প্রকাশিত :  ১২:২৩
০৯ এপ্রিল ২০২৬

ফরেনসিক অডিটে মিলল প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৩ হাজার ৮৮ কোটি টাকার দুর্নীতি

ফরেনসিক অডিটে মিলল প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৩ হাজার ৮৮ কোটি টাকার দুর্নীতি

প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ২০১৮ সাল থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত  মোট ৩ হাজার ৮৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে একটি ফরেনসিক অডিট প্রতিবেদনে দেখা গেছে।  অতিরিক্ত অফিস ভাড়া দেখানো, সিএসআর তহবিলের অপব্যবহার, খতিয়ানে কারসাজি, ক্রয় প্রক্রিয়ার অপব্যবহার এবং ভুয়া সংস্কার ব্যয় দেখানোর মাধ্যমে এই অর্থ আত্মাসাৎ করা হয় বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান এমএবিএস অ্যান্ড জে পার্টনারস এই ফরেনসিক নিরীক্ষা পরিচালনা করে। ২০২৫ সালের আগস্টে বাংলাদেশ ব্যাংক-এর নির্দেশনার পর বর্তমান বোর্ডের অনুমোদনে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রতিবেদন জমা দেয়।

তদন্তে দেখা যায়, ব্যাংকের জেনারেল সার্ভিসেস ডিভিশন, ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন ডিভিশন এবং বনানী শাখার মাধ্যমে এই অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। নিরীক্ষা অনুযায়ী, ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এইচবিএম ইকবাল, তার দুই ছেলে সাবেক পরিচালক মঈন ইকবাল ও ইমরান ইকবাল, কয়েকজন সাবেক পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তাসহ ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, অফিস ভাড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অনিয়ম হয়েছে। ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইকবাল পরিবারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উচ্চমূল্যে চুক্তির মাধ্যমে ৪০৬ কোটি ৩৫ লাখ টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়। বাজারদর যেখানে প্রতি বর্গফুট ১২০ থেকে ১৬০ টাকা, সেখানে ইকবাল সেন্টারের জন্য ৩৫০ থেকে ৫০৬ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যাংকের মোট আর্থিক ক্ষতি দাঁড়ায় ২ হাজার ৭১৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

এছাড়া সিএসআর, প্রচারণা, বিজ্ঞাপন ও ব্যবসা উন্নয়ন খাতে অনিয়মের মাধ্যমে ৬০৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। ১২৮ কোটি টাকার সিএসআর ব্যয়ের মধ্যে কম্বল, ত্রাণ ও দানের বড় অংশ বাস্তবে বিতরণ হয়নি। পাঁচটি ভেন্ডর অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ৭৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা সরানোর তথ্যও পাওয়া গেছে।

ফরেনসিক প্রতিবেদনে ‘সান্ড্রি ডেবটরস’ অ্যাকাউন্টকে অর্থ আত্মসাতের প্রধান চ্যানেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এখান থেকে ৬৬৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা ভেন্ডর ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তীতে ২২টি ভেন্ডর ও একটি ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ৬৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

প্রিন্টিং ও স্টেশনারি খাতে ১২৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা খরচ দেখানো হলেও প্রকৃত সরবরাহ ছিল মাত্র ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ। এতে ৮১ কোটি ৭৩ লাখ টাকা আত্মসাৎ হয়েছে, যার বড় অংশ একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বেশি দামে বিল দেখিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এছাড়া বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল)-এর খুলনা টাইগার্স ফ্র্যাঞ্চাইজি সংশ্লিষ্ট ব্যয়ে ৪৪ কোটি ৯৯ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। যেখানে প্রকৃত খরচ ছিল মাত্র ৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড-এ ৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা প্রদান করা হলেও বাকি অর্থ অনিয়মের মাধ্যমে সরিয়ে নেওয়া হয়।

নিরীক্ষায় আরও উঠে এসেছে, অফিস ইন্টেরিয়র, নির্মাণ, সংস্কার, ব্যবসা উন্নয়ন, টেলিভিশন বিজ্ঞাপন ও ভবন মেরামতের খরচের নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ অতিরিক্ত বা ভুয়া ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এদিকে, প্রতিবেদন অনুযায়ী আত্মসাৎ হওয়া অর্থ উদ্ধারে ব্যাংকটি ইতোমধ্যে একাধিক মামলা দায়ের করেছে। ১১ মার্চ প্রিমিয়ার ব্যাংক ফাউন্ডেশনের নামে ৩৫ কোটি টাকার একটি মামলা করা হয়। এছাড়া ১৫ মার্চ অফিস ভাড়া ও ভেন্ডর খাতে আত্মসাৎ হওয়া ৩ হাজার ৫৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা উদ্ধারে আরও দুটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, এইচবিএম ইকবাল সাবেক সংসদ সদস্য ছিলেন এবং ১৯৯৯ সালে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠার পর টানা ২৬ বছর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি পদত্যাগ করেন। ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি দেশ ত্যাগ করেন বলে জানা গেছে।



Leave Your Comments




বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এর আরও খবর