প্রকাশিত : ১৫:৫২
১১ মে ২০২৬
স্কটিশ পার্লামেন্টে ফয়ছল হোসেন চৌধুরী এম.বি.ই, এম.এস.পি এর সময়কাল শেষের পথে; স্কটল্যান্ডের বাংলাদেশি কমিউনিটির অনেকেই জনজীবনে প্রতিনিধিত্বের গুরুত্ব নিয়ে ভাবছেন এবং আশা করছেন যে ভবিষ্যতেও অনুপ্রতিনিধিত্বশীল পটভূমি থেকে আরও মানুষ এগিয়ে আসবেন।
ফয়ছল হোসেন চৌধুরী এম.বি.ই, এম.এস.পি, ইতিহাস সৃষ্টি করেন স্কটিশ পার্লামেন্টে নির্বাচিত প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে এবং তিনি এখনো সমগ্র যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম ও একমাত্র পুরুষ পার্লামেন্টারিয়ান। তাঁর নির্বাচন স্কটিশ রাজনীতিতে বৈচিত্র্য ও প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয় এবং এমন বহু কমিউনিটিকে অনুপ্রাণিত করে যারা আগে কখনো নিজেদের স্কটল্যান্ডের জাতীয় পার্লামেন্টে প্রতিফলিত হতে দেখেনি।
২০২১ সালে লোথিয়ান অঞ্চলের সদস্য হিসেবে প্রথম নির্বাচিত হওয়ার পর, ফয়ছল হোসেন চৌধুরী এম.বি.ই, সংস্কৃতি, সমতা, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং কমিউনিটি ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে পরিচিত কণ্ঠ হয়ে ওঠেন। তাঁর জনজীবনের পুরো সময়জুড়ে তিনি স্কটল্যান্ডজুড়ে বিভিন্ন কমিউনিটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন এবং অন্তর্ভুক্তি, প্রতিনিধিত্ব ও শক্তিশালী কমিউনিটি সম্পর্কের পক্ষে সোচ্চার ছিলেন।
বাংলাদেশের হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার বদরদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং স্কটল্যান্ডে বেড়ে ওঠা ফয়ছল হোসেন চৌধুরী-এর রাজনীতিতে যাত্রা গড়ে ওঠে কয়েক দশকের তৃণমূল পর্যায়ের কমিউনিটি কাজ, স্বেচ্ছাসেবা এবং নাগরিক নেতৃত্বের মাধ্যমে। সংসদীয় রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি সামাজিক অন্তর্ভুক্তি, সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া এবং স্কটল্যান্ডের বৈচিত্র্যময় কমিউনিটিগুলোর মধ্যে সম্পর্ক জোরদারে কাজ করা বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং কমিউনিটি গ্রুপের সঙ্গে ব্যাপকভাবে কাজ করেন।
ফয়ছল চৌধুরীর সমাজের প্রতি নিষ্ঠা এবং দায়িত্ববোধকে স্বীকৃতি দিয়ে ২০০৪ সালে তিনি ব্রিটিশ রাণীর কাছ থেকে এমবিই (মেম্বার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার) খেতাবে ভূষিত হন। এটি ছিল তাঁর জীবনের এক বিশাল অর্জন এবং তাঁর দীর্ঘদিনের সমাজসেবার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি।
পার্লামেন্টে থাকাকালীন, ফয়ছল চৌধুরী স্কটিশ লেবারের সংস্কৃতি, ইউরোপ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক ছায়া মন্ত্রী (Shadow Minister) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সংস্কৃতি, ইউরোপ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিষয়ক Deputy Party Spokesperson হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, যেখানে তিনি স্কটল্যান্ডের সাংস্কৃতিক খাত, আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততা এবং মানবিক দায়বদ্ধতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারণ ও সংসদীয় পর্যালোচনায় অবদান রাখেন।
তিনি স্কটিশ পার্লামেন্টের একাধিক কমিটিতে দায়িত্ব পালন করেন, যার মধ্যে ছিল সিটিজেন পার্টিসিপেশন অ্যান্ড পাবলিক পিটিশনস কমিটি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তা কমিটি, সংবিধান, ইউরোপ, বৈদেশিক বিষয়ক ও সংস্কৃতি কমিটি, গ্রামীণ বিষয়ক ও দ্বীপপুঞ্জ কমিটি এবং ডেলিগেটেড পাওয়ারস অ্যান্ড ল’ রিফর্ম কমিটি।। এসব দায়িত্বের মাধ্যমে তিনি আইন পর্যালোচনা, জননীতি মূল্যায়ন এবং স্কটল্যান্ডজুড়ে অংশীজনদের সঙ্গে সম্পৃক্ততায় অবদান রাখেন।
সংসদীয় দায়িত্বের পাশাপাশি, ফয়ছল চৌধুরী স্কটিশ পার্লামেন্টের বিভিন্ন ক্রস পার্টি গ্রুপে নেতৃত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ বিষয়ক ক্রস পার্টি গ্রুপ, বর্ণ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রতিরোধ বিষয়ক ক্রস পার্টি গ্রুপ এবং সংস্কৃতি ও কমিউনিটিজ বিষয়ক ক্রস পার্টি গ্রুপের কনভেনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও তিনি স্কটল্যান্ডের স্বাস্থ্য উন্নয়ন বিষয়ক ক্রস পার্টি গ্রুপ এবং স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রম বিষয়ক ক্রস পার্টি গ্রুপের কো-কনভেনার হিসেবে, এবং অভিবাসন বিষয়ক ক্রস পার্টি গ্রুপ ও ফিলিস্তিন বিষয়ক ক্রস পার্টি গ্রুপের ভাইস কনভেনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এই কাজের মাধ্যমে তিনি নিয়মিতভাবে দাতব্য সংস্থা, প্রচারণা গ্রুপ, কমিউনিটি নেতা এবং অংশীজনদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, যাতে কমিউনিটির কণ্ঠস্বর স্কটিশ পার্লামেন্টে পৌঁছায়। তিনি স্কটল্যান্ড ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন এবং রোহিঙ্গা শরণার্থী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তার প্রচেষ্টাসহ বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগকে সমর্থন করেন।
একজন সংসদ সদস্য হিসেবে তাঁর সময়জুড়ে, ফয়ছল চৌধুরী শুধু এডিনবারা এবং লোথিয়ান অঞ্চলের জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করেননি, বরং রাজনীতি ও পার্লামেন্টকে এমন কমিউনিটির জন্য আরও সহজলভ্য করে তুলতে কাজ করেছেন যারা দীর্ঘদিন জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেছে। বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী এবং বৈচিত্র্যময় ও অনুপ্রতিনিধিত্বশীল পটভূমির মানুষের মধ্যে রাজনীতি, জনসেবা এবং কমিউনিটি নেতৃত্বে অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার জন্য তিনি ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
তাঁর নির্বাচন এবং সংসদীয় জীবন স্কটল্যান্ডের বাংলাদেশি কমিউনিটির ক্রমবর্ধমান প্রতিনিধিত্বের প্রতিফলনও ছিল। তিনি ধারাবাহিকভাবে বলেছেন যে আধুনিক স্কটল্যান্ডের বৈচিত্র্য যেন পার্লামেন্টে প্রতিফলিত হয়, এবং তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে ভবিষ্যতেও অনুপ্রতিনিধিত্বশীল কমিউনিটি থেকে আরও মানুষ এগিয়ে আসবেন।
ফয়ছল চৌধুরী-এর জনসেবা এবং কমিউনিটি নেতৃত্বের অবদান বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা ও পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে MBE for services to the community, Channel S Community Award, Keighley Award for humanitarian work, Pride of British Bangladeshi People Award এবং যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি, যা কমিউনিটি উন্নয়ন, সমতা এবং জনজীবনে তাঁর অবদানের জন্য প্রদান করা হয়েছে।
নিজের যাত্রা সম্পর্কে প্রতিফলন করতে গিয়ে ফয়ছল চৌধুরী বলেন:
“আমার জীবনের অন্যতম বড় সম্মান ছিল স্কটিশ পার্লামেন্টে এডিনবারা এবং লোথিয়ান-এর জনগণের সেবা করার সুযোগ পাওয়া। স্কটিশ পার্লামেন্টে প্রথম ব্রিটিশ বাংলাদেশি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া এবং সমগ্র যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম ও একমাত্র পুরুষ পার্লামেন্টারিয়ান হওয়ার দায়িত্ব আমি কখনোই হালকাভাবে নিইনি। আমি বুঝতাম যে আমার নির্বাচন বহু ব্যক্তি ও কমিউনিটির জন্য আশা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক, যারা আগে কখনো নিজেদের পার্লামেন্টে প্রতিফলিত হতে দেখেনি।
একজন সংসদ সদস্য হিসেবে আমার পুরো সময়জুড়ে, আমি শুধু আমার নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করার চেষ্টা করিনি, বরং আরও বেশি মানুষকে—বিশেষ করে তরুণ জনগোষ্ঠী এবং অনুপ্রতিনিধিত্বশীল পটভূমির মানুষদের—রাজনীতি, জনসেবা এবং কমিউনিটি নেতৃত্বে যুক্ত হতে উৎসাহিত করার চেষ্টা করেছি। আমি আন্তরিকভাবে আশা করি যে আমি স্কটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রথম এবং শেষ ব্যক্তি হব না, এবং আগামী বছরগুলোতে আরও অনেকেই এই পথ অনুসরণ করবেন।
জনসেবার একটি মেয়াদ থাকতে পারে, কিন্তু কমিউনিটি সেবা আজীবনের। আপনি যদি সত্যিই পরিবর্তন আনতে চান এবং মানুষের জীবন উন্নত করতে চান, তবে এই কাজ কখনো থামে না।”
পুরো কর্মজীবনজুড়ে ফয়ছল চৌধুরী সমতা প্রচার, কমিউনিটিকে সমর্থন এবং জনজীবনে আরও বেশি অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থেকেছেন। তাঁর গল্প আজও স্কটল্যান্ডজুড়ে বহু মানুষকে, বিশেষ করে জাতিগত সংখ্যালঘু কমিউনিটির মানুষদের, অনুপ্রাণিত করে যে, কীভাবে কমিউনিটি সেবা, দৃঢ়তা এবং জনসম্পৃক্ততায় সকল বাধা ভেঙে স্থায়ী পরিবর্তন আনয়ন করা যায়।