✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
রাত নামছে। ঢাকার কোলাহল যেন ক্লান্ত পাখি—একটু একটু করে ডানা গুটিয়ে নিচ্ছে। উঁচু উঁচু ভবনগুলো থেকে আলো হারিয়ে যাচ্ছে একেকটি জানালা বেয়ে; যেন কেউ ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে মোমবাতি।
ঠিক তখনই জেগে ওঠে আরেক ঢাকা।
যার মাথার ওপর ছাদ নেই, পায়ের নিচে মাটি নেই; আছে শুধু অনন্ত আকাশ আর কংক্রিটের বুক।
কমলাপুর স্টেশন। রাত এগারোটা।
প্ল্যাটফর্ম। শেষ ট্রেন চলে গেছে অনেক আগে। এখন এখানে ইঞ্জিনের শব্দ নেই, আছে শুধু স্তব্ধ ঘুম। ছেঁড়া পলিথিনের ওপর জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে থাকা মানুষ। কোথাও পাটের বস্তা বিছানো, কোথাও শক্ত কাগজের টুকরো। কারও কারও কাছে সেটুকুও নেই।
আসিয়া বেগম বসে আছেন নিজের বস্তার ওপর। বয়স পঞ্চাশ ছুঁইছুঁই। গাল ভেঙে গেছে, হাড়ের সঙ্গে চামড়া লেপ্টে আছে। কিন্তু চোখ দুটো—সেখানে এখনো টিকে আছে জীবনের তেজ। কারণ ওই চোখ অনেক কিছু দেখেছে।
ফরিদপুরের চর। পদ্মার বুকে ঘর ও সংসার। স্বামী-সন্তান—সবই কেড়ে নিয়েছিল রাক্ষুসী নদী। শুধু তাকে ভাসিয়ে এনে ফেলে দিয়েছে এই প্ল্যাটফর্মে।
পাশের তরুণীটিকে তিনি বললেন, ‘মা, একটু সরে শো। এই জায়গাটা আমার। দশ বছর ধরে এইখানে শুই, ফিরোজ মিয়াও জানে।’ তরুণীটি নিঃশব্দে সরে যায়।
ফিরোজ—এই নামটাই এখানকার আইন। লাইনম্যানদের সরদার। তার মর্জির ওপর নির্ভর করে কে কোথায় শোবে, আর কাকে কত চাঁদা দিতে হবে।
বাপ্পি ওর পাশেই শুয়ে আছে। বয়স কত—সে নিজেও জানে না। এগারো নাকি বারো? বাবা আবার বিয়ে করেছে। মা কোথায় হারিয়ে গেছে, কেউ জানে না।
‘দোস্তরা আছে এখানে,’ বাপ্পি বলে, ‘ওরাই খেতে দেয়।’
আমি ওর হাতের দিকে তাকাই। আঙুলগুলো কুচকুচে কালো, নখ ভাঙা। সারাদিন ফুটপাতে ঘুরে প্লাস্টিকের বোতল, কাগজ আর লোহার টুকরো কুড়িয়েছে। সব বেচে জুটেছে মাত্র কুড়ি টাকা। সাতজনে মিলে তিনটা রুটি আর দুই প্লেট ডাল ভাগ করে খেয়েছে। বাপ্পি স্কুলের বারান্দা মাড়ায়নি, নাম লিখতে জানে না, জন্মসনদ নেই। রাষ্ট্রের খাতায় বাপ্পি এক অস্তিত্বহীন নাম। অথচ ওর বুকের ভেতরটা ঠিকঠাক ধুকপুক করে। কখনো হাসে, কখনো কাঁদে। সে বাঁচতে চায়।
প্ল্যাটফর্মের অন্য প্রান্তে ঘুমাচ্ছে পাগলা আলম। সবাই ওকে পাগল বললেও লোকটা আসলে ভীষণ জ্ঞানী। একবার এক পুলিশ অফিসার এসে পথশিশুদের নিয়ে দারুণ বক্তৃতা দিলেন—উন্নয়ন, পরিকল্পনা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে। যাওয়ার সময় আলম বলে উঠল, ‘স্যার, আপনার বক্তৃতার চেয়ে একটা কম্বল দিয়ে গেলে বেশি উপকার হতো।’ অফিসার হেসে চলে গেলেন।
আলম ফিসফিস করে বলল, ‘ফাঁকা বুলি! কথা দিয়ে তো আর পেট ভরে না।’
গাবতলী টার্মিনাল।
দিনে এখানে কোলাহল আর চিৎকার। রাতে সব নিঝুম—যেন কেউ শব্দযন্ত্রের নব ঘুরিয়ে ভলিউম কমিয়ে দিয়েছে। সাদিয়া সিগন্যালের নিচে ফুল বিক্রি করে। বয়স বারো। চোখ দুটো নিভে যাওয়া চাঁদের মতো—ভেতরে যেন কোনো স্বপ্ন অবশিষ্ট নেই।
কিন্তু আজ সাদিয়া কথা বলছে রোজি নামের আট বছরের একটি ছোট্ট মেয়ের সঙ্গে। মেয়েটি কাঁদছিল। সাদিয়া ওর চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। ‘কাঁদিস না রোজি। মা চলে গেছে বলে কাঁদছিস? আমারও তো মা নেই। বাবা মদ খেয়ে আমাকে রাস্তায় ফেলে গেছে।’
রোজি ফ্যালফ্যাল করে তাকায়। ‘মানে তুইও রাস্তায় থাকিস?’
‘হ্যাঁ, আমি আর আমার মতো আরও কতজন আছি! সবাই রাস্তার বাচ্চা। আজ থেকে তুই আমার দোস্ত।’
‘দোস্ত মানে কী?’
‘দোস্ত মানে—যখন কিছু খাবি, আমাকে দিবি। আর আমি যা পাব, তোকে দেব। কেউ মারতে এলে দুজনে মিলে রুখে দাঁড়াব।’
রোজি ফ্যাকাশে মুখে একটু হাসে। সাদিয়া ওর ফুলের ঝুড়ি থেকে একটি গাঁদা ফুল বের করে দেয়। ‘নে, এই ফুলটা কপালে টিপ করে লাগা। তাহলে তোকে রাজকন্যার মতো দেখাবে।’
হঠাৎ সাদিয়া সোজা হয়ে দাঁড়ায়। দূর থেকে ফিরোজ আসছে, হাতে পাইপের টুকরো। পেছনে পাঁচ-ছয়জন লোক। ‘কিরে, জায়গার ভাড়া দিবি না?’
সাদিয়া কাঁচুমাচু হয়ে বলে, ‘ফিরোজ ভাই, আজ বিক্রি কম হয়েছে। পাঁচটা টাকা দিচ্ছি।’
‘পাঁচ টাকা?’ ফিরোজ খেঁকিয়ে ওঠে। ‘পাঁচ টাকা দিয়ে কী হবে? পঁচিশ টাকা বের কর। না দিলে কাল থেকে এখানে ঘুমানো বন্ধ। আর এই নতুন মেয়েটা কে? ওকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিস, কাজ দেব।’
সাদিয়া হাত জোড় করে পনেরো টাকা গুনে দেয়। ফিরোজ চলে গেলে ওর হাত কাঁপতে থাকে। রোজি জিজ্ঞেস করে, ‘উনি কী কাজের কথা বললেন?’
সাদিয়া ধমক দিয়ে বলে, ‘চুপ কর! ওর কাছে কখনো যাবি না। ওই কাজ ভালো না।’
সদরঘাট পন্টুন।
নদীর জল অন্ধকারে কালো দেখাচ্ছে। মুন্না পন্টুনের এক কোণে বসে আছে। তিন বছর আগে দুর্ঘটনায় তার ডান পাটি হারিয়েছে। এখন কাঠের ক্রাচে ভর দিয়ে চলে। মুন্না নিজেকে ভিক্ষুক ভাবে না। সে বলে, ‘আমি কাজ করি। মানুষ রাস্তায় যে টাকা ফেলে দেয়, তা কুড়াই।’
দুর্ঘটনার পর তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। যাওয়ার সময় বলে গেছে, ‘পঙ্গু মানুষকে নিয়ে কী করব?’ সেই রাতে একা পন্টুনে বসে কেঁদেছিল মুন্না। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছিল, কিন্তু কেউ তার চোখের জল দেখেনি।
এখন সে মাজারের বারান্দায় রাত কাটায়। খাদেম প্রতি রাতে দশ টাকা চাঁদা নেয়। দিতে না পারলে হুমকি দেয় পা ভেঙে দেওয়ার। যার একটা পা নেই, তার অন্য পাটি ভাঙার এই কী নৃশংস উল্লাস!
মুন্নার পাশে বসে আছে অন্ধ ফাতেমা। কোলে তার অসুস্থ সন্তান। ‘ভাই, আজ কত পেলেন?’
‘আজ মোটে পনেরো টাকা। দশ টাকা খাদেমকে দিলাম, পাঁচ টাকায় দুইটা রুটি খেয়েছি।’
‘আমার কাছে তো কিছু নেই। বাচ্চাটা খিদের জ্বালায় কাঁদছে।’
মুন্না চুপ করে থাকে। তারপর পকেট থেকে শেষ দুটো টাকা বের করে ফাতেমার হাতে দেয়। ‘নে আপা, বাচ্চাকে কিছু কিনে দিস।’
ফাতেমা দোয়া করে, ‘আল্লাহ তোমার মঙ্গল করবেন ভাই।’
মুন্না দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ‘আল্লাহ থাকলে কি আর আমরা পন্টুনে শুতাম, আপা?’
পেছন থেকে ফাতেমা বিড়বিড় করে—‘দুনিয়ায় ভালো মানুষ থাকলে আল্লাহর দরকার কী?’ এক অমীমাংসিত প্রশ্ন বাতাসের সঙ্গে মিলিয়ে যায়।
ভোর। কমলাপুর প্ল্যাটফর্ম।
আসিয়া বেগম জেগে উঠেছেন। পাশে এক যুবক বসে কথা বলছে। সে কবি নয়, কোনো নামী লেখকও নয়—একজন সাধারণ মানুষ, যে কয়েক দিন ধরে এখানে এসে এদের জীবনের কথা শোনে।
আসিয়া জিজ্ঞেস করেন, ‘এসব লিখে কী হবে বাবা? আমাদের পেট ভরবে? জমি ফিরে পাব?’
যুবকটি চুপ করে থাকে। আসিয়া একটি শুকনো হাসি দিয়ে বলেন, ‘গল্প থেকে যায় বাবা। নইলে আমরা হতাম স্রেফ কিছু পরিসংখ্যান—ষোলো হাজার দুইশো একুশ জনের একটা সংখ্যা। গল্প থাকলে লোকে জানবে, এই সংখ্যার পেছনেও জলজ্যান্ত মানুষ ছিল।’
ভোরের আলো ফুটতেই কমলাপুর স্টেশনে ট্রেনের বাঁশি শোনা যায়।
পৌষ মাস। তাপমাত্রা নেমেছে নয়ের নিচে। হাড়কাঁপানো শীতে সাদিয়া আর রোজি একটি ওভারব্রিজের নিচে আশ্রয় নিয়েছে। গায়ে একটি মাত্র ছেঁড়া কম্বল। সাদিয়া রোজিকে জাপটে ধরে নিজের শরীরের ওম দেওয়ার চেষ্টা করে। নিজে কাঁপলেও সে রোজিকে উষ্ণ রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।
সকালে ফাতেমা তাদের খুঁজে পায়। সাদিয়া তখন জ্বরে অচেতন।
মুন্না কাছে এসে বলে, ‘ফুটপাত আছে, কিন্তু সেই সঙ্গে ফিরোজদের মতো মানুষেরাও আছে। এই অভিশপ্ত চক্র থেকে আমাদের মুক্তি নেই?’
ঢাকার নিশীথিনী প্রতিদিন এভাবেই শান্ত হয়, আবার জেগে ওঠে। প্ল্যাটফর্মে কোনো শিশু স্বপ্নে হেসে ওঠে—হয়তো সে স্বপ্নে স্কুলে যাচ্ছে। আসিয়া বেগম আজও বিশ্বাস করেন, একদিন আলো নামবে। রাত সবার জন্যই আসে, কিন্তু সকালও তো একবার আসবেই। এই আশাই তাকে দশ বছর ধরে বাঁচিয়ে রেখেছে।
পাগলা আলম বলে ওঠে, ‘গল্প লিখে কী হবে? আমরা তো আজও কাগজের পাতায় বন্দি কিছু সংখ্যা মাত্র।’
আলমের কথার রেশ কাটতে না কাটতেই পূর্ব আকাশে আলোর আভা ফুটে ওঠে। নতুন দিন, নতুন লড়াই আর টিকে থাকার নতুন সংগ্রাম শুরু হয়। ঢাকার নিশীথিনী তার এই না-বলা পদাবলি গেয়ে যায় যুগ যুগ ধরে। এই গল্পের কোনো শেষ নেই। কারণ, প্রতি রাতে কমলাপুরে একই জীবন জেগে ওঠে, প্রতি রাতে সদরঘাটে কোনো অন্ধ মা কাঁদে।
এই গল্পের যবনিকাপাত তখনই ঘটবে, যখন রাস্তার প্রতিটি শিশু তার মায়ের আদর পাবে এবং মুন্নার মতো মানুষদের আর ফিরোজদের কাছে মাথা নত করতে হবে না।
ততদিন—এই পদাবলি চলতেই থাকবে।
Leave Your Comments