প্রকাশিত : ১০:৩৭
১৪ মে ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সবুজ চা-বাগান, পর্যটন আর শান্ত পরিবেশের জন্য পরিচিত শ্রীমঙ্গল যেন ধীরে ধীরে হারাতে বসেছে তার চিরচেনা স্বস্তির আবহ। সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক ছিনতাই, হত্যা, চুরি, হামলা ও রাতের নিরাপত্তাহীনতার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ ও আতঙ্ক। শহরজুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু—আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বেলায় প্রকাশ্যে ছিনতাই থেকে শুরু করে রাতের আঁধারে সংঘবদ্ধ চক্রের তৎপরতা—সব মিলিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে নারী, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী মানুষ বেশি শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
বুধবার (১৩ মে) সকাল ৮টা থেকে সাড়ে ৮টার মধ্যে শহরের মাস্টারপাড়া টার্নিং এলাকায় ঘটে প্রকাশ্য ছিনতাইয়ের ঘটনা। প্রত্যক্ষদর্শীদের তথ্য অনুযায়ী, “খেলাপাড়া ১২-৮৯১৩ ঢাকা মেট্রো-প” সিরিয়াল নম্বরযুক্ত একটি মোটরসাইকেলে করে আসা কয়েকজন ছিনতাইকারী রিকশাযোগে যাওয়া এক নারীর পথরোধ করে। পরে তার গলায় দা ঠেকিয়ে সোনার চেইন, কানের দুল ও আংটি ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায় তারা। ঘটনার পর এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের আলোতে ব্যস্ত এলাকায় এমন দুঃসাহসিক ছিনতাই শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
জাতীয় ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি অবজারভার–এর শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি রূপম আচার্য তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে ঘটনাটির বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন। পাশাপাশি স্থানীয় আরও কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক অপরাধ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
গত ৩ মে ভোরে উপজেলার পশ্চিম লইয়ার কুল জামে মসজিদে ফজরের নামাজ চলাকালে ঘটে এক মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড।
নিহত হাফিজ উল্লাহ (৮০) উপজেলার ভুনবীর ইউনিয়নের পশ্চিম লইয়ারকুল গ্রামের বাসিন্দা। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, নামাজ চলাকালে হঠাৎ এক ব্যক্তি মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে তার ওপর হামলা চালায়। একটি কলম দিয়ে চোখ, মাথা ও মুখের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করা হলে গুরুতর আহত হন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পরপরই পুলিশ অভিযান চালিয়ে জসিম মিয়া (৩০) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে। নিহত ও অভিযুক্ত দুজনই একই এলাকার বাসিন্দা বলে জানিয়েছে পুলিশ। ধর্মীয় উপাসনালয়ের ভেতরে এমন হত্যাকাণ্ডে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।
শুধু ছিনতাই বা হত্যাকাণ্ড নয়, শহর ও শহরতলীতে বেড়েছে চুরির ঘটনাও। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল ভিক্টোরিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের পূর্বপাশে খেলোয়াড়দের জন্য নির্মিত পৌরসভার একটি আধুনিক রেস্ট রুম ও ওয়াশ রুমে চুরির ঘটনা ঘটে।
গত ৯ মে গভীর রাতে একদল চোর তালা ভেঙে দুটি ফ্যান, বৈদ্যুতিক সামগ্রী ও বিভিন্ন ফিটিংস খুলে নিয়ে যায়।
শ্রীমঙ্গল পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম জানান, প্রায় ১৮ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই স্থাপনাটি খেলোয়াড়দের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। এ ঘটনায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করার প্রস্তুতি চলছে।
স্থানীয়দের ধারণা, একটি সংঘবদ্ধ চোরচক্র দীর্ঘদিন ধরে শহরের বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিতভাবে চুরি করে যাচ্ছে।
পর্যটন নগরী শ্রীমঙ্গলে সাম্প্রতিক সময়ে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সুযোগ নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রের সক্রিয়তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
জাতীয় দৈনিক কালবেলা–এর শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি এস.কে. দাশ সুমন গত ২৭ এপ্রিল তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে জানান, গভীর রাতে কলেজ রোডের উদয়ন উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকায় কয়েকজন মুখোশধারী ব্যক্তি একটি সিএনজি রেখে তার বাসায় প্রবেশের চেষ্টা করে। পাশের বাসা থেকে চিৎকার শুনে তারা দ্রুত পালিয়ে যায়।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাত ১২টা ৫২ মিনিটের দিকে শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ না থাকায় পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যায়। এমন পরিস্থিতিতে অপরাধচক্র আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
তার পোস্টের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। স্থানীয়রা রাতের টহল জোরদার, গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি এবং সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র শনাক্তের দাবি জানান।
১৩ মে রাতে শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওরের রাজাপুর এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে মাহমুদ নামে এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
নিহত মাহমুদ উপজেলার সিরাজনগর বক্সবাড়ির আসকর আলীর ছেলে। বর্তমানে পরিবারসহ নোয়াগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন তিনি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মাছ ধরার উদ্দেশ্যে হাওরে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। পরে হাওরের পানিতে তার মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেয়।
শ্রীমঙ্গল থানার ওসি জহিরুল ইসলাম মুন্না জানান, মরদেহ উদ্ধার করে তদন্ত শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কিছুদিন আগে শহরের শাপলাবাগ আবাসিক এলাকায় মাদক ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এক শ্রমিক নেতার ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনাও ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। ওই ঘটনার প্রতিবাদে যমুনা চত্বরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, একসময় শান্ত ও পর্যটননির্ভর শহর হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল এখন অপরাধের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। সন্ধ্যার পর প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হতে ভয় পাচ্ছেন অনেকে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধও জরুরি। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সিসিটিভি স্থাপন, নিয়মিত পুলিশি টহল বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় বিশেষ নজরদারি এবং সন্দেহজনক মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিদের ওপর কঠোর পর্যবেক্ষণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষকে আরও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের নির্জন এলাকা এড়িয়ে চলা এবং সন্দেহজনক কিছু দেখলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর পরামর্শ দিয়েছেন স্থানীয়রা।
চায়ের রাজধানী হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল এখন যেন এক অস্বস্তিকর সময় পার করছে। শহরবাসীর প্রত্যাশা—দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে ফিরুক আগের সেই নিরাপদ ও শান্ত শ্রীমঙ্গল।