প্রকাশিত :  ১১:১৯
২৬ এপ্রিল ২০২৬

ত্রিপুরা মহারাজার কাচারি বাড়ি—শ্রীমঙ্গলে ইতিহাসের নীরব প্রহরী

ত্রিপুরা মহারাজার কাচারি বাড়ি—শ্রীমঙ্গলে ইতিহাসের নীরব প্রহরী

সংগ্রাম দত্ত: শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহরের হবিগঞ্জ রোডের ব্যস্ততার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে এক ভগ্নপ্রায়, অথচ গৌরবময় অতীতের স্মারক—ত্রিপুরা মহারাজার কাচারি বাড়ি। শতাব্দীপ্রাচীন এই স্থাপনাটি কেবল একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি শ্রীহট্ট অঞ্চলের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

উনিশ শতকের শেষভাগে ডাউকি ফল্টের প্রলয়ঙ্কারী ভূমিকম্পের পরপরই তৎকালীন ত্রিপুরা রাজপরিবার এই অঞ্চলে তাদের প্রশাসনিক কার্যক্রম সুসংগঠিত করার উদ্যোগ নেয়। সেই ধারাবাহিকতায় মহারাজ বীরচন্দ্র মাণিক্য দেববর্মন বাহাদুরের আমলে শ্রীমঙ্গলের কেন্দ্রস্থলে প্রায় পৌনে দুই একর জমির ওপর নির্মিত হয় এই কাচারি বাড়ি। মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় এবং স্থানীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা।

পরবর্তীকালে ত্রিপুরা মহারাজ বীরেন্দ্র কিশোর মাণিক্য বাহাদুরের শাসনামলে এই কাচারি বাড়ি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। তখনকার দিনে শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ, ভানুগাছ, শমশেরনগরসহ বৃহত্তর এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ ত্রিপুরা রাজপরিবারের অধীন ছিল। বর্তমান ত্রিপুরা বলতে আমরা যে পার্বত্য অঞ্চলকে বুঝি, তার বাইরেও শ্রীহট্টের বিস্তীর্ণ জনপদ একসময় ত্রিপুরা মাণিক্য রাজাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল—যার প্রমাণ মেলে শ্রীযুক্ত অচ্যুৎচরণ চৌধুরীর ‘শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত’ এবং কৈলাশ চন্দ্র সিংহ রচিত ‘রাজমালা’ গ্রন্থে।

১৯৪৭ সালের ভারত ভাগের পর বদলে যায় ইতিহাসের গতিপথ। পাকিস্তান সরকার এই কাচারি বাড়িটি অধিগ্রহণ করে এবং ধীরে ধীরে এটি সরকারি প্রশাসনিক কাজে ব্যবহৃত হতে থাকে। বর্তমানে ভবনটি শ্রীমঙ্গল উপজেলার ভূমি অফিস (এসি ল্যান্ড) হিসেবে ব্যবহৃত হলেও এর প্রাচীন অংশ অনেকটাই অবহেলায় পড়ে আছে।

স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে একতলা এই ভবনটি নিঃসন্দেহে অনন্য। প্রায় ত্রিশ ফুট প্রস্থ ও কুড়ি ফুট দৈর্ঘ্যের কাঠামোতে রয়েছে তিনটি কক্ষ, আটটি দরজা ও নয়টি জানালা। এক ফুট পুরু দেয়াল, চুন-সুরকির গাঁথুনি এবং সূক্ষ্ম কারুকাজ—সব মিলিয়ে এটি ব্রিটিশ-উপনিবেশিক ও দেশীয় স্থাপত্যরীতির এক সুন্দর সংমিশ্রণ। এখনও দেয়ালের অলংকরণে সেই শৈল্পিক ছোঁয়া চোখে পড়ে।

কিন্তু সময়ের নির্মমতায় আজ এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। দেয়ালজুড়ে বড় বড় ফাটল, ছাদের ক্ষয়, আর শেওলায় ঢাকা পড়া গাঁথুনি জানান দিচ্ছে দীর্ঘদিনের অবহেলার গল্প। কোথাও আংশিক, কোথাও বা সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি।

একসময় যে কাচারি বাড়ি প্রজাদের ভিড়ে মুখর ছিল, যেখানে খাজনা আদায়ের দিনে জমজমাট পরিবেশ বিরাজ করত, আজ সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা। ইতিহাসের সেই ব্যস্ত দিনগুলো যেন কেবল স্মৃতিতেই রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কাচারি বাড়িটি শুধু ত্রিপুরা রাজপরিবারের প্রশাসনিক কার্যক্রমের নিদর্শন নয়; বরং এটি শ্রীহট্ট অঞ্চলের উপনিবেশিক ও দেশীয় শাসনব্যবস্থার এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোগসূত্র। তাই দ্রুত এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে চিহ্নিত করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

প্রশ্ন রয়ে যায়—যে স্থাপনাটি একসময় একটি অঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল, সেটি কি এভাবেই সময়ের অতলে হারিয়ে যাবে? নাকি যথাযথ উদ্যোগে আবারও ফিরে পাবে তার প্রাপ্য মর্যাদা?

শ্রীমঙ্গলের এই কাচারি বাড়ি আজও নীরবে দাঁড়িয়ে আছে—ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে, সংরক্ষণের প্রত্যাশায়।



Leave Your Comments




সারাদেশ এর আরও খবর