প্রকাশিত :  ১৯:৫০
০৩ মে ২০২৬

মধ্যবিত্ত

মধ্যবিত্ত

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণিটি কেবল একটি পরিসংখ্যানগত পরিচয় নয়, বরং এটি এক অন্তহীন লড়াইয়ের মহাকাব্য। আসাদ সাহেবের মতো লক্ষ লক্ষ ‘হোয়াইট কলার’ মানুষ—যারা টিসিবির ট্রাকের লাইনে দাঁড়িয়ে সস্তায় চাল কিনতে পারেন না, আবার বাজারের আকাশচুম্বী দামের কাছে আত্মসমর্পণও করতে পারেন না—তাদের জীবন আজ এক অদ্ভুত ‘রম্যবাস্তবতার’ চোরাবালিতে আটকে পড়েছে। এটি কেবল একটি আখ্যান নয়, বরং ২০২৬ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক মানচিত্রের এক অতিবাস্তব প্রতিফলন।

ভোরবেলা আসাদ সাহেব যখন বাজারের থলে হাতে বের হন, তখন তার চেহারায় এক ধরনের দার্শনিক গাম্ভীর্য থাকে। আসলে এই গাম্ভীর্য তার অন্তরের হাহাকার লুকানোর এক সুনিপুণ ঢাল। ২০২৬ সালের মার্চের এক সকালে তিনি যখন কাঁচাবাজারে প্রবেশ করলেন, তখন তার হাতের ৫,০০০ টাকা তাকে এক তীব্র উপহাসের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল। মনে মনে তিনি হিসাব মেলালেন—ফেব্রুয়ারিতেই তো দেশের বার্ষিক মুদ্রাস্ফীতির হার ছিল ৯.১৩ শতাংশ, যা গত দশ মাসের রেকর্ড ভেঙেছে। পকেটের টাকাগুলো যেন আজ কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে। যে চাল কদিন আগেই তিনি ৫০ টাকায় কিনতেন, আজ তার দর ৮০ টাকা ছুঁইছুঁই।

মুদ্রাস্ফীতির এই ভয়াবহতা কেবল চাল বা ডালে সীমাবদ্ধ নয়। ডিমের দোকানে গিয়ে তিনি শুনলেন খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি ৯.৩০ শতাংশে ঠেকেছে। অথচ পাশের দেশ শ্রীলঙ্কা, যারা চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে ছিল, তারা তাদের মুদ্রাস্ফীতি ০.৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। আসাদ সাহেবের তিক্ত মনে প্রশ্ন জাগে—ভারত যেখানে ২.৭ শতাংশে স্থিতিশীল, সেখানে তার দেশে কেন এই হার ৮ শতাংশের নিচে নামছে না? তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ডিমের বদলে ডালের দিকে হাত বাড়ান; কিন্তু ডাল ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের মুদ্রাস্ফীতি যে ইতিমধ্যে ২২.৩৪ শতাংশে পৌঁছেছে, পকেটের টানই তাকে তা জানিয়ে দেয়।

বাজার থেকে যখন তিনি অর্ধেক পূর্ণ থলে নিয়ে বাড়ি ফেরেন, স্ত্রীর ‘মাছ কেনেননি?’—প্রশ্নের উত্তরে এক চিলতে শুকনো হাসি দেন। বলেন, ‘মাছ খাওয়া তো এখন বিলাসিতা, আমি বরং ওমেগা-৩-এর জন্য শাক-সবজিতেই মন দিয়েছি।’ অভাবকে এই যে কৌতুক বা রম্য দিয়ে ঢাকা, এটাই এ দেশের নিম্ন-মধ্যবিত্তের প্রধান আত্মরক্ষা কৌশল। কিন্তু অর্থনীতির ভাষায় এটি একটি ‘নীরব সংকট’, যেখানে ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় মানুষ নিজের ক্যালরি গ্রহণ কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে।

আসাদ সাহেবের জীবনের দ্বিতীয় বড় যুদ্ধের নাম ‘বাড়ি ভাড়া’। শেওড়াপাড়ার যে দুই কামরার ফ্ল্যাটে তিনি থাকেন, তার ভাড়া প্রতি বছরই কোনো এক অলৌকিক কারণে বেড়ে যায়। জানুয়ারি মাসের শুরুতে বাড়িওয়ালা যখন ভাড়া আরও ১,০০০ টাকা বাড়ানোর নোটিশ দিলেন, আসাদ সাহেব তখন ১৯৯১ সালের বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনের কথা ভাবছিলেন। কাগজে-কলমে সেখানে দুই বছরের আগে ভাড়া বাড়ানো নিষেধ এবং তা বাড়ির বাজার মূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি চলবে না। কিন্তু বাস্তবের গলিতে এই আইনের কোনো প্রবেশাধিকার নেই।

ঢাকার প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ ভাড়া বাড়িতে থাকেন এবং আসাদ সাহেবের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্তরা তাদের আয়ের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশই ব্যয় করেন শুধু মাথার ওপর একটি ছাদ ধরে রাখতে। আসাদ সাহেবের মাসিক ৪০,০০০ টাকা বেতনের অর্ধেকই চলে যায় বাড়ি ভাড়ায়। বাকিটা দিয়ে কোনোমতে ইউটিলিটি বিল আর ডাল-ভাত চলে। ঢাকার অধিকাংশ ভাড়াটিয়া আজ সঞ্চয়হীন এক যান্ত্রিক জীবন পার করছেন, যাদের একটি বড় অংশ ঋণের জালে আবদ্ধ। বাড়িওয়ালা যখন রসিদ দিতে অস্বীকার করেন কিংবা পানির সমস্যা নিয়ে কথা বললে ‘পছন্দ না হলে বাড়ি ছেড়ে দিন’ বলে হুমকি দেন, তখন আসাদ সাহেবের মনে হয় তিনি যেন মধ্যযুগীয় কোনো সামন্ততন্ত্রের প্রজা।

আসাদ সাহেবের আতঙ্ক চরমে ওঠে যখন পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়। বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় মাথাপিছু মাত্র ১,০৭০ টাকা, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। ফলে চিকিৎসার প্রায় ৭৩ শতাংশ ব্যয় তাকে নিজের পকেট থেকেই বহন করতে হয়। বাবার হার্টের সমস্যার জন্য সরকারি হাসপাতালে গিয়ে তিনি দেখেন যে বেড নেই, ডাক্তার নেই; উল্টো ওষুধের জন্য বাইরে থেকে টাকা খরচ করতে হচ্ছে। ওষুধের খরচই এখন মোট ব্যক্তিগত ব্যয়ের প্রায় ৫৫ শতাংশ দখল করে নেয়।

বাধ্য হয়ে প্রাইভেট ক্লিনিকে গেলে শুরু হয় ‘বিল শক’। অপ্রয়োজনীয় টেস্ট আর নকল ওষুধের ভয়ের মধ্যে আসাদ সাহেবের মনে হয়, চিকিৎসা পাওয়াটা যেন লটারি জেতার মতো ভাগ্যের ব্যাপার। তিনি প্রায়ই পরিহাস করে বলেন, ‘আমাদের মতো মানুষের জন্য মরে যাওয়াটাই হয়তো সস্তা, কারণ বেঁচে থাকার ওষুধের বিল মেটাতে কঙ্কাল রপ্তানি ছাড়া আর কোনো পথ নেই।’ এই রম্য আসলে এক করুণ সত্যকে ফুটিয়ে তোলে—একটি বড় অসুখ যেকোনো সময় এই পরিবারটিকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নামিয়ে দিতে পারে।

সন্তান নিশির পড়াশোনার খরচ মেলাতে গিয়ে আসাদ সাহেবকে হিমশিম খেতে হয়। বেসরকারি স্কুলের বেতন প্রতি বছর ১৫-২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। শিক্ষা খাতের মুদ্রাস্ফীতি এখন ৮.৩২ শতাংশের ঘরে। নিশির স্কুলের বেতন জোগাতে আসাদ সাহেব মাঝেমধ্যে নিজের অফিসের টিফিনের টাকা বাঁচান। দুপুরের খাবার না খেয়ে শুধু এক কাপ চা খেয়ে কাটিয়ে দেন, যাতে মেয়ের জন্য একটি নতুন গাইড বই বা খাতা কেনা যায়। মধ্যবিত্তের কাছে শিক্ষা হলো সামাজিক সোপানে উপরে ওঠার একমাত্র মই, কিন্তু বর্তমান অর্থনীতিতে সেই মইয়ের প্রতিটি ধাপ এতটাই পিচ্ছিল যে নিশির মতো হাজারো মেধাবীর স্বপ্ন আজ নিলামে উঠছে।

প্রতিদিন সকালে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আসাদ সাহেব জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব নিজের পকেটে অনুভব করেন। ডিজেল ও অকটেনের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ প্রায় ৭.৪৭ শতাংশ বেড়ে গেছে। অফিসের যাতায়াত খরচ আগে যেখানে ৩,০০০ টাকা ছিল, এখন তা ৫,০০০ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। বাসের কন্ডাক্টরের সঙ্গে ভাড়ার তর্কের সময় যখন সে বলে, ‘তেলের দাম জানেন না মামা? কোন দেশে যুদ্ধ লাগাইছে, আর দাম বাড়ছে এখানে,’ তখন আসাদ সাহেব বোঝেন বিশ্ব রাজনীতির আঁচ কীভাবে তার অতি সাধারণ জীবনে লাগে। জ্বালানি তেলের এই মূল্যবৃদ্ধি পরোক্ষভাবে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের সবচেয়ে বড় সংকটের নাম ‘লজ্জা’। ঈদের সময় যখন তিনি বাজারের ভিড়ে যান, তখন দেখেন তার সামর্থ্য আর সন্তানের চাহিদার মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান। উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নিতে গিয়ে প্রায় ২৮ শতাংশ পরিবার আজ চড়া সুদে ঋণের আশ্রয় নিচ্ছে। আসাদ সাহেবও এর ব্যতিক্রম নন। ক্রেডিট কার্ডের কিস্তি আর পার্সোনাল লোনের চাপে তিনি আজ এক আধুনিক ক্রীতদাসে পরিণত হয়েছেন। বাড়িতে মেহমান এলে হাসিমুখে আপ্যায়ন করলেও ভেতরে ভেতরে তিনি হিসাব করেন—এই মেহমানদারির কারণে আগামী সপ্তাহে হয়তো তাকে রাতের খাবার বাদ দিতে হবে। নিজের অভাবকে আড়াল করে রাখার এই যে লড়াই, একেই বলা হয় ‘লজ্জার দেওয়াল’।

দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি যখন ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ৩.৬৯ শতাংশে নামে, আসাদ সাহেব সেই জটিল অর্থনীতি না বুঝলেও নিজের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াটা স্পষ্ট টের পান। বড় বড় ব্যবসায়ীরা যখন ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা নিয়ে বিদেশে পাচার করছেন, তখন সাহেবকে সামান্য ঋণের জন্য ব্যাংকে দশবার ঘুরতে হয়। অন্যদিকে তার ছোট ভাই গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বেকার বসে আছে; শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব এখন ১৫ শতাংশের বেশি। মজুরি বৃদ্ধির হার মুদ্রাস্ফীতির চেয়ে কম হওয়ায় মানুষের প্রকৃত আয় ক্রমাগত কমছে।

আসাদ সাহেবের এই জীবন কোনো কল্পকাহিনী নয়, এটি একটি জীবন্ত প্রামাণ্যচিত্র। একদিকে আমরা উন্নয়ন আর এলডিসি (LDC) থেকে উত্তরণের স্বপ্ন দেখছি, অন্যদিকে আসাদ সাহেব এক কেজি মুরগি কিনতে গিয়ে দশবার ভাবছেন। রাতে ঘুমানোর আগে তিনি যখন হিসাব করেন আলুর দাম আগামীকাল ২ টাকা বাড়বে কি না, তখন সেই গাণিতিক হিসাব কোনো আধুনিক ক্যালকুলেটরে ধরে না।

এই শ্রেণির মানুষরা না পারে মরে যেতে, না পারে রাজার মতো বাঁচতে। তারা কেবল বেঁচে থাকে একটি সুদিনের অপেক্ষায়। আসাদ সাহেব যখন তার ছেঁড়া স্যান্ডেলটি মুচির কাছে সেলাই করতে নিয়ে যান, তখন তিনি বুঝতে পারেন যে অর্থনীতির চাকা মেরামত করা যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন এই পকেটশূন্য পাঞ্জাবি পরে ‘ভদ্রলোক’ সেজে পথে হাঁটা।

পরদিন সকালে তিনি যখন আবার বাজারের থলে হাতে বের হন, তখন তার মুখে থাকে সেই একই অমলিন হাসি—যে হাসি আসলে এক নীরব প্রতিবাদের নাম। আসাদ সাহেবরা যদি হেরে যান, তবে একটি জাতির মেরুদণ্ডই ভেঙে পড়বে। কারণ তারাই এই দেশের সেই নীরব কর্মীবাহিনী, যারা একটি রাষ্ট্রকে সচল রাখে।


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর