প্রকাশিত :  ১২:০৫
২৮ এপ্রিল ২০২৬

সংযোগহীন সময়ের সেতু—পাঁচগাঁওয়ের শতবর্ষী ডিসপেন্সারির নীরব আর্তনাদ

সংযোগহীন সময়ের সেতু—পাঁচগাঁওয়ের শতবর্ষী ডিসপেন্সারির নীরব আর্তনাদ

সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার পাঁচগাঁও—সবুজে ঘেরা এক নিভৃত জনপদ। এই শান্ত গ্রামের বুকেই দাঁড়িয়ে আছে ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী—কাশীচন্দ্র-আনন্দময়ী ডিসপেন্সারী। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম প্রদেশের দক্ষিণ শ্রীহট্ট মহকুমার অন্তর্গত এই চিকিৎসাকেন্দ্রটি আজকের পাঁচগাঁও ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পূর্বসূরি। সময়ের বিবর্তনে স্বাস্থ্যসেবা স্থানান্তরিত হয়েছে পাশের আধুনিক ভবনে, কিন্তু পুরোনো এই স্থাপনাটি যেন আটকে আছে অতীতের এক নিঃশব্দ প্রহরায়।

১৯৪১ সালের ১৬ এপ্রিল, বাংলা নববর্ষের সূচনালগ্নে, এই ডিসপেন্সারির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তৎকালীন আসাম প্রদেশের জনস্বাস্থ্য বিভাগের মন্ত্রী এবং কাছাড় জেলার হাইলাকান্দি থেকে নির্বাচিত বিধানসভার সদস্য শ্রীযুক্ত হীরেন্দ্র চন্দ্র চক্রবর্তী। ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই ভবনের গায়ে এখনো শোভা পায় শ্বেতপাথরে খোদাইকৃত সেই স্মারক ফলক—যা ইতিহাসের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, নীরবে জানিয়ে দেয় তার গৌরবগাথা।

একসময় এ অঞ্চলের মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার ভরসাস্থল ছিল এই ডিসপেন্সারী। গ্রামের অসংখ্য মানুষ এখানেই পেয়েছে সেবা, স্বস্তি ও সুস্থতার আশ্বাস। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে যতই আধুনিকতা এগিয়েছে, ততই উপেক্ষিত হয়েছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি। বর্তমানে এটি প্রায় পরিত্যক্ত—দেয়ালে ফাটল, ছাদের ক্ষয়, আর চারপাশে আগাছার দখল যেন তার অস্তিত্বকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছে।

প্রায় এক শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এই ভবনটি কেবল একটি পুরোনো চিকিৎসাকেন্দ্র নয়; এটি শ্রীহট্ট অঞ্চলের সামাজিক ও প্রশাসনিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। অথচ সংরক্ষণের অভাবে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে এর স্বকীয়তা ও ঐতিহ্যিক মূল্য।

স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত এই স্থাপনাটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে ঘোষণা করে যথাযথ সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। তাদের মতে, এটি শুধু একটি ভবন নয়—এটি এক যুগের স্মৃতি, এক ইতিহাসের ধারক।

প্রশ্ন জাগে—এভাবেই কি একের পর এক শ্রীহট্টের ইতিহাসবাহী স্থাপনাগুলো হারিয়ে যাবে? নাকি এখনই সময়, অতীতকে বাঁচাতে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে আসার?

পাঁচগাঁওয়ের এই শতবর্ষী ডিসপেন্সারী আজও অপেক্ষায়—কারও নজর পড়বে, কেউ তার গল্প শুনবে, আর হয়তো একদিন আবার সে ফিরে পাবে তার হারানো মর্যাদা।


Leave Your Comments




সারাদেশ এর আরও খবর