প্রকাশিত : ০৭:৩৯
০৮ মে ২০২৬
থ্যালাসেমিয়া বংশগত রক্তের মারাত্মক রোগ। এ রোগের আজীবন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের এখনো রক্তের জন্য হাহাকার করতে হয়। প্রতি মাসে রক্তের জোগান ও ওষুধ কিনতে একজন রোগীর সর্বনিম্ন ১৩ হাজার টাকা খরচ হয়। এতে অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়ে। কারণ, রোগীর অনুপাতে এখনো রক্তদাতা গড়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে প্রতিনিয়ত বাড়ছে রোগীর সংখ্যা। দেশের প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক। এটি মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।
রক্তরোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ রোগ নিয়ে তেমন জনসচেতনতা না থাকায় রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। দুই বাহকের মধ্যে বিয়ে হলে সন্তানদের ২৫ শতাংশ সুস্থ হয়। ৫০ শতাংশ বাহক হয় এবং বাকি ২৫ শতাংশ থ্যালাসেমিয়া রোগী হয়ে জন্ম নেয়। অন্যদিকে একজন বাহক ও একজন বাহক নন—এমন স্বামী ও স্ত্রীর সন্তানদের মধ্যে ৫০ শতাংশ বাহক না হয়ে বাকি ৫০ শতাংশ বাহক হয়ে জন্ম নেয়। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে দুই বাহকের মধ্যে বিয়ে বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ। থ্যালাসেমিয়া রোগ এবং এর প্রতিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রতি বছর ৮ মে ‘বিশ্ব থ্যালাসেমিয়া দিবস’ পালন করা হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘আর নয় আড়ালে, শনাক্ত হোক অজানা রোগী, পাশে দাঁড়াই অবহেলিতদের’।
রক্তরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রক্তের রোগ। এই রোগ হলে রক্তে হিমোগ্লোবিন উৎপাদন প্রয়োজনের চেয়ে কম পরিমাণে হয় বা একেবারেই হয় না। এই হিমোগ্লোবিন ব্যবহার করে লোহিত রক্তকণিকা দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অক্সিজেন সরবরাহ করে। শরীরের ভেতরে অক্সিজেন চলাচল কম হওয়ায় থ্যালাসেমিয়া আক্রান্তরা শারীরিকভাবে দুর্বল বোধ করে। তাদের ত্বক ফ্যাকাশে দেখায় এবং শ্বাস-প্রশ্বাসে সমস্যা হয়। এ ছাড়া অরুচি, জন্ডিস, বারবার সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়া, পেট ব্যথা এবং শারীরিক বৃদ্ধিতে ধীরগতির মতো উপসর্গও দেখা যায়।
বিশ্বের ১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়া বহন করছে। অর্থাৎ ৮ থেকে ৯ কোটি মানুষ এই রোগের বাহক। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব ৩ থেকে ১০ শতাংশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য মতে, দেশের প্রায় ১ কোটি ৮২ লাখ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক। এটি মোট জনসংখ্যার ১১ দশমিক ৪ শতাংশ। গ্রামাঞ্চলে থ্যালাসেমিয়ার বাহক ১১ দশমিক ৬ শতাংশ এবং শহরে ১১ দশমিক ০ শতাংশ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, থ্যালাসেমিয়া বাহকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি রংপুরে ২৭ দশমিক ৭ শতাংশ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রাজশাহীতে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ। তৃতীয় স্থানে থাকা চট্টগ্রামে ১১ দশমিক ২ শতাংশ। এ ছাড়া ময়মনসিংহে ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, খুলনায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, ঢাকায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ, বরিশালে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ এবং সিলেটে সবচেয়ে কম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ১৪ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এই বাহক রয়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে ১২ শতাংশ, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে ১০ দশমিক ৩ শতাংশ এবং ৩০ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের মধ্যে ১১ দশমিক ৩ শতাংশ।
ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক বলেন, থ্যালাসেমিয়া নির্ণয়ের পদ্ধতি নিয়ে তার আপত্তি আছে। আমরা বলি যে, বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া পরীক্ষা করতে। থ্যালাসেমিয়ার বাহক নির্ণয় হলে বিয়ে ভেঙে যেতে পারে। তাই কেউ এটা করতে চাইবে না। যদি কোনো কারণে বর-কনের থ্যালাসেমিয়া ধরা পড়ে, তাহলে তাকে বোঝা হিসেবে দেখা হতে পারে। একজন থ্যালাসেমিয়া বাহক আরেকজন বাহককে বিয়ে করলেই শিশু থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে শনাক্তকরণের পদ্ধতিটি এসএসসি কিংবা এইচএসসি পরীক্ষার সময় বাধ্যতামূলক বা উৎসাহ দিয়ে করা যায়। অথবা প্রসূতি নারীদের অ্যান্টিনেটাল কেয়ারের (এএনসি) সময় মা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না, সেটা জানা যাবে। এতে গর্ভের সন্তানের বিষয়ে আগেই ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। আর এসএসসি কিংবা এইচএসসির সময় কেউ বাহক হিসেবে শনাক্ত হলে তাকে সচেতন করে দেওয়া হবে যে, তুমি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কাউকে বিয়ে না করলে তুমি ও তোমার পরবর্তী প্রজন্ম নিরাপদ থাকবে।
তিনি বলেন, আরেকটি বিষয় হলো, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য সরকারি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ট্রান্সপ্লান্ট ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়নি। সবকিছু করা হচ্ছে অটোলোগাস। মানে নিজে আক্রান্ত, নিজেরই বোনম্যারো দিয়ে নিজেরটা সারানোর চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু ট্রান্সপ্লান্টের মূল সাফল্য হলো অ্যালোজেনিক ট্রান্সপ্লান্ট। সেটা বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত থ্যালাসেমিয়া রোগীদের ক্ষেত্রে করতে পারিনি। এই ধরনের রোগীদের বেঁচে থাকার সুযোগ কম। একই সঙ্গে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুরা সরকারি হাসপাতালে ডে-কেয়ার ভিত্তিতে ট্রান্সফিউশন নিতে পারে। এই সেবা দিনের বেলায় দেওয়া হয়। ফলে এসব শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। সরকারি ডে-কেয়ারে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য ২৪ ঘণ্টা ট্রান্সফিউশন সেবা রাখা জরুরি। তিনি বলেন, বেশিরভাগ সরকারি মেডিকেল কলেজে থ্যালাসেমিয়া রোগীদের জন্য আলাদা কর্নার নেই। কর্নার না থাকায় রোগীদের ব্লাড দেওয়ার জন্য অনেক বড় সিরিয়ালে পড়তে হয়। সিরিয়াল থেকে বাঁচতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাদের প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়।
কর্মসূচি হিসেবে দিবসটি উপলক্ষে বরাবরের মতো এবারও দিনব্যাপী নানাবিধ কর্মসূচির আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশন। আয়োজনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ আবু ইউছুফ ও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ। এ ছাড়া থ্যালাসেমিয়া রোগী, অভিভাবক, রক্তদাতা, শুভানুধ্যায়ী, গণমাধ্যম প্রতিনিধিসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এই আয়োজনে অংশ নেবেন।