প্রকাশিত : ১৮:০৮
১৩ মে ২০২৬
রেজুয়ান আহম্মেদ
মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে এসে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এখন এক অদ্ভুত দোলাচল। একদিকে আসন্ন কোরবানির ঈদ, অন্যদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট—এই দুই প্রধান ঘটনাপ্রবাহে বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্ব এখন দোদুল্যমান। সম্প্রতি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) সূচকে যে পুনরুদ্ধারের আভাস দেখা গেছে, তা কি ঈদ-পরবর্তী সময়ে স্থায়িত্ব পাবে, নাকি ঈদের ছুটির আগে নগদের প্রয়োজনে শেয়ার বিক্রির চাপে ধুলোয় মিশে যাবে—এই নিয়ে বাজার মহলে এখন বিস্তর আলোচনা। তবে পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেঘ যেমন আছে, তেমনি পাহাড়ের ওপাশে রোদের দেখাও মিলছে।
বাজারের সাম্প্রতিক চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, মে মাসের শুরুটা খুব একটা সুখকর ছিল না। টানা পাঁচ কার্যদিবসের রক্তক্ষরণ শেষে ১২ ও ১৩ মে সূচক ইতিবাচক ধারায় ফিরতে শুরু করে। ১২ মে ডিএসইএক্স সূচক ২৪.৭ পয়েন্ট বেড়ে ৫,২৩০ পয়েন্টে দাঁড়ায় এবং ১৩ মে তা আরও ১৩.৫ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫,২৪৩ পয়েন্টে থিতু হয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্থানের নেপথ্যে ছিল ‘বারগেইন হান্টিং’ বা দীর্ঘ পতনের পর অবমূল্যায়িত ভালো শেয়ারগুলো লুফে নেওয়ার প্রবণতা। তবে আশঙ্কার জায়গাটি হলো লেনদেনের স্থিতিশীলতা। ১২ মে ব্র্যাক ব্যাংকের ৩.৪ বিলিয়ন টাকার ব্লক মার্কেট লেনদেনের কল্যাণে টার্নওভার ১১ বিলিয়ন টাকা ছাড়ালেও পরের দিনই তা ৮.৬ বিলিয়নে নেমে আসে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও প্রাতিষ্ঠানিক বড় বিনিয়োগ ছাড়া টার্নওভার এখনও কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ বিমা, টেক্সটাইল, ওষুধ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত এখন লেনদেনের অগ্রভাগে। ১৩ মে আইটি সেক্টর ২.৫ শতাংশ এবং সাধারণ বিমা ২.১ শতাংশ দরবৃদ্ধি নিয়ে বাজারকে নেতৃত্ব দিয়েছে। ব্যাংকিং সেক্টরও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে; বিশেষ করে ব্র্যাক ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী প্রথম প্রান্তিক (ইপিএস ২.৯০ টাকা) মুনাফা ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সঞ্চার করেছে।
পবিত্র ঈদুল আজহা সম্ভবত আগামী ২৭ মে উদযাপিত হবে। প্রথাগতভাবে বড় উৎসবের আগে বাজারে তারল্য সংকট দেখা দেয়। তবে ডিএসইর ঐতিহাসিক তথ্য এবং ‘Impact of Eid-ul-Azha on Market Return’ শীর্ষক গবেষণা বলছে ভিন্ন কথা। দেখা গেছে, ঈদের ছুটির ১ থেকে ৫ দিন আগে বাজারে সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন হওয়ার প্রবণতা প্রবল। ছুটির ঠিক আগে বিক্রির চাপ কিছুটা কমে আসে এবং দূরদর্শী বিনিয়োগকারীরা সক্রিয় হয়ে ওঠেন। যেহেতু বর্তমান বাজারে অনেক মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ার ঐতিহাসিক সর্বনিম্ন দামে মিলছে, তাই ঈদের আগে বড় কোনো ধসের সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।
পুঁজিবাজারের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য সরাসরি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯.০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮.৩৯ শতাংশ। মুদ্রাস্ফীতির এই পারদ চড়লেও মজুরি বৃদ্ধির হার (৮.১৬%) সে তুলনায় কম, যা মানুষের সঞ্চয় করার ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে খুচরা বিনিয়োগকারীরা বাজার থেকে কিছুটা দূরে থাকছেন। তবে সাময়িকভাবে রিজার্ভের স্থিতিশীলতা (৩৪.৩৪ বিলিয়ন ডলার) কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হলো মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জ্বালানি তেলের দাম, যা ব্যারেল প্রতি ১০৪ ডলার ছাড়িয়েছে। তেলের এই চড়া দাম আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের শিল্পোৎপাদন খরচ বাড়িয়ে কোম্পানিগুলোর মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিনিয়োগকারীদের এখনকার প্রধান নজর হলো আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের প্রস্তাবনা পেশ করেছে। বাজারের বড় প্রত্যাশা হলো ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স বা মূলধনী মুনাফা কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। এটি কার্যকর হলে উচ্চ নিট সম্পদধারী বিনিয়োগকারীরা বাজারে ফিরবেন এবং সূচক দ্রুতই ৬,০০০ পয়েন্টের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারে। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির কর হারের ব্যবধান বাড়ানো এবং সঞ্চয়পত্রের কর হারের সংস্কার বাজারে নতুন তারল্য প্রবাহ তৈরি করতে পারে।
শিল্প খাতের চিত্রটি অবশ্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। উদাহরণস্বরূপ, বসুন্ধরা পেপার মিলস গত নয় মাসে ৪২২ কোটি টাকা লোকসান করেছে, যেখানে কাঁচামাল সংকট ও ইউটিলিটি খরচ বৃদ্ধিই ছিল প্রধান অন্তরায়। গার্মেন্টস খাতেও জ্বালানি সংকটে অনেক কারখানা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার কথা জানাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের উচিত হবে কেবল হুজুগে না মেতে, উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে সফল ও সুশাসিত কোম্পানিগুলোকে পোর্টফোলিওতে স্থান দেওয়া।
পরিশেষে বিনিয়োগকারীদের জন্য আমার পরামর্শ হলো—প্রথমত, কেবল গুঞ্জনে কান না দিয়ে ডিভিডেন্ড হিস্টরি বা লভ্যাংশের ধারাবাহিকতা দেখুন। মেঘনা পেট্রোলিয়াম (২০০%), যমুনা অয়েল (১৮০%) বা ওয়ালটনের (১৭৫%) মতো যেসব কোম্পানি শক্তিশালী মুনাফা করছে, সেগুলোকে গুরুত্ব দিন। দ্বিতীয়ত, বর্তমান পিই রেশিও (গড় ৮.৬) নির্দেশ করে যে বাজার এখন সস্তায় শেয়ার কেনার জন্য প্রস্তুত। ঈদের আগে নগদ টাকার চাপে সাময়িকভাবে দর কমলে তাকে ভয় না পেয়ে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত।
২০২৬ সালের কোরবানির ঈদপূর্ব পুঁজিবাজার একটি জটিল সমীকরণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু অভিজ্ঞদের ভাষায় এটিই হলো ‘বটমআউট’ বা ঘুরে দাঁড়ানোর সন্ধিক্ষণ। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে বিচারবুদ্ধি খাটিয়ে বিনিয়োগ করলে ঈদের আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হওয়া সম্ভব। সবাইকে ঈদ মোবারক এবং শুভ বিনিয়োগ।