প্রকাশিত :  ০৭:৫৫
১৫ এপ্রিল ২০২৬

"শব্দে-সংগ্রামে এক জীবন"— কবি ও সাংবাদিক সৌমিত্র দেব টিটোর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী

সংগ্রাম দত্ত: শব্দ ছিল তাঁর আশ্রয়, আর সত্য বলা ছিল তাঁর অভ্যাস। কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিক সৌমিত্র দেব টিটো—এক বছর আগে যিনি হঠাৎ করেই থেমে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন দীর্ঘ এক প্রতিধ্বনি। আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী।

২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল, মঙ্গলবার সকাল আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে এজমা ও শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। দ্রুত তাঁর স্ত্রী পলা দেব তাঁকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। মুহূর্তেই নেমে আসে শোকের ছায়া—পরিবার, সহকর্মী ও সাহিত্যপ্রেমীদের মধ্যে।

মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, একমাত্র পুত্র, তিন বোনসহ অসংখ্য আত্মীয়-স্বজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।

১৯৭০ সালের ২৭ জুলাই মৌলভীবাজার জেলা শহরে জন্ম নেওয়া সৌমিত্র দেব টিটোর শেকড় কুলাউড়া উপজেলার কাদিপুর ইউনিয়নের উচাইল গ্রামে। পিতা সুশীতল দেব ও মাতা মায়া দেবের স্নেহে বেড়ে ওঠা এই মানুষটি ছোটবেলা থেকেই চিন্তা ও চেতনায় ছিলেন ব্যতিক্রম।

নব্বইয়ের দশক থেকে তিনি কবিতা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। ধীরে ধীরে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেন তিনি। সাংবাদিকতায় ডিপ্লোমা অর্জনের মাধ্যমে পেশাগত দক্ষতাও অর্জন করেন।

পেশাগত জীবনে দেশের শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রথম আলো ও দৈনিক মানবজমিন-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে নিজ উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করেন অনলাইন নিউজ পোর্টাল রেড টাইমস ডট কম—যা হয়ে ওঠে তাঁর ভাবনা ও প্রতিবাদের এক শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম।

তাঁর লেখনী ছিল বহুমাত্রিক। কবিতা, প্রবন্ধ, সমসাময়িক বিশ্লেষণ—সব মিলিয়ে তাঁর সম্পাদনা ও লেখায় প্রকাশিত হয়েছে প্রায় ৪০টি বই। ঢাকাস্থ জালালাবাদ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে সাংবাদিক মহলেও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

কেবল কলমেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি। সমাজ ও রাজনীতির প্রতি ছিল তাঁর গভীর দায়বদ্ধতা। মৌলভীবাজার পৌরসভা নির্বাচনে ওয়ার্কার্স পার্টির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে নির্বাচন করে তিনি সক্রিয় রাজনৈতিক অংশগ্রহণেরও পরিচয় দেন।

তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়ও ছিল সংগ্রামমুখর। ২০২৪ সালের ১৯ অক্টোবর, ৭ মার্চ ও ১৫ আগস্ট সরকারি ছুটি বাতিলের দাবিতে ক্রিয়েটিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নিতে গিয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় তিনি ও আরও কয়েকজন লেখক আহত হন। তবুও তিনি থেমে যাননি—চলেছেন নিজের বিশ্বাসে, নিজের কণ্ঠে।

আজ, তাঁর অনুপস্থিতির এক বছর পর, সহকর্মী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কাছে তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন—একটি সময়, একটি কণ্ঠ, একটি নির্ভীক অবস্থানের নাম।

সৌমিত্র দেব টিটো নেই, কিন্তু তাঁর লেখা, তাঁর উচ্চারণ আর তাঁর সাহসী অবস্থান এখনও বেঁচে আছে—প্রতিটি শব্দে, প্রতিটি স্মৃতিতে।


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর