন্তু কয়েক মাসের সংঘাতের পর প্রথমবারের মতো দুই পক্ষ এমন এক অবস্থানে এসেছে, যেখানে যুদ্ধের বদলে সমঝোতার সম্ভাবনা দৃশ্যমান।

এখন নজর মূলত দুই প্রশ্নে- ইরান কতটা ছাড় দিতে প্রস্তুত, আর যুক্তরাষ্ট্র কতটা অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সুবিধা দিতে রাজি হয়। এই সমীকরণের ওপরই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংকট নাকি আপাত শান্তির সূচনা।

সূত্র: সিএনএন



Leave Your Comments




মত-বিশ্লেষণ এর আরও খবর