প্রকাশিত : ১৪:০৯
১৬ মে ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:১২
১৬ মে ২০২৬
বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে এক সংবেদনশীল ও রূপান্তরমুখী সময় অতিক্রম করছে। স্থানীয় অর্থনীতির চাপ, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বিনিয়োগকারীদের মানসিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ১৭ মে ২০২৬, রবিবারের বাজার পরিস্থিতি হতে পারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সপ্তাহের প্রথম কার্যদিবসে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে ১৪ মে’র বাজারচিত্র এবং পরবর্তী দুই দিনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
১৪ মে ডিএসইতে টানা তৃতীয় দিনের মতো সূচকের সামান্য ঊর্ধ্বগতি দেখা গেলেও বাজারে স্থায়ী আস্থার স্পষ্ট সংকেত মেলেনি। দিনশেষে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স দাঁড়ায় ৫,২৪৫.২২ পয়েন্টে, যা আগের দিনের তুলনায় মাত্র ১.৭৯ পয়েন্ট বা ০.০৩ শতাংশ বেশি। দিনের শুরুতে সূচক ৫,২৭৮ পয়েন্ট পর্যন্ত উঠলেও শেষভাগে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ায় বাজার সেই অবস্থান ধরে রাখতে পারেনি। এতে স্পষ্ট হয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের চেয়ে স্বল্পমেয়াদি মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তবে বাজারের বড় উদ্বেগ এখন বৈশ্বিক পরিস্থিতি। শুক্রবার ও শনিবার আন্তর্জাতিক বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব রবিবার বাংলাদেশের বাজারেও সরাসরি পড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পাওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৯ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ায় আমদানি-নির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। নিউইয়র্ক, লন্ডন ও এশিয়ার প্রধান শেয়ার সূচকগুলোতে বড় ধরনের দরপতন হয়েছে।
বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক থেকে বৈশ্বিক বাণিজ্য উত্তেজনা কমানোর মতো ইতিবাচক বার্তা আসবে। কিন্তু প্রত্যাশিত অগ্রগতি না হওয়ায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও এখন বেশ চাপে রয়েছে। এপ্রিল মাসে বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে ৯.০৪ শতাংশে পৌঁছেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে, ফলে বাজারে তারল্য সংকট আরও প্রকট হয়েছে। একই সঙ্গে টাকার অবমূল্যায়ন এবং ডলারের বিপরীতে বিনিময় হার বৃদ্ধির কারণে আমদানিনির্ভর শিল্পগুলো অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে।
এর মধ্যে আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা ফিচ রেটিংস বাংলাদেশের অর্থনৈতিক আউটলুক ‘স্টেবল’ থেকে ‘নেগেটিভ’-এ নামিয়ে আনার সিদ্ধান্ত বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর রেমিট্যান্স প্রবাহ ও জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি এখন অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
তবে সব খাত একই ধরনের চাপের মুখে থাকবে না। ব্যাংকিং খাত তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। কয়েকটি ব্যাংকের প্রথম প্রান্তিকের মুনাফা বৃদ্ধির খবর বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি’র ২৮ শতাংশ নিট মুনাফা বৃদ্ধি এবং ইউনাইটেড ফাইন্যান্স লিমিটেডের আয় বৃদ্ধির তথ্য বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে।
অন্যদিকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। টেক্সটাইল খাতের পরিস্থিতি কিছুটা মিশ্র হতে পারে। টাকার অবমূল্যায়ন রপ্তানিকারকদের জন্য সুবিধাজনক হলেও জ্বালানি ও কাঁচামালের ব্যয় বৃদ্ধিতে মুনাফা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ওষুধ খাতকে এখনো তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের জায়গা হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের মতো মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানির প্রতি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বজায় থাকতে পারে। যদিও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আপাতত সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
এদিকে মিউচুয়াল ফান্ড খাতে নতুন নীতিগত পরিবর্তনও বাজারে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ক্লোজড-এন্ড ফান্ডকে ওপেন-এন্ডে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় দীর্ঘদিন অবমূল্যায়িত ফান্ডগুলোতে নতুন আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
কর্পোরেট ঘটনাপ্রবাহও আগামীকালের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি ও মেঘনা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের রেকর্ড ডেট থাকায় তাদের শেয়ার লেনদেন স্থগিত থাকবে। অন্যদিকে ইউনাইটেড ফাইন্যান্স লিমিটেড, ডাচ-বাংলা ব্যাংক পিএলসি, বাটা সু কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক পিএলসি এবং সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক পিএলসি’র শেয়ার স্পট মার্কেটে লেনদেন হবে।
টেকনিক্যাল বিশ্লেষণেও বাজারের চিত্র খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নয়। ৫,২৭৭ থেকে ৫,৩০০ পয়েন্ট অঞ্চলে শক্ত রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ৫,২০০ পয়েন্ট এখন গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট লেভেল হিসেবে কাজ করছে। বাজার যদি এই অবস্থানের নিচে নেমে যায়, তাহলে আরও বড় সংশোধনের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
সবকিছু বিবেচনায় বিশ্লেষকদের ধারণা, ১৭ মে বাজার খোলার শুরুটা নেতিবাচক হতে পারে। প্রথম ঘণ্টায় সূচক ২০ থেকে ৫০ পয়েন্ট পর্যন্ত কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে দিনের শেষভাগে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং কম দামে শেয়ার সংগ্রহকারীদের সক্রিয়তা বাজারকে কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আতঙ্ক এড়িয়ে চলা। হঠাৎ বিক্রির সিদ্ধান্তের পরিবর্তে মৌলভিত্তি শক্তিশালী কোম্পানিগুলোর দিকে নজর দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশল বজায় রাখাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।
১৭ মে’র পুঁজিবাজার তাই কেবল একটি লেনদেন দিবস নয়, বরং বিনিয়োগকারীদের আস্থা, ধৈর্য এবং কৌশলগত সক্ষমতারও বড় পরীক্ষা।