নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ৫ মে, ২০২৬: দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ৫ মে'র লেনদেন শেষে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের চাপা উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। ওই দিন সূচক ও লেনদেনের পতনের পর ৬ মে বুধবারের বাজার কেমন যাবে, তা নিয়ে চলছে নানা সমীকরণ। বিশেষ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নেতৃত্বের রদবদলের গুঞ্জন এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রভাবে বাজার বর্তমানে একটি স্পর্শকাতর অবস্থানে রয়েছে। ৫ মে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১০.৬ পয়েন্ট হারিয়ে ৫,২৬৭ পয়েন্টে থিতু হয়েছে। এ দিন লেনদেনের পরিমাণও আগের দিনের তুলনায় ৫.১ শতাংশ কমে ৮.৩ বিলিয়ন টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণে কিছুটা মন্থর গতির ইঙ্গিত দেয়।
সূচকের অবস্থান ও লেনদেনের গতিপ্রকৃতি
৫ মে'র বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, লেনদেন হওয়া ৩৯৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দরপতন হয়েছে ২২৬টির, বিপরীতে মাত্র ১০২টির দর বেড়েছে এবং ৬৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার দর অপরিবর্তিত ছিল। দিনের শুরুর দিকে সূচক কিছুটা ইতিবাচক থাকলেও শেষ এক ঘণ্টার বিক্রয়চাপে বাজার নেতিবাচক অবস্থানে চলে যায়। ব্যাংকিং খাতের শেয়ারগুলোর রেকর্ড ডেট-পরবর্তী মূল্য সমন্বয়ের কারণে সৃষ্ট বড় পতন সূচককে নিচে নামাতে বড় ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও (সিএসই) নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে, যেখানে সার্বিক সূচক ক্যাসপি (CASPI) ৩১.৯ পয়েন্ট হ্রাস পেয়েছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ৬ মে'র বাজারে এই নেতিবাচক প্রবণতা কাটাতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় হওয়া জরুরি।
নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিবর্তনের হাওয়া ও সংস্কার প্রত্যাশা
৬ মে'র বাজারের জন্য অন্যতম বড় খবর হতে পারে বিএসইসিতে নতুন নেতৃত্ব নিয়োগের প্রক্রিয়া। সরকার ইতোমধ্যে বিএসইসি ও আইডিআরএ-র চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা তুলে দিয়ে নতুন আইন পাশ করেছে, যার ফলে যেকোনো অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব। খন্দকার রাশেদ মাকসুদের ২০ মাসের মেয়াদে ডিএসই সূচক প্রায় ৪৯২ পয়েন্ট হারানোর পর বিনিয়োগকারীরা এখন একজন সংস্কারবাদী চেয়ারম্যানের অপেক্ষায় আছেন। চলতি সপ্তাহেই নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রজ্ঞাপন আসতে পারে বলে গুঞ্জন রয়েছে। যদি ৬ মে এই সংক্রান্ত কোনো ইতিবাচক খবর বাজারে আসে, তবে তা সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে আস্থার সঞ্চার করতে পারে। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আবি মির্জা আজিজুল ইসলামের মতে, কেবল নেতৃত্ব পরিবর্তনই যথেষ্ট নয়, বরং কারসাজি বন্ধে কঠোর সুশাসন নিশ্চিত করাই হবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথ।
লিন্ডে বাংলাদেশ ও বড় কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট ইভেন্ট
৬ মে বুধবার পুঁজিবাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্পোরেট দিন। এ দিন প্রকৌশল খাতের বহুজাতিক কোম্পানি লিন্ডে বাংলাদেশ লিমিটেড তাদের পরিচালনা পর্ষদের সভা আহ্বান করেছে। বিকাল ৩টা ৩০ মিনিটে অনুষ্ঠিতব্য এই সভায় কোম্পানির ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হবে। লিন্ডে বাংলাদেশের আর্থিক ফলাফল যদি প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হয়, তবে তা সংশ্লিষ্ট খাতের শেয়ারগুলোতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া, এ দিন রেকর্ড ডেটের কারণে ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি-র (ইবিএল) শেয়ার লেনদেন স্থগিত থাকবে এবং নিটল ইনস্যুরেন্সের শেয়ার শুধুমাত্র স্পট মার্কেটে লেনদেন হবে। একই দিনে ২ বছর মেয়াদী সরকারি ট্রেজারি বন্ডের লেনদেন পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ
দেশের পুঁজিবাজার বর্তমানে বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটেরও মুখোমুখি। ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে জ্বালানি পরিবহনে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম অস্থিতিশীল রয়েছে। ৫ মে'র তথ্য অনুযায়ী, ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল প্রতি ব্যারেল ১১৩.৭৬ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। তেলের এই উচ্চমূল্য দেশের অভ্যন্তরে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করছে। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা বিনিয়োগযোগ্য উদ্বৃত্ত কমিয়ে দিচ্ছে। এছাড়া, মুদ্রানীতি অনুযায়ী নীতি হার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকায় ব্যাংক খাতের তারল্য পরিস্থিতিও কিছুটা চাপে রয়েছে।
৬ মে'র জন্য বিনিয়োগ কৌশল ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ
প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ডিএসইএক্স সূচক বর্তমানে ৫,২৬৫ পয়েন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাপোর্ট লেভেলের কাছাকাছি অবস্থান করছে। যদি ৬ মে সূচক এই লেভেলের উপরে স্থিতিশীল থাকতে পারে, তবে বাজার পুনরায় ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে। ওষুধ ও রসায়ন খাত ৫ মে মোট লেনদেনের ১৫.৯ শতাংশ দখল করে শীর্ষে ছিল, যার পরেই ছিল ব্যাংকিং ও প্রকৌশল খাত। ৬ মে'র বাজারেও এই তিনটি খাতের আধিপত্য বজায় থাকতে পারে। বিশ্লেষকরা বিনিয়োগকারীদের আবেগের বশবর্তী হয়ে শেয়ার কেনাবেচা না করে কোম্পানির মৌলিক ভিত্তি (ফান্ডামেন্টালস) এবং লভ্যাংশের ইতিহাসের ওপর নজর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নানা গুজব থেকে দূরে থেকে ডিএসইর অফিসিয়াল তথ্য বা বিএসইসিতে অভিযোগ জানানোর মডিউল ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ২০২৬ সালের ৬ মে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি 'দিকনির্দেশনামূলক দিন'। নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন নেতৃত্ব এবং লিন্ডে বাংলাদেশের মতো বড় মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারের পারফরম্যান্সই নির্ধারণ করে দেবে বাজার আগামী সপ্তাহে কোন পথে হাঁটবে।
Leave Your Comments