প্রকাশিত : ১৩:১৫
১৮ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৪:০৬
১৮ এপ্রিল ২০২৬
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমরা যে বিশ্বব্যবস্থার সাক্ষী হচ্ছি, তাকে অর্থনীতির ধ্রুপদী ভাষায় কেবল 'অনিশ্চয়তা' বললে হয়তো এর ভয়াবহতাকে খাটো করে দেখা হবে। একদিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় বিকাশ যখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাচ্ছে, ঠিক সেই সময়েই ভূ-রাজনীতির পুরনো দাবানল নতুন করে জ্বলে উঠেছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলকে প্রায় পঙ্গু করে দিয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক রণোন্মাদনা এবং হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট অচলাবস্থা কেবল উন্নত বিশ্ব নয়, বরং বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশ্ব অর্থনীতির গতিবিধি, জ্বালানি সংকটের গভীরতা এবং আগামীকালের বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সম্ভাব্য রূপরেখা একটি নির্মোহ বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
বিশ্ব অর্থনীতির টালমাটাল দশা: প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লড়াই
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ২০২৬ সালের এপ্রিলের 'ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক' পাঠ করলে এক বিষণ্ণ চিত্র ফুটে ওঠে। ভূ-রাজনৈতিক এই টানাটানি বিশ্ব অর্থনীতির স্বাভাবিক ছন্দে বড় ধরনের ছেদ ফেলেছে। আইএমএফ-এর পূর্বাভাস বলছে, যদি এই সংঘাত স্বল্পস্থায়ীও হয়, তবুও ২০২৬ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি ৩.১ শতাংশের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ, যা গত দশকের গড়ের তুলনায় বেশ নিচেই থাকছে। তবে শঙ্কার জায়গাটি অন্য জায়গায়। আইএমএফ তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলেছে—যার মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর 'সিভিয়ার সিনারিও' অনুযায়ী, জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হলে বিশ্ব প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে। এটি কার্যত একটি বৈশ্বিক মন্দারই পূর্বাভাস। একদিকে মন্থর প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে লাগামহীন মূল্যস্ফীতি—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, আর উন্নত দেশগুলোতে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ার ফলে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে কাটছাঁট করতে হচ্ছে।
হরমুজ প্রণালী: যখন বিশ্ব বাণিজ্যের ধমনী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং এলএনজির ২৫ শতাংশ যে পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, সেই হরমুজ প্রণালী এখন আক্ষরিক অর্থেই এক রণক্ষেত্র। ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি 'অপারেশন এপিক ফিউরি' শুরু হওয়ার পর থেকেই এই এলাকাটি বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জলপথ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানি বিপ্লবীদের ড্রোন হামলা ও সমুদ্র মাইন স্থাপনের ফলে মার্স্ক বা সিএমএ সিজিএম-এর মতো বড় শিপিং জায়ান্টগুলো তাদের কার্যক্রম স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে। গত মার্চ মাসেই এমটি স্কাইলাইট, এমকেডি ব্যোম এবং মুসাফাহ ২-এর মতো বাণিজ্যিক জাহাজগুলো হামলার শিকার হয়ে প্রাণহানি ও বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে বীমা খাতে; যুদ্ধের ঝুঁকির কারণে বীমা প্রিমিয়াম এক সপ্তাহেই প্রায় ৪ থেকে ৬ গুণ বেড়ে গেছে। যদিও সম্প্রতি ইরান প্রণালীটি উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে, কিন্তু মার্কিন নৌ-অবরোধ বহাল থাকায় এই ঘোষণা কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে বড় ধরনের সংশয় রয়েই যাচ্ছে।
জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও তার বৈশ্বিক অভিঘাত
জ্বালানি তেলের দাম যখন ব্যারেল প্রতি ১২৬ ডলার স্পর্শ করে, তখন বিশ্বের প্রতিটি ঘরে তার আঁচ পৌঁছাতে বাধ্য। আইইএ (IEA)-এর মতে, এটি ১৯৭০-এর দশকের পর জ্বালানি সরবরাহে সবচেয়ে বড় বিঘ্ন। তেলের পাশাপাশি এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারেও আগুন লেগেছে। কাতারের রাস লাফান গ্যাস কেন্দ্রে হামলার পর এশিয়ায় এলএনজির স্পট মূল্য ১৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল বাতি জ্বালানোর খরচই বাড়ায়নি, বরং সার উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত গ্যাসের দাম বাড়িয়ে সরাসরি খাদ্য নিরাপত্তার ওপর আঘাত হেনেছে। পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে বিশ্বের মোট ইউরিয়া সারের এক-তৃতীয়াংশ আসে, যা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি: কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি
বিশ্বের এই অস্থিরতার ঢেউ বাংলাদেশের উপকূলেও আছড়ে পড়েছে। দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে ৩.৯ থেকে ৪.৭ শতাংশের মধ্যে নেমে আসার আশঙ্কা রয়েছে। সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মূল্যস্ফীতি, যা গত মার্চে ৮.৭১ শতাংশ স্পর্শ করেছে। যদিও আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০.৩৭ বিলিয়ন ডলারে (বিপিএম৬ অনুযায়ী) স্থিতিশীল রয়েছে, তবুও বর্ধিত জ্বালানি আমদানি বিল রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে। উল্লেখ্য, জ্বালানি তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের বার্ষিক খরচ বেড়ে যায় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে আমাদের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকেও, যেখানে উৎপাদনশীলতা প্রায় ৪০ শতাংশ কমেছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
পুঁজিবাজারের মনস্তত্ত্ব ও ডিএসই-র হালহকিকত
দেশের পুঁজিবাজার এখন আক্ষরিক অর্থেই আস্থার সংকটে ভুগছে। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স (ডিএসইএক্স) ৫,২৩০ পয়েন্টের লেভেলে স্থির হতে রীতিমতো লড়াই করছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক ধরনের 'অপেক্ষা করো এবং দেখো' (ওয়েট-অ্যান্ড-সি) নীতি প্রবল হয়ে উঠেছে। বিএটিবিসি, ব্র্যাক ব্যাংক বা সিটি ব্যাংকের মতো বড় মূলধনী শেয়ার বা ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন সূচককে আরও নিচের দিকে টেনে নিচ্ছে। লেনদেনের পরিমাণও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, যা নির্দেশ করে যে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও বর্তমানে বাজারে বড় কোনো ঝুঁকি নিতে অনিচ্ছুক।
আগামীকালের পুঁজিবাজার (১৯ এপ্রিল ২০২৬): একটি পূর্বাভাস
আগামীকাল, ১৯ এপ্রিল, ডিএসই-র জন্য এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন হবে। আমাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগামীকালের বাজারে তিনটি প্রধান বিষয় প্রভাব ফেলতে পারে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালী নিয়ে ইরানের ইতিবাচক ঘোষণা এবং তেলের আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাব্য দরপতন বিনিয়োগকারীদের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফেরাতে পারে। এতে করে সপ্তাহের প্রথম দিনে বাজারে একটি 'রিলিফ র্যালি' বা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। দ্বিতীয়ত, বেশ কিছু ট্রেজারি বন্ডের লেনদেন পুনরায় শুরু হওয়ার কথা রয়েছে, যা প্রাতিষ্ঠানিক তারল্য ব্যবস্থাপনায় প্রভাব ফেলবে। তৃতীয়ত, সস্তা হয়ে যাওয়া মৌলভিত্তিসম্পন্ন শেয়ারগুলোতে কিছু সুযোগসন্ধানী বিনিয়োগকারী (বার্গেইন হান্টার্স) সক্রিয় হতে পারেন, যা সূচককে ৫,৩০০ পয়েন্টের রেজিস্ট্যান্স লেভেলের কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারে। তবে এই গতি ধরে রাখা সম্ভব হবে কি না, তা নির্ভর করবে বিকেলের দিকে আসা আন্তর্জাতিক খবরের ওপর।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সাল নাগাদ নবায়নযোগ্য শক্তি বাড়ানো এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির যে লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে, তা অর্জনে বর্তমান সংকট এক বড় শিক্ষা হয়ে উঠেছে। সাময়িকভাবে জ্বালানি রেশনিং বা ভর্তুকি সমন্বয়ের মতো কঠোর ব্যবস্থা নিতে হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধান ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই। পুঁজিবাজারের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য আগামীকালের পরামর্শ হলো—হুজুগে কান না দিয়ে স্থিতিশীল ও শক্তিশালী শেয়ারে নজর রাখা। কারণ সামষ্টিক অর্থনীতির এই ঝড় দীর্ঘস্থায়ী হলেও মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলোই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকার সক্ষমতা রাখে।