প্রকাশিত : ২০:১১
১৩ এপ্রিল ২০২৬
সংগ্রাম দত্ত: দেশ-বিদেশে ‘পর্যটন নগরী’ ও ‘চায়ের রাজধানী’ হিসেবে পরিচিত শ্রীমঙ্গল উপজেলা সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক সহিংসতা, চুরি, মাদক বিস্তার এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে। স্থানীয়দের ভাষায়, অপরাধের ধারাবাহিক বৃদ্ধিতে জনজীবনে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতা।
অপরাধপ্রবণতার বিস্তার ও সাম্প্রতিক ঘটনা
শহর ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় চুরি, ছিনতাই ও হামলার ঘটনা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল শহরের পূর্বাশী কাল আবাসিক এলাকায় এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে রাসেন্দ্র দত্ত চৌধুরীর বাসভবনে সংঘটিত চুরির ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। চোরেরা বাসা থেকে পানি তোলার মোটর মেশিন, ফ্যান এবং বাথরুমের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যায়। বিগত অক্টোবর ২০২৪ সালেও পানি তোলার মটর মেশিন ও দু'টি বাথরুমের বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রাংশ ও বেসিন চুরি করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে । এ ঘটনায় এলাকাবাসী চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ-এর জেলা প্রতিনিধি মো. সাইফুল ইসলাম সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর তথ্যমতে, গত কয়েক সপ্তাহে এলাকায় হত্যাকাণ্ড, অপহরণের চেষ্টা, ছিনতাই এবং ধারালো অস্ত্রের হামলার মতো একাধিক ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র জুনায়েদ হত্যাকাণ্ড, এক তরুণীকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়ার চেষ্টা এবং পৃথক হামলায় একাধিক ব্যক্তি আহত হওয়ার ঘটনাগুলো বিশেষভাবে আলোচিত। এছাড়া কিছুদিন পূর্বে তিনি তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে লিখেন যে, অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সাথে এর প্রভাবশালী সাংবাদিক প্রশাসনের সাথে তদবিরে জড়িত । তাঁর এই পোস্টকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা-ও প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হলেও তদন্তক্রমে ওই সাংবাদিককে গ্রেফতার ও তাঁর বিরুদ্ধে কোন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের পর্যবেক্ষণেও পরিস্থিতির অবনতির স্পষ্ট চিত্র উঠে এসেছে। দৈনিক দিনকাল-এর শ্রীমঙ্গল প্রতিনিধি মো. রুবেল আহমেদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে অভিযোগ করেন, প্রশাসনিক নীরবতা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়াচ্ছে। তিনি শাপলাবাগ এলাকায় এক শ্রমিক নেতার ওপর নৃশংস হামলার ঘটনাও উল্লেখ করেন, যেখানে ওই ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হন।
গত ১২ এপ্রিল ২০২৬ এর মাদক ব্যবসায়ী কর্তৃক এক শ্রমিক নেতা কে হত্যার প্রচেষ্টায় দাড়ালো অস্ত্র দিয়ে হামলা বিষয়ে দৈনিক যুগান্তর-এর স্থানীয় প্রতিনিধি সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন তাঁর প্রতিবেদনে সামগ্রিক পরিস্থিতিকে “অপরাধ, মাদক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়ে উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্রীমঙ্গল শহরের শাপলাবাগ রেললাইন সংলগ্ন এলাকা দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা ও ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত। সম্প্রতি ওই এলাকায় মাদকসেবী ও মাদক কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে বহু মানুষ মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। এতে ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি চরমে পৌঁছায়।
এই প্রেক্ষাপটে রোববার (১২ এপ্রিল) গভীর রাতে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জ সার্কেলের এএসপি মো. ওয়াহিদুজ্জামান রাজুর নেতৃত্বে শাপলাবাগ ও রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় একটি বিশেষ পুলিশ অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে চারজনকে আটক করা হয়েছে বলে গণমাধ্যম কর্মী সৈয়দ আবু জাফর সালাউদ্দিন এর ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ রয়েছে । স্থানীয়রা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও তারা দাবি জানিয়েছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে এমন অভিযান নিয়মিতভাবে চালিয়ে যেতে হবে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলার সিন্দুরখাঁন, সাতগাঁও, নোয়াগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রভাবশালী একটি চক্র শ্রমিকদের মাধ্যমে বিভিন্ন পাহাড়ী ছড়া থেকে বালু উত্তোলন করে ট্রাকযোগে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করছে।
বিশেষ করে নোয়াগাঁও গ্রামের বিস্কুট ফ্যাক্টরির পূর্ব পাশে জাগছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে রাতের আঁধারে এসব বালু বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানা যায়। একই এলাকার অঞ্জু বর্মনের বাড়ির সংলগ্ন জাগছড়াতেও বালু উত্তোলন ও মজুতের ঘটনা ঘটছে। অভিযোগ রয়েছে, পর্দার আড়ালে স্থানীয় এক সদস্য এসব কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত।
পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এভাবে ছড়ার পাড় কেটে বালু উত্তোলনের ফলে ভূমিক্ষয়, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি বড় ধরনের পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালনা করলেও তা স্থায়ী সমাধান আনতে পারছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নস্তরের শ্রমিকদের আটক করা হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে।
একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের একটি অংশ থানায় অভিযোগ করতে অনীহা প্রকাশ করছেন। তাদের অভিযোগ, অভিযোগ করতে গেলে থানা বা কোর্টে সাক্ষী প্রমাণ দিয়ে অভিযোগ প্রমাণ করানোসহ নানা ধরনের হয়রানির আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক ঘটনা প্রকাশের বাইরে থেকে যাচ্ছে, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করছে।
সব মিলিয়ে শ্রীমঙ্গলের বর্তমান পরিস্থিতি একটি জটিল বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি তুলে ধরছে। একদিকে সহিংসতা, চুরি ও মাদক বিস্তার; অন্যদিকে অবৈধ বালু উত্তোলনের মতো পরিবেশবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড—সবকিছু মিলিয়ে জনজীবনে তৈরি হয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
স্থানীয়দের মতে, দ্রুত, সমন্বিত এবং কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে। শ্রীমঙ্গলের এই বাস্তবতা এখন শুধু প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, পরিবেশ রক্ষা এবং নাগরিক নিরাপত্তার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।