প্রকাশিত :  ১০:০৯
১০ মে ২০২৬

স্বপ্নের বিসর্জন

স্বপ্নের বিসর্জন

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

গড়াই নদীর বুক চিরে যখন সকালের হিমেল হাওয়া বয়ে যায়, তখন কুষ্টিয়ার পাংশার মাটির সোঁদা গন্ধ দিগন্তে মিশে যেতে চায়। এখানকার মাটি কেবল উর্বরই নয়, বরং মহাকালের এক জীবন্ত সাক্ষী। পদ্মা, চন্দনা আর গড়াই— এই তিন নদীর পলিবিধৌত জনপদকে দেখলে মনে হয়, বাংলার আদি প্রকৃতি নিজ হাতে সিঞ্চন করে গড়ে তুলেছে তার এই প্রিয় সন্তানকে।

সেই পাংশাতেই বাড়ি সাইদুল ইসলামের। বয়স তেইশ ছুঁই ছুঁই। দুচোখে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে যখন সে হাঁটে, পথিকও যেন থমকে দাঁড়ায়। তবে সেই উজ্জ্বল চোখের মণিকোঠায় চেনা যায় দারিদ্র্যের এক ধূসর ছায়া। সাইদুলের সারা অবয়ব জুড়ে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ। তার মনটা মাটির মতোই সহজ, সরল, নির্লোভ ও অতিথিপরায়ণ। গ্রামের ছোট-বড় সবাই তাকে এক নামে ‘সাইদুল’ বলেই চেনে; এর বাইরে তার আর কোনো বাড়তি পরিচয়ের প্রয়োজন পড়ে না।

পাংশার ইতিহাস ঘাটলে প্রাচীন বঙ্গ সমতটের কথা উঠে আসে। এখানকার মানুষের কথ্য ভাষায় ‘স’ বর্ণটি অবলীলায় ‘হ’ হয়ে যায়— যেন জীবনের সব আশাই এখানে ‘হওয়া’র প্রতীক্ষায় প্রহর গোনে। সাইদুলের শৈশবটাও ছিল সেই অতি সাধারণ ‘হওয়া’র গল্পে মোড়া। মায়ের ডাকে ভোরে ঘুম থেকে ওঠা, শিশিরভেজা মাঠে খালি পায়ে দৌড়ানো, আর বিকেলে নদীর কূলে বসে বাউল গানের সুর শোনা। খাবারের পাতে পাংশার বিখ্যাত চমচম, দই, তিলের খাজা কিংবা শীতের সন্ধ্যায় কুলফি মালাই— সব মিলিয়ে এক মায়াবী জগৎ ছিল তার।

কিন্তু সেই রঙিন জগতে একদিন অনটনের করাল গ্রাস হানা দিল। অভাব যখন সাইদুলের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়াল, বাবা-মায়ের জীর্ণ মুখের দিকে তাকিয়ে সে বুঝল— সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোই এখন তার একমাত্র ব্রত। আর সেই সচ্ছলতার সিঁড়ি হিসেবে বেছে নিল ‘প্রবাস’ নামক সোনার হরিণকে। স্বপ্নের পিছু ছুটতে ছুটতে সাইদুল একদিন পাড়ি জমাল যান্ত্রিক শহর ঢাকায়। সে জানত না, তার স্বপ্নের এই রাজপথ শেষ পর্যন্ত কোন অন্ধকার খাদের গভীরে গিয়ে মিশবে।

‘আমিরা ট্রাভেলস’ অফিসের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে যখন সে মালিকের কথা শুনছিল, তখন তার চোখে আশার আলো জ্বলজ্বল করছিল। মালিকের প্রতিটি শব্দ তার কানে অমৃতের মতো শোনাল: "সৌদি আরবে ক্লিনারের কাজ, বেতন ১২০০ রিয়াল, থাকা-খাওয়া কোম্পানির, আট ঘণ্টা ডিউটি। তার ওপর ওভারটাইমও আলাদা। বিশ্বাস করেন মিয়া, মাত্র সাড়ে চার লাখ টাকা দিলেই আপনার কপাল খুলে যাবে।"

সাইদুলের দীর্ঘশ্বাস ভারী হয়ে এল। সাড়ে চার লাখ টাকা! এই বিপুল অর্থ সে কোথা থেকে জোগাড় করবে? বাবা-মায়ের শেষ সম্বলটুকু তো গত দেড় বছরের দৌড়ঝাঁপেই শেষ হয়ে গেছে।

তারপর শুরু হলো অর্থ সংগ্রহের এক মরণপণ লড়াই। পৈতৃক জমি বন্ধক রাখা হলো, গ্রামের মহাজন অলি মিয়ার কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নেওয়া হলো। সাইদুল ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেনি, এই ঋণের বিষবৃক্ষ তাকে একদিন কত বড় মাশুল গুনতে বাধ্য করবে। বৃদ্ধ বাবা, যার শরীর আর ক্ষেতের পরিশ্রম সইতে পারে না, তিনিও ছেলের সুন্দর ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের শেষ অস্তিত্বটুকু মহাজনের কাছে বন্ধক রাখলেন।

টাকা জোগাড় হলো। সাইদুলের হাতে যখন সাড়ে চার লাখ টাকা এল, তখন নিজেকে রাজকুমার মনে হলো। কিন্তু সেই রাজকুমারের সিংহাসন ছিল আগুনের ওপর পাতা। বারবার ফ্লাইট বাতিলের খবরে শ্বশুরবাড়িতে তার সম্মান ধুলোয় মিশে যাচ্ছিল। বন্ধুদের ব্যঙ্গাত্মক তীর তাকে বিদ্ধ করত: "আবার যাওয়ার গল্প করিস? তোর কি আসলেই ফ্লাইট হয়, নাকি সব ভুয়া?"

প্রথমবার যেতে না পেরে সাইদুল পরাজিত সৈনিকের মতো ফিরে এল। দ্বিতীয়বারেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। তৃতীয়বারও ব্যর্থ। প্রতিবার বিদায়বেলায় আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর সামনে সে যে বুক চিতিয়ে বিদায় নিয়েছিল, ফিরে আসার সময় সেই বুক লজ্জায় কুঁকড়ে যেত। অপমানের আগুনে তার আত্মা প্রতিনিয়ত পুড়ে ছারখার হচ্ছিল।

চতুর্থবার যখন সে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলো, মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল— হয় প্রবাসে যাবে, নয়তো চিরতরে হারিয়ে যাবে; কিন্তু এই মুখ নিয়ে আর গ্রামে ফিরবে না।

আমিরা ট্রাভেলস তাকে ফকিরাপুলের এক ঘিঞ্জি মেসে থাকার ব্যবস্থা করে দিল। ঘরটি এতই ছোট যে সোজা হয়ে দাঁড়াতেও ঘাড় বাঁকা করতে হয়। সেখানে বিশ-পঁচিশ জন প্রবাসপ্রত্যাশী কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কোনোমতে দিন কাটায়। রাত নামলেই মেসের অন্ধকার কোণ থেকে ভেসে আসত চাপা কান্নার আওয়াজ আর দীর্ঘশ্বাস।

কেউ বলত, "তিন বছর পার হয়ে গেল, ভিসা হয় না। দালালের ঠিকানাও পাই না।" কেউ বলত, "ছয় মাস সৌদি আরব ছিলাম। কাজ পাইনি, ইকামা ছিল না। জেল খেটে দেশে ফিরেছি। এখন আবার দালালের পেছনে ঘুরছি।"

এসব আর্তনাদ শুনে সাইদুলের বুক ফেটে যেতে চাইত। মেসের ছাদে একা বসে সে কুষ্টিয়ার নদীর গন্ধ খুঁজত। লালন সাঁইয়ের গান তার কানে বাজত— "বিষয় বিষে চঞ্চলা মন দিবা রজনী, মনকে বোঝালে বুঝ মানে না ধর্মকাহিনী।" সাড়ে চার লাখ টাকার সেই ‘বিষয়-বিষ’ তাকে প্রতি মুহূর্তে দংশন করছিল। ঋণের কিস্তির জন্য বাবার আর্তনাদ ফোনে ভেসে আসত— "বাবা, মহাজন তো তাগাদা দিচ্ছে। জমিটা বোধহয় আর বাঁচানো যাবে না।"

একদিন অফিসে গিয়ে সাইদুল শুনল, তার ফ্লাইট আবারও অনিশ্চিত। বিলম্বের কারণ কেউ স্পষ্ট করে বলছে না। চার দিন অপেক্ষার পর মালিকের দেখা মিলল। তখন দুপুরের ঘড়িতে সাড়ে তিনটা বাজে। সেদিন ঢাকার আকাশ ছিল মেঘলা, কিন্তু সাইদুলের অন্তরে তখন বইছিল কালবৈশাখী ঝড়।

অফিসের ভেতরে এসি চলছে, মালিক আরাম করে মোবাইলে কথা বলছেন। সাইদুলকে দেখেই তিনি উদাসীনভাবে বললেন, "বসেন মিয়া। ফ্লাইটের ব্যাপারটা একটু জটিল হয়ে গেছে। আগামী মাসে ব্যবস্থা হবে ইনশাআল্লাহ।"

আগামী মাস! এই একই সান্ত্বনা সে দেড় বছর ধরে শুনে আসছে। সাইদুলের মাথার ভেতর যেন অগ্ন্যুৎপাত শুরু হলো। বাবার জীর্ণ চেহারা, মায়ের চোখের জল, শ্বশুরবাড়ির বিদ্রূপ আর বন্ধুদের বাঁকা হাসি— সবকিছু একসঙ্গে তার চোখের সামনে ভিড় করল। হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে পাশে থাকা একটি ভারী কাঠের চেয়ার তুলে নিল সে। মালিক কিছু বুঝে ওঠার আগেই চেয়ারটি সজোরে তার মাথায় আঘাত করল। মুহূর্তেই শুভ্র টাইলের মেঝেতে রক্তের ধারা বইতে শুরু করল। সেই লাল রক্ত যেন সাইদুলের সাড়ে চার লাখ টাকার আর্তনাদ।

অফিসে হৈচৈ পড়ে গেল। কেউ পুলিশ ডাকল, কেউ হাসপাতালে ছুটল। কিন্তু সাইদুল নড়ল না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে আর জল আসছিল না, কেবল বুকের ভেতরটা এক অজানা ভারে থমকে ছিল। সে জানত, আজ তার সব পিছুটান শেষ হয়ে গেছে।

পুলিশ এসে তাকে হাতকড়া পরিয়ে দিল। সাইদুলের সেই সরল চেহারায় তখন কোনো ভাবের পরিবর্তন ছিল না। কেবল একটি প্রশ্নই তার মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল— এই ঋণের বোঝা কি কোনোদিন তার ঘাড় থেকে নামবে?

থানায় মামলা হলো গুরুতর আঘাতের (ধারা ৩২৫ ও ৩২৬)। ‘বিপজ্জনক অস্ত্র’ হিসেবে চেয়ার ব্যবহারের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার মামলাও আনা হলো। সাত বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সম্ভাবনা। সে আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু যে আইন তাকে দেড় বছর ধরে প্রতারিত হওয়া থেকে বাঁচাতে পারেনি, সেই আইনই তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করল।

আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ বাবা অশ্রুসজল চোখে বললেন, "আমার ছেলে খুনি না স্যার। ও শুধু ওর হকের টাকাটা চেয়েছিল। মহাজনের চাপে আমরা পথে বসেছি। ওর ওপর অপমানের বোঝাটা বড় বেশি ভারি ছিল।" কিন্তু আইনের কাছে আবেগ মূল্যহীন। সাইদুলকে যেতে হলো অন্ধকার কারাপ্রকোষ্ঠে।

জেলখানার লোহার শিকের আড়ালে বসে সে এখন কুষ্টিয়ার নদীর কথা ভাবে। গড়াইয়ের জলের সেই মাটির গন্ধ কি আর কোনোদিন নাকে আসবে? মা কি আর কোনোদিন পাতে ডাল-ভাত তুলে দেবেন? সে তো শুধু একটু সচ্ছলতা আর সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তার কপালে জুটল কারাবাস।

এদিকে ‘আমিরা ট্রাভেলস’ কয়েকদিন বন্ধ থেকে আবার চালু হয়ে গেল। আরও কত নাম-না-জানা এজেন্সি এভাবেই মানুষের স্বপ্নের রক্ত চুষে এসি রুমে বসে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। পাংশার ঘাটে দাঁড়িয়ে আজও এক বৃদ্ধ বাবা নদীর দিকে তাকিয়ে থাকেন। জলের ঢেউয়ে তিনি ছেলের কণ্ঠ শোনেন— "বাবা, আমি বড় হতে যাচ্ছি। টাকা পাঠাব। দেড় বছরের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে।"

দেড় বছর পার হয়েছে। সাইদুল ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু এ ফেরা বড় কষ্টের। গ্রামের লোক এখনো বলে, দালালের হাতে টাকা দেওয়াটাই ছিল ভুল। কিন্তু সাইদুলের মতো সাধারণ মানুষের আকাশছোঁয়া স্বপ্নের সামনে বাস্তবতা বরাবরই নড়বড়ে।

কুষ্টিয়ার তিলের খাজা কিংবা কুলফি মালাইয়ের স্বাদ আর তার জীবনে ফেরেনি। পরিবর্তে কপালে জুটেছে গভীর ক্ষত আর দীর্ঘমেয়াদি সাজা। লালনের গানের সেই কলিটিই যেন এখন সাইদুলের জীবনের পরম সত্য— "কী করি কী কই ভূতের বোঝা বই, একদিন ভাবলাম না গুরুর বাণী।"

সাইদুলের এই ট্র্যাজেডি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি চলমান বৃত্ত। প্রতিদিন কোনো না কোনো সাইদুল দালালের খপ্পরে পড়ছে, ফকিরাপুলের মেসে নতুন কেউ নাম লিখিয়ে আসছে। স্বপ্নের এই বিসর্জন অবিরাম চলছে। এই ব্যবস্থা বদলাতে প্রয়োজন সরকারি স্বচ্ছতা ও দালাল সিন্ডিকেটের বিনাশ। তা না হলে সাইদুলের মতো হাজারো পাখির ডানা এভাবেই ভেঙে যাবে, আর স্বপ্নগুলো ধুলোয় মিশে যাবে নিঃশব্দে।

— সমাপ্ত —


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর