প্রকাশিত :  ১১:৫৮
২৪ এপ্রিল ২০২৬

বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা!

বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছা!

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ

এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বিশালতার মাঝে প্রবাহমান অগণিত প্রাণের স্পন্দনে মানুষ এক অনন্য রহস্যময় সত্তা। পৃথিবীর ধূলিকণা থেকে শুরু করে আকাশের মেঘচুম্বী অট্টালিকা পর্যন্ত যেখানেই মানুষের পদচিহ্ন পড়েছে, সেখানেই রচিত হয়েছে এক আশ্চর্য ঐক্যের মহাকাব্য। সেই ঐশ্বর্যের শিখরে আসীন কোনো রাজকীয় ব্যক্তিত্ব হোক কিংবা ফুটপাতের ধুলোয় পড়ে থাকা কোনো ব্রাত্য জন—সবার প্রাণের গহীনে এক অদ্ভুত অভিন্নতা লক্ষ করা যায়। মৃত্যুর শীতল ও অনিবার্য আহ্বান কেউ স্বেচ্ছায় বরণ করতে চায় না; বরং প্রাণের প্রতিটি স্পন্দনে, হৃদয়ের নিভৃততম প্রকোষ্ঠে মানুষ কেবল বেঁচে থাকার পক্ষেই তার অটল সংকল্প ধরে রাখে। জীবন আসলে কেবল একটি জৈবিক যন্ত্রের ছন্দোবদ্ধ নিঃশ্বাস নয়, বরং এটি এক দুর্দমনীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যা প্রতিকূলতার রুক্ষ মরুভূমিতেও এক বিন্দু জলের সন্ধানে মরিয়া হয়ে ওঠে।

জীবনকে তুলনা করা যেতে পারে এক অতি সূক্ষ্ম ও কোমল অদেখা সুতোর সঙ্গে, যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিটি প্রাণকে এক নিগূঢ় বন্ধনে গেঁথে রেখেছে। এই মায়াবী সুতোর এক প্রান্তে যদি থাকে নীরব যাতনা ও অপ্রাপ্তির দীর্ঘশ্বাস, তবে অন্য প্রান্তে টিমটিম করে জ্বলে এক অনির্বাণ আশার প্রদীপ। এই মৃদু আলোটুকুই মানুষকে প্রতিদিনের ধূসর ভোরে নতুন করে জাগিয়ে তোলে, শ্রান্ত-ক্লান্ত ও অবসন্ন শরীরকে পুনরায় সচল করে এবং চূর্ণবিচূর্ণ মনকে নতুন এক পথের অভিমুখে ধাবিত করে। যখন চারদিকের সব পরিচিত দরজা রুদ্ধ হয়ে আসে, যখন মনে হয় সবকিছু শেষ, তখনও মানুষের অন্তরাত্মা এক অস্ফুট স্বরে বলে ওঠে—‘আরেকটু দেখি... হয়তো এবার কিছু বদলাবে, হয়তো এই গাঢ় অন্ধকারই আলোর প্রসববেদনা।’ এই ‘হয়তো’ শব্দটির গুপ্ত আশার মধ্যেই নিহিত আছে মানবসভ্যতার টিকে থাকার পরম রহস্য।

মানুষের বেঁচে থাকার এই আকাঙ্ক্ষা কেবল টিকে থাকার এক আদিম তাগিদ নয়, বরং এটি এক চিরন্তন দার্শনিক গাথা। বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে যখন পৃথিবী দুটি মহাযুদ্ধের ধ্বংসলীলা প্রত্যক্ষ করেছিল, তখন অস্তিত্ববাদ দর্শন মানুষের সামনে এক নতুন আয়না তুলে ধরে। অস্তিত্ববাদীরা বিশ্বাস করেন যে মানুষের অস্তিত্ব তার সারসত্তার পূর্বগামী; অর্থাৎ মানুষ প্রথমে পৃথিবীতে আসে, তারপর তার প্রতিটি কর্ম ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে সে নিজের সত্তাকে তিলে তিলে নির্মাণ করে। এই দর্শনের গভীরে নিহিত আছে ব্যক্তিমানুষের অপার স্বাধীনতা ও সেই স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত গুরুভার দায়িত্ব। মানুষ যখন নিজেকে এক শূন্যতা বা ‘নাথিংনেস’-এর মুখোমুখি দাঁড় করায়, তখনই সে বুঝতে পারে—তার বেঁচে থাকার সার্থকতা কেবল নিঃশ্বাস নেওয়ার মধ্যে নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের অর্থ অন্বেষণের মধ্যেই।

মনীষী ভিক্টর ফ্রাঙ্কল, যিনি নাৎসিদের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের অবর্ণনীয় বীভৎসতা থেকে অক্ষত ফিরেছিলেন, তিনি লক্ষ করেছিলেন যে কেবল তারাই সেই নরকসম পরিবেশে টিকে থাকতে পেরেছিলেন যাদের অন্তরে কোনো এক সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য সজীব ছিল। ফ্রাঙ্কলের মতে, মানুষের কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নেওয়া সম্ভব হলেও একটি স্বাধীনতা কেউ কখনো হরণ করতে পারে না—তা হলো যেকোনো ঘোরতর পরিস্থিতিতে নিজের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা। এই মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতাই মানুষকে মৃত্যুর উপত্যকা থেকেও জীবনের আলোর দিকে ফিরিয়ে আনে। যেমন আলবের কামু তাঁর ‘দ্য মিথ অব সিসিফাস’ প্রবন্ধে জীবনের আপাত অর্থহীনতাকে স্বীকার করেও সিসিফাসের সেই অন্তহীন সংগ্রামকে আনন্দের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। সিসিফাস যখন পাহাড়ের চূড়ায় পাথর তোলার ব্যর্থ চেষ্টা বারবার করে, তখন সেই সংগ্রামের মুহূর্তেই সে নিজের ভাগ্যের অধিপতি হয়ে ওঠে।

মানুষের এই বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা কেবল বুদ্ধিদীপ্ত মস্তিষ্কের ফসল নয়, বরং এটি শরীরের প্রতিটি কোষে খোদিত এক আদিম প্রবৃত্তি। মৃত্যুর অনিবার্যতা নখদর্পণে থাকা সত্ত্বেও মানুষ স্বেচ্ছায় সেই পরিণতির দিকে পা বাড়ায় না, কারণ থেমে যাওয়ার মাঝে কোনো মহাকাব্য থাকে না। জীবনের সার্থকতা নিহিত থাকে টিকে থাকার প্রতিটি মুহূর্তের ছোট ছোট বিজয়ে—যেখানে সম্ভাবনা এখনো নিঃশ্বাস নেয় এবং আগামীর হাতছানি বিদ্যমান থাকে। কেন একজন ক্ষুধার্ত মানুষ, যার শারীরিক শক্তি প্রায় নিঃশেষ, সে-ও এক মুঠো ভাতের আশায় দিনের পর দিন লড়াই চালিয়ে যায়? কেন একজন মুমূর্ষু রোগী শয্যাশায়ী হয়েও হাসপাতালের সাদা ছাদের দিকে তাকিয়ে আগামী সুস্থতার স্বপ্ন বুনে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিদ্যার গভীরে। মানুষের টিকে থাকার প্রবৃত্তি বা ‘সারভাইভাল ইনস্টিংক্ট’ হলো এক শক্তিশালী জৈবিক ব্যবস্থা, যা কোনো বিপদের সংকেত পেলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে—যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা ‘ফাইট-অর-ফ্লাইট রেসপন্স’ বলি।

এই শারীরিক প্রতিক্রিয়ার পাশাপাশি কাজ করে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সক্ষমতা, যাকে বিশেষজ্ঞরা ‘সাইকোলজিক্যাল রেজিলিয়েন্স’ বা মানসিক স্থিতিস্থাপকতা হিসেবে অভিহিত করেন। স্থিতিস্থাপকতা কেবল আঘাত সহ্য করার ক্ষমতা নয়, বরং আঘাত পাওয়ার পর পুনরায় পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসার বা আরও শক্তিশালী হয়ে জেগে ওঠার এক আশ্চর্য ক্ষমতা। যারা চরম সংকটের মুহূর্তেও ভেঙে পড়েন না, তাদের মধ্যে কিছু বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য দেখা যায়—যেমন অদম্য আশাবাদ, খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং একটি শক্তিশালী সামাজিক সংযোগ। এই বৈজ্ঞানিক কাঠামোর বাইরেও মানুষের ভেতরে এক অদৃশ্য টান কাজ করে। মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, মানুষের অবচেতন মনে দুটি বিপরীতমুখী প্রবৃত্তি কাজ করে—একদিকে জীবনতৃষ্ণা, অন্যদিকে মৃত্যুপ্রবৃত্তি। স্বাভাবিক অবস্থায় জীবনতৃষ্ণাই জয়ী হয়। মানুষ তার সচেতন চিন্তার ঊর্ধ্বে গিয়েও জীবনের প্রতি টান অনুভব করে, কারণ তার অবচেতন মন প্রতিনিয়ত তাকে সুরক্ষার বার্তা পাঠায়।

তাত্ত্বিক আলোচনার বাইরে যখন আমরা রূঢ় বাস্তবের দিকে দৃষ্টিপাত করি, তখন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বেঁচে থাকার এই দুর্দম ইচ্ছা এক করুণ কিন্তু মহিমান্বিত রূপ ধারণ করে। ঢাকার ঘিঞ্জি বস্তিগুলোতে কিংবা চরাঞ্চলের দুর্গম জনপদে বসবাসকারী মানুষগুলোর জীবন দেখলে বোঝা যায়, বেঁচে থাকাটা সেখানে কত বড় এক অলৌকিক প্রাপ্তি। কড়াইল বা ধোলাইপাড়ার বস্তিবাসীদের জীবনে কোনো কিছুরই নিশ্চয়তা নেই—না আছে বাসস্থানের স্থায়ী ঠিকানা, না আছে বিশুদ্ধ পানির সুযোগ। অথচ এই চরম দারিদ্র্যের মাঝেও তারা জীবনের স্পন্দন ধরে রাখে প্রবল প্রতাপে। নাজমা নামের এক বস্তিবাসী নারী, যার ঘর আর দোকান একই ছোট কুঠুরিতে সীমাবদ্ধ, তিনি সেই প্রচণ্ড দাবদাহেও হাসিমুখে চা বিক্রি করে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেন। হাসিনা নামের আরেক নারী, যার স্বামী অসুস্থ এবং পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনেক, তিনি নিজের ক্ষুদ্র আয় দিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন অতি কষ্টে। জরিনা বেগমের গল্পটি আরও প্রেরণাদায়ক; স্বামীপরিত্যক্তা হয়েও তিনি হাঁস-মুরগি পালন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার মাধ্যমে নিজেকে এক সফল উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তাদের এই লড়াই প্রমাণ করে যে টিকে থাকার ইচ্ছা যখন প্রবল হয়, তখন দারিদ্র্য বা সামাজিক বাধা আর বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায় না।

এই মানুষগুলোর জন্য প্রতিটি সকাল মানেই নতুন এক রণক্ষেত্র। তারা যখন সস্তা শাকসবজি বা চাল কিনতে বাজারে যায়, তখন তাদের চোখে হতাশা নয়, বরং টিকে থাকার এক অবিশ্বাস্য জেদ লক্ষ করা যায়। এই জেদটুকুই তাদের জীবনের শেষ সম্বল। আমরা প্রতিদিন রাজপথে যে শত শত রিকশাচালককে দেখি, তাদের প্রত্যেকের পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার হাড়ভাঙা খাটুনি। তারা থামতে জানে না, কারণ থেমে যাওয়ার অর্থ একটি পরিবারের স্বপ্নের সলিল সমাধি। বাংলাসাহিত্য চিরকালই জীবনের এই অন্ধকার-আলোর খেলাকে নিপুণভাবে চিত্রিত করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে জীবনানন্দ দাশ পর্যন্ত প্রত্যেকের লেখনীতে বেঁচে থাকার হাহাকার ও আনন্দ ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় ধরা দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের দর্শনে জীবন মানেই নিরন্তর পথচলা—‘চরৈবেতি’। তিনি মনে করতেন, মানুষের ধর্ম হলো তার সুপ্ত সত্তাকে বিকশিত করা এবং কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে স্থির না হওয়া। তাঁর কাছে বেঁচে থাকা আর অস্তিত্বশীল হওয়া এক কথা নয়; যারা আত্মোত্তীর্ণের চেষ্টা করে না, তারা প্রতীকী অর্থে বেঁচে থাকলেও প্রকৃত অর্থে অস্তিত্বশীল নয়।

জীবনানন্দ দাশের কাব্যে যদিও এক ধরনের বিষাদ ও ক্লান্তির আস্তরণ লক্ষ করা যায়, কিন্তু সেই ধূসরতার আড়ালেও জীবনের এক তপ্ত অনুভূতি সবসময় প্রবাহমান। তিনি যখন লেখেন—‘আমরা রক্তের মতো অশ্রু ঢেলে এই জীবনের আলো জ্বেলে রাখি’, তখন তা মূলত সমগ্র মানবজাতির টিকে থাকার এক পরম সত্যকে প্রকাশ করে। জীবনানন্দের কবিতায় মৃত্যু যেন জীবনেরই এক অন্য রূপ, এক পরম শান্তি, যা ক্লান্তির শেষে কাম্য। কিন্তু সেই শান্তির আগে তিনি জীবনের সব রং, রূপ ও গন্ধকে আস্বাদন করার যে তীব্র ব্যাকুলতা দেখিয়েছেন, তা অতুলনীয়। সাহিত্যে জীবনকে কতভাবেই না বর্ণনা করা হয়েছে—কখনো নদী হিসেবে যা অবিরাম বাঁক বদলিয়ে সমুদ্রের দিকে ধাবিত হয়, কখনো পদ্ম হিসেবে যা কর্দমাক্ত জলেও তার পবিত্রতা রক্ষা করে, আবার কখনো পাখির ডানার ঝাপটানি হিসেবে যা মুক্তির আকুতি জানায়। পি. লাল তাঁর কবিতায় জীবনকে একটি পাঁচপাপড়ি ফুলের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে প্রেম, বিশ্বাস, আশা এবং যন্ত্রণাও একেকটি অবিচ্ছেদ্য পাপড়ি হিসেবে বিদ্যমান। তিনি বুঝিয়েছেন যে জীবনের এই পূর্ণতাকে গ্রহণ করতে হলে আনন্দ ও বেদনা উভয়কেই আপন করে নিতে হবে। যন্ত্রণাও আমাদের জীবনের এক অপরিহার্য অলংকার, যা আত্মাকে আরও খাঁটি করে তোলে।

জীবনের পথ সবসময় কুসুমাস্তীর্ণ হয় না। এমন সময় আসে যখন চারপাশ হঠাৎ অন্ধকার হয়ে যায়—কাছের মানুষের অবহেলা, বিশ্বাসভঙ্গের যন্ত্রণা কিংবা দীর্ঘদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরেও চূড়ান্ত ব্যর্থতার গ্লানি যখন মনকে চুরমার করে দেয়, তখন আত্মহননের মতো নেতিবাচক চিন্তা আসা স্বাভাবিক। কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, অধিকাংশ মানুষই সেই অন্ধকারের অতল গহ্বরে চিরতরে তলিয়ে যায় না। কারণ মানুষের ভেতরের সেই আদিম আলো সহজে নির্বাপিত হয় না। তা হয়তো কখনো মেঘের আড়ালে গিয়ে বিশ্রাম নেয়, কিন্তু উপযুক্ত সময়ে আবার ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকে। মনোবিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে মানুষের মধ্যে জয়ের আকাঙ্ক্ষা যখন তীব্র হয়, তখন তার মস্তিষ্ক ‘ফ্লো’ নামক এক বিশেষ অবস্থায় প্রবেশ করে। এই অবস্থায় মানুষ বাইরের যন্ত্রণা বা সীমাবদ্ধতাকে ভুলে কেবল তার লক্ষ্যের দিকে অবিচল থাকে। উদাহরণস্বরূপ, ইয়ানিস ম্যাকডেভিডের কথা বলা যায়, যিনি হাত-পা ছাড়াই জন্মেছিলেন। একসময় জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা আসলেও পরবর্তীতে তিনি তাঁর এই সীমাবদ্ধতাকেই শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। আজ তিনি সারা বিশ্বে ঘুরে মানুষকে অনুপ্রেরণা দেন।

ঢাকা শহরের মতো মেগাসিটিগুলোতে জীবনের স্পন্দন শোনা যায় তার প্রতিদিনের কোলাহলে। সাত সকালে যখন মানুষের পদচারণা শুরু হয়, তখন বাতাসের ঘ্রাণে মেশে নতুন দিনের প্রত্যাশা। রিকশার টুংটাং শব্দ, ফেরিওয়ালার ছন্দময় ডাক আর বাসের ইঞ্জিনের গর্জন—সব মিলিয়ে যে এক অদ্ভুত শব্দমালা তৈরি হয়, তাকে অনেকে ‘শহরের কান্নাহাসি’ বলে অভিহিত করেন। কিন্তু এই শব্দের ভেতরেই লুকিয়ে আছে লক্ষ লক্ষ মানুষের বেঁচে থাকার গান। ঢাকার রাস্তায় এক রিকশাচালক যখন তার সিটের ওপর কসরত করে একটু ঘুমানোর চেষ্টা করেন, তখন সেই ঘুমের মধ্যেও তাকে আগামী ট্রিপের পরিকল্পনা করতে হয়। ফুটপাতে বসা ফুল বিক্রেতা শিশুটি জানে যে তার বিক্রি করা প্রতিটি রজনীগন্ধার গুচ্ছই তার পরিবারের রাতের আহার নিশ্চিত করবে। জীবনের এই তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়গুলোর সঙ্গেই টিকে থাকার গভীর সম্পর্ক নিহিত, যা মানুষের বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে আরও দুর্দম করে তোলে।

মানুষ একা বাঁচতে পারে না। তার বেঁচে থাকার ইচ্ছার মূলে থাকে অন্য মানুষের ভালোবাসা ও গোষ্ঠীর সমর্থন। বিভিন্ন সেবামূলক সংস্থা যখন প্রান্তিক নারীদের ক্ষমতায়ন করে, তখন তারা কেবল কিছু অর্থ দেয় না, বরং তাদের ভেতরে ‘আমি পারি’—এই আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তোলে। যখন নারীরা দলবদ্ধ হয়ে সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন তাদের বেঁচে থাকার ইচ্ছা এক নতুন শক্তি লাভ করে। এই যৌথ শক্তিই টিকে থাকার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। বিপদে পড়লে মানুষ একে অন্যকে সাহায্য করে দাঁড়ায়—এটি একটি আদিম বিবর্তনীয় বৈশিষ্ট্য। আদিমকালে মানুষ যখন গুহায় বাস করত, তখনও তারা দলবদ্ধভাবে বন্য পশুর সঙ্গে লড়াই করত। আধুনিক যুগেও যখন কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা মহামারি আসে, তখন মানুষ নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে একে অপরের সহায়তায় এগিয়ে আসে। অন্যের জন্য ত্যাগ করার এই মানসিকতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের এক উচ্চতর অর্থ।

এই দীর্ঘ আলোচনার শেষে আমরা জীবনের এক অত্যন্ত সরল অথচ গভীর শিক্ষার মুখোমুখি হই—যতই কষ্ট আসুক, পথ যতই কণ্টকাকীর্ণ হোক, বেঁচে থাকার ইচ্ছাকে কোনোভাবেই হারানো যাবে না। এই ইচ্ছাই মানুষকে নতুন করে শুরু করতে শেখায়, ভাঙা স্বপ্নগুলোকে জোড়া লাগাতে সাহায্য করে এবং নিঃশ্ছিদ্র অন্ধকারের মাঝেও আলোর দিশা দেখায়। জীবন কখনো একরঙা নয়; এখানে কান্নার পাশে হাসি আর হারানোর পাশে পাওয়া সবসময় ছায়ার মতো লেগে থাকে। এই বৈপরীত্যই জীবনকে পূর্ণতা দেয়। আমরা প্রায়ই ভুলে যাই যে আমাদের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসই একেকটি অলৌকিক ঘটনা। যে মানুষটি আজ পরাজিত হয়ে মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরছে, তার ভেতরেও লুকিয়ে আছে আগামীকালের এক অপরাজিত বীর। কারণ প্রাণের যে স্পন্দন আমাদের ভেতরে প্রবাহমান, তা কোনো জাগতিক শক্তির কাছে হার মানতে শেখেনি।

তাই জীবনের বড় শিক্ষা হলো—বাঁচতে হবে, আরও একবার চেষ্টা করতে হবে এবং অন্ধকারের বুক চিরে আলোর অভিমুখে যাত্রা করতে হবে। কারণ থেমে যাওয়ার মাঝে কোনো সার্থকতা নেই; সার্থকতা আছে প্রতিটি নিঃশ্বাসে জীবনের জয়গান গাওয়ার মধ্যে। আজকের এই ভারী দুঃখগুলো একদিন হালকা স্মৃতি হয়ে যাবে, আর এই বদলে যাওয়ার সম্ভাবনাই মানুষকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে শেখায়। জীবনকে ভালোবেসে, তার প্রতিটি যন্ত্রণাকে অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই প্রকৃত মনুষ্যত্ব। এই পৃথিবীর সব মানুষের মধ্যেই সেই আশ্চর্য মিলটি হলো জীবনের প্রতি এই অবিনশ্বর ভালোবাসা—যা মৃত্যুকে উপেক্ষা করে অনন্তকাল ধরে বেঁচে থাকার পক্ষে অটল থাকে।


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর