প্রকাশিত :  ১৮:৪০
২১ মে ২০২৬

হৃদপিণ্ডের নাম রামিসা

হৃদপিণ্ডের নাম রামিসা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

​ঢাকার এই শহরে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ হারিয়ে যায়—কেউ ভিড়ের মধ্যে, কেউ জীবনের চাপে, কেউবা নৈতিকতার অন্ধকারে। কিন্তু কিছু মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকে শোকাহত করে না, পুরো সমাজের বিবেককে কাঁপিয়ে দেয়। ছোট্ট রামিসার মৃত্যু তেমনই এক নির্মম আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের মুখ দেখতে বাধ্য হচ্ছি।

​একজন দিনমজুর বাবা, যাঁর পায়ের স্যান্ডেলটি তিন বছরের পুরোনো। ছিঁড়ে গেলে ফেলে দেননি, সুতো দিয়ে সেলাই করেছেন। কারণ নতুন স্যান্ডেল কেনার অর্থ ছিল মেয়ের মুখের হাসি থেকে কিছু টাকা কমে যাওয়া। এই মানুষটির নাম আবদুল হান্নান মোল্লা। তিনি হয়তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষা জানেন না, অর্থনীতির জটিল পরিভাষাও বোঝেন না; কিন্তু সন্তানের জন্য ত্যাগ কাকে বলে, তা তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন।

​দারিদ্র্য মানুষকে অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করে, কিন্তু সব দরিদ্র মানুষ হৃদয়ে দরিদ্র হন না। হান্নান মোল্লার ঘরে হয়তো অভাব ছিল, কিন্তু ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। তাঁর ছোট মেয়ে রামিসা একদিন বোরকা চাইলে তিনি সস্তা কাপড়ের বোরকা কিনে দায়িত্ব শেষ করেননি। নিজের কষ্টের এক হাজার টাকা খরচ করে মেয়ের জন্য সুন্দর একটি বোরকা কিনেছিলেন। কারণ সন্তানের ছোট্ট ইচ্ছেকেও তিনি উৎসব মনে করতেন। যে বাবা নিজের জন্য নতুন জুতো কেনেন না, সেই বাবা মেয়ের মুখে লিচু তুলে দিতে দ্বিধা করেন না।

​এই শহরে এমন বাবারা এখনো আছেন বলেই পৃথিবী পুরোপুরি নিষ্ঠুর হয়ে যায়নি।

​কিন্তু সেই পৃথিবীতেই রামিসার মতো একটি শিশু পাশের ফ্ল্যাটেও নিরাপদ ছিল না।

​একটি শহরের সবচেয়ে ভয়ংকর সংকট তখনই তৈরি হয়, যখন মানুষ অপরিচিত নয়, বরং পরিচিত মানুষের কাছেই অনিরাপদ হয়ে পড়ে। পল্লবীর একটি ভাড়াটিয়া বাসায় যা ঘটেছে, তা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; এটি নগর সভ্যতার মুখে এক ভয়াবহ চপেটাঘাত। একই ভবনে পাশাপাশি বসবাস করা মানুষগুলো একে অন্যের নাম জানে, কিন্তু মন জানে না। দেয়ালের দূরত্ব কমেছে, মানুষের দূরত্ব বেড়েছে।

​রামিসার মা দরজার সামনে মেয়ের এক পাটি জুতো দেখে সন্দেহ করেছিলেন। একটি ছোট্ট জুতো—কিন্তু সেই জুতোর পাশে দাঁড়িয়ে হয়তো তখন পুরো মানবতাই কাঁপছিল। পরে যখন খাটের নিচ থেকে শিশুটির নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, গোটা সমাজের বিবেক রক্তাক্ত হয়ে পড়ে।

​সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় বাবার সেই বাক্যটি—“আমি বিচার চাই না, আপনারা বিচার করতে পারবেন না।”

​এই একটি বাক্যে বাংলাদেশের বহু বছরের বিচারহীনতার ইতিহাস লুকিয়ে আছে। সাধারণ মানুষ আদালতের ভাষা বোঝে না, কিন্তু তারা সময় বোঝে। তারা দেখে, অনেক অপরাধ আলোচনার ঝড় তোলে, তারপর ধীরে ধীরে সংবাদপত্রের ভাঁজে হারিয়ে যায়। বিচার বিলম্বিত হয়, সাক্ষ্য দুর্বল হয়, মানুষের স্মৃতি ফিকে হয়। তাই একজন শোকাহত পিতা যখন বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারান, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত হতাশা নয়; সেটি রাষ্ট্রের জন্য গভীর আত্মসমালোচনার মুহূর্ত।

​আমরা উন্নয়নের গল্প বলি। উড়ালসড়ক বানাই, মেট্রোরেল চালাই, অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়ে গর্ব করি। কিন্তু একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে সেই উন্নয়ন কতটা পূর্ণ? সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড তো মাথাপিছু আয় নয়, শিশুদের নিরাপত্তা।

​আজকের নগরজীবনে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে পরিচিত পরিবেশেই। প্রতিবেশী, আত্মীয়, পরিচিত মুখ—এই বৃত্তের ভেতরেই ভয় লুকিয়ে থাকে। অথচ আমাদের সামাজিক কাঠামো এখনো শিশু সুরক্ষার মৌলিক শিক্ষায় ভয়াবহভাবে পিছিয়ে। অধিকাংশ পরিবার এখনো সন্তানকে শেখায় না কোন স্পর্শ নিরাপদ, কোন আচরণ বিপজ্জনক। আমরা শিশুদের পরীক্ষার প্রস্তুতি শেখাই, কিন্তু আত্মরক্ষার ভাষা শেখাই না।

​এই ট্র্যাজেডি তাই শুধু কান্নার নয়, সতর্ক হওয়ারও সময়।

​ভাড়াটিয়া যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর করা জরুরি। প্রতিটি আবাসিক ভবনে সিসিটিভি ও কমিউনিটি নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করা, যেন তারা ভয় বা অস্বস্তির কথা সহজে বলতে পারে। কারণ অনেক অপরাধ শুরু হওয়ার আগেই থামানো সম্ভব, যদি শিশুটি নিরাপদে কথা বলার সাহস পায়।

​তবে আইন, প্রযুক্তি কিংবা নজরদারির বাইরেও আরেকটি জিনিস সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—মানবিকতা।

​রামিসার bloody (রক্তাক্ত) বোরকা আর তার বাবার ছেঁড়া স্যান্ডেল আজ বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার দুই প্রতীক। একদিকে সীমাহীন পিতৃস্নেহ, অন্যদিকে সীমাহীন নৈতিক অবক্ষয়। এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমরা আসলে নিজেদেরই বিচার করছি।

​হান্নান মোল্লা হয়তো আজও মেয়ের ছবিগুলো দেখতে পারেন না। কারণ প্রতিটি ছবি তাঁর বুকের ভেতর ছুরি হয়ে বিঁধে। তবু তিনি বলেন, “আল্লাহ দিয়েছিলেন, আল্লাহই নিয়ে গেছেন।” এই বাক্যে শুধু ধর্মীয় বিশ্বাস নেই; আছে অসহায় মানুষের নীরব আত্মসমর্পণ।

​সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা তখনই ঘটে, যখন একজন দরিদ্র বাবা তাঁর সন্তানের জন্য পৃথিবীকে নিরাপদ ভাবতে পারেন না।

​রামিসা আর ফিরবে না। কিন্তু তার ছোট্ট জীবন আমাদের সামনে একটি বিশাল প্রশ্ন রেখে গেছে—আমরা আসলে কেমন সমাজ গড়ে তুলছি?

​যে সমাজে একটি শিশু পাশের ফ্ল্যাটে গিয়েও নিরাপদ নয়, সেই সমাজে উন্নয়নের আলো যত উজ্জ্বলই হোক, ভেতরে ভেতরে অন্ধকার থেকেই যায়।


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর