প্রকাশিত :  ১৯:৫৯
২৩ এপ্রিল ২০২৬

স্বপ্নপূরণের পথে চা শিল্পাঞ্চলের ছয় কন্যা

স্বপ্নপূরণের পথে চা শিল্পাঞ্চলের ছয় কন্যা

সংগ্রাম দত্ত: চা-বাগানের শ্রমজীবী পরিবারে বেড়ে ওঠা মেয়েদের জন্য উচ্চশিক্ষা এখনো অনেকটাই কঠিন পথ। সীমিত আয়, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা আর সুযোগের অভাব—সব মিলিয়ে সেই পথ প্রায়ই থমকে যায় মাঝপথে। কিন্তু সেই বাস্তবতাকে অতিক্রম করে এবার সিলেট বিভাগের বিভিন্ন চা-বাগান এলাকা থেকে উঠে আসা ছয়জন কন্যা স্বনামধন্য Asian University for Women (AUW)-এ ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন, তাও আবার পূর্ণ বৃত্তিতে।

এই অর্জন শুধু ছয়জন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; বরং চা-বাগানভিত্তিক একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্য আশার আলো।

নতুন সুযোগ পাওয়া শিক্ষার্থীরা হলেন— মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার লংলা চা বাগানের শ্রাবনী কৈরী, শ্রাবন্তী কৈরী, লাকি নাইডু ও পুনম লোহার; জুড়ী উপজেলার ধামাই চা বাগানের অনিমা রানী পাল এবং হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার চাকলাপুঞ্জি চা বাগানের সৃষ্টি চাষা। এদের মধ্যে চারজন কুলাউড়া উপজেলার, একজন জুড়ী এবং একজন চুনারুঘাট উপজেলা এলাকার।

ইতোমধ্যে তাদের প্রয়োজনীয় মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে। আগামী মাসে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নতুন শিক্ষাজীবন শুরু করবেন।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে ২০১৮ সালে শুরু হওয়া একটি ধারাবাহিক উদ্যোগ, যার লক্ষ্য ছিল চা-বাগান এলাকার পিছিয়ে পড়া মেয়েদের উচ্চশিক্ষার আওতায় আনা। শুরুতে মাত্র সাতজন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এই কর্মসূচির আওতায় ৮৫ জন শিক্ষার্থী Asian University for Women-এ ফুল স্কলারশিপে পড়াশোনা করছেন।

এ পর্যন্ত ১৫ জন শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং ৩ জন স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। তাদের মধ্যে কেউ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, আবার কেউ উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশের স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন—যার মধ্যে ফ্রান্সের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো জায়গাও রয়েছে।

স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, এই স্কলারশিপ কর্মসূচি কেবল শিক্ষার সুযোগই তৈরি করছে না, বরং চা-বাগান সমাজে ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের পথও উন্মুক্ত করছে। মেয়েদের শিক্ষায় আগ্রহ বাড়ছে, পরিবারগুলোর মানসিকতা বদলাচ্ছে, এবং ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে আত্মবিশ্বাসী এক নতুন প্রজন্ম।

সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল উপজেলার সরকারি প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি ও লেখক মোঃ একরামুল কবির এই তথ্যগুলো তুলে ধরে শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি মনে করেন, এই অর্জন প্রমাণ করে—সুযোগ ও সহায়তা পেলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মেয়েরাও উচ্চশিক্ষায় নিজেদের জায়গা করে নিতে সক্ষম।

চা-বাগানের এই ছয় কন্যার পথচলা তাই কেবল একটি সাফল্যের গল্প নয়; এটি সম্ভাবনার নতুন দরজা খোলার গল্প—যা আগামী দিনে আরও অনেকের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।


Leave Your Comments




নারী অঙ্গন এর আরও খবর