প্রকাশিত :  ১৬:৪৮
১৭ মে ২০২৬

ব্যারিস্টার সারা হোসেন: মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সাহসী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক

ব্যারিস্টার সারা হোসেন: মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও সাহসী নেতৃত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক

সংগ্রাম দত্ত: বাংলাদেশের আইন ও মানবাধিকার অঙ্গনে ব্যারিস্টার সারা হোসেন এমন এক নাম, যিনি প্রজ্ঞা, মানবিকতা ও সাহসিকতার সমন্বয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ন্যায়বিচারের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে। তিনি শুধু একজন খ্যাতিমান আইনজীবী নন; বরং সমাজের নিপীড়িত, প্রান্তিক ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকারের পক্ষে নির্ভীক কণ্ঠস্বর।

বিশেষ করে নারী অধিকার, মানবাধিকার, সামাজিক ন্যায়বিচার ও আইনি সংস্কারে তাঁর দীর্ঘ সংগ্রাম তাঁকে দেশ-বিদেশে এনে দিয়েছে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুক্তির ভাষায় লড়েছেন, তেমনি মানবিক মূল্যবোধের প্রশ্নে থেকেছেন আপসহীন।

১৯৬৩ সালে এক প্রগতিশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সারা হোসেন। তাঁর পিতা ড. কামাল হোসেন বাংলাদেশের সংবিধানের অন্যতম প্রধান প্রণেতা, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। মাতা হামিদা হোসেন একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী।

পরিবারের এই মূল্যবোধনির্ভর পরিবেশ থেকেই তিনি ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর স্বামী ডেভিড বার্গম্যান একজন ব্রিটিশ সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী, যিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধবিষয়ক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য পরিচিত।

সারা হোসেন যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াধাম কলেজ (Wadham College) থেকে আইনশাস্ত্রে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে অনারেবল সোসাইটি অব মিডল টেম্পল থেকে ‘কল টু দ্য বার’ সম্পন্ন করে ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন।

বাংলাদেশে ফিরে তিনি আইন পেশায় যুক্ত হন। ১৯৯২ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে এবং ২০০৮ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। ২০২১ সালে তিনি দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ‘সিনিয়র অ্যাডভোকেট’ হিসেবে স্বীকৃতি পান।

বর্তমানে তিনি দেশের অন্যতম শীর্ষ আইন প্রতিষ্ঠান ‘ড. কামাল হোসেন অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস’-এর পার্টনার ও ডেপুটি হেড অব চেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ব্যারিস্টার সারা হোসেনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর মানবাধিকারভিত্তিক আইনি সংগ্রাম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)-এর সম্মানসূচক নির্বাহী পরিচালক হিসেবে বিনা পারিশ্রমিকে (Pro bono) কাজ করে যাচ্ছেন।

এ ছাড়া তিনি আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। আন্তর্জাতিক আইন কমিশন (ICJ)-এর কমিশনার হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইন সমিতির (ILA) মানবাধিকার কমিটির সদস্য এবং Women’s Initiatives for Gender Justice-এর উপদেষ্টা কমিটির সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।

নারীর প্রতি সহিংসতা, সংখ্যালঘু অধিকার, পারিবারিক নির্যাতন, পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে প্রশংসিত।

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় ব্যারিস্টার সারা হোসেনের বেশ কিছু অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

গ্রামীণ সমাজে ফতোয়ার নামে নারীদের অমানবিক শাস্তি ও সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াই পরিচালনা করেন। তাঁর এই ভূমিকা নারীর অধিকার রক্ষায় নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।

যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ওপর চালু থাকা অপমানজনক ও অমানবিক ‘টু-ফিঙ্গার টেস্ট’ পদ্ধতি নিষিদ্ধ করার আন্দোলনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এই আইনি বিজয় নারীর মর্যাদা ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়।

২০১০ সালের ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন’-এর খসড়া প্রণয়নে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। এই আইন বাংলাদেশের নারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।

পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করতেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইনের কার্যকর প্রয়োগে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ মানবাধিকার আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন শুধু বাংলাদেশের পরিসরেই সীমাবদ্ধ নন; আন্তর্জাতিক মানবাধিকার অঙ্গনেও তিনি একটি পরিচিত ও সম্মানিত নাম।

জুলাই ২০১৮ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানে ফিলিস্তিনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতি হিসেবে তাঁকে নিয়োগ দেয়। কমিশনের অন্য সদস্য ছিলেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ ডেভিড ক্রেন ও কারি বেটি মুরঙ্গি।

এ ছাড়া জাতিসংঘের বিভিন্ন বিশেষ মিশন, আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন ও নারী অধিকারবিষয়ক বৈশ্বিক উদ্যোগেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

মানবাধিকার ও নারী অধিকার রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৬ সালে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইন্টারন্যাশনাল উইমেন অব কারেজ অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। সেই সময় মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি তাঁর হাতে এই সম্মাননা তুলে দেন।

এ ছাড়া—

২০০৮ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম তাঁকে ‘ইয়ং গ্লোবাল লিডার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

২০০৭ সালে নিউইয়র্কভিত্তিক দ্য এশিয়া সোসাইটি তাঁকে ‘এশিয়া ২১ ফেলো’ নির্বাচিত করে।

২০০৫ সালে মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে অবদানের জন্য তিনি ‘অনন্যা শীর্ষ দশ’ সম্মাননা লাভ করেন।

ব্যারিস্টার সারা হোসেন কেবল আদালতের একজন সফল আইনজীবী নন; তিনি মানবিক সাহস, ন্যায়বোধ ও সামাজিক দায়িত্বশীলতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

যেখানে সমাজে এখনো বৈষম্য, সহিংসতা ও কুসংস্কারের অন্ধকার রয়ে গেছে, সেখানে তিনি দাঁড়িয়েছেন ন্যায়বিচারের আলোকবর্তিকা হয়ে। নিপীড়িত মানুষের পক্ষে তাঁর দৃঢ় অবস্থান এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে আপসহীন মনোভাব তাঁকে বাংলাদেশের আইনি অঙ্গনের এক চিরস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে।

কালো কোটের আড়ালে তিনি ধারণ করেন এক গভীর মানবিক হৃদয়—যা অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর, কিন্তু ন্যায়ের পক্ষে কোমল ও সহমর্মী। তাঁর কর্ম, সংগ্রাম ও আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দীর্ঘদিন অনুপ্রাণিত করবে।



Leave Your Comments




নারী অঙ্গন এর আরও খবর