প্রকাশিত :  ১১:৩৮
০৬ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১২:২১
০৬ এপ্রিল ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের টানাপড়েনে ডিএসইর অস্থির লেনদেন: পুনরুদ্ধারের আভাস কারিগরি সূচকে

মধ্যপ্রাচ্যের টানাপড়েনে ডিএসইর অস্থির লেনদেন: পুনরুদ্ধারের আভাস কারিগরি সূচকে

ঢাকা, ৬ এপ্রিল ২০২৬ — ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাতের ছায়া ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) লেনদেনেও পড়েছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে টানা ষষ্ঠ সপ্তাহে পা দেওয়া এই ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যেও আজ বাংলাদেশের পুঁজিবাজার সামান্য ইতিবাচক প্রবণতা দেখিয়েছে। তবে এই ঊর্ধ্বগতি নেহাতই নগণ্য, যা বিনিয়োগকারীদের মনে এখনও অনিশ্চয়তা রেখে গেছে।

আজ সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স (DSEX) আগের দিনের তুলনায় ১০.২৬ পয়েন্ট বা ০.২০ শতাংশ বেড়ে ৫,১২২.৫৩ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। গতকাল ১০৭ পয়েন্টের পতন বিনিয়োগকারীদের আতঙ্কিত করেছিল। আজকের এই সামান্য উত্থানকে বিশ্লেষকরা ‘টেকনিক্যাল রিবাউন্ড’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। অন্যদিকে ব্লু-চিপ সূচক ডিএস৩০ (DS30) বেড়েছে ৯.১১ পয়েন্ট বা ০.৪৭ শতাংশ; এর অবস্থান ১,৯৫৪.৪৫ পয়েন্টে। তবে শরিয়াহভিত্তিক সূচক ডিএসইএস (DSES) কিছুটা কমেছে—০.৭৩ পয়েন্ট বা ০.০৭ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ১,০৪০.৩৭ পয়েন্টে।

লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪৭০.৭৯ কোটি টাকা, যা গতকালের তুলনায় কম। তবুও বর্তমান সংকটে এই টার্নওভারকে ‘মোটামুটি ইতিবাচক’ বলছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। শেয়ার হস্তান্তরের সংখ্যা ১৮.০৮ কোটি। আজ দর বেড়েছে ১৪৮টি কোম্পানির, কমেছে ১৭১টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৬৭টির। সকাল সাড়ে ১০টায় লেনদেন শুরু হয়ে প্রথম এক ঘণ্টায় সূচক ৫,১৮০ পয়েন্টের কাছাকাছি ওঠে; কিন্তু দুপুরের পর বিক্রেতাদের চাপে তা নেমে আসে। চার্টে তৈরি হয়েছে ‘শুটিং স্টার’ প্যাটার্ন, যা আগামী কার্যদিবসেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১৫ ডলার ছাড়িয়েছে। হরমুজ প্রণালী আংশিক অবরুদ্ধ থাকায় জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। সরকার ইতিমধ্যে ডিএসইতে লেনদেনের সময় ৩০ মিনিট কমিয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের এই পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে শঙ্কা বাড়িয়েছে—লোডশেডিং ও উৎপাদন ব্যাহত হলে কোম্পানিগুলোর তৃতীয় প্রান্তিকের ফল খারাপ হতে পারে। গত মার্চে দেশের মুদ্রাস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৭১ শতাংশে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহও কমিয়ে দিচ্ছে।

খাতভিত্তিক পারফরম্যান্সে ওষুধ ও রসায়ন খাত এগিয়ে। মোট টার্নওভারের ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ এসেছে এই খাত থেকে। এসিআই ল্যাবরেটরিজ, স্কয়ার ফার্মা ও এসিআই লিমিটেড শীর্ষ লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান। বীমা খাত চমক দেখিয়েছে—সাধারণ বীমায় ৩.১ শতাংশ দর বেড়েছে। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স (বিএনআইসিএল) ও জনতা ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। প্রকৌশল ও বস্ত্র খাতেও লেনদেন হয়েছে বেশি। তবে ব্যাংকিং খাত চাপে ছিল; সূচক ১.৫ শতাংশ কমেছে। প্রাইম ব্যাংক ২৫ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ স্টক লভ্যাংশ ঘোষণা করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর চেষ্টা করেছে।

শীর্ষ গেইনারদের তালিকায় এমকে ফুটওয়্যার (৭.১৩ শতাংশ), রংপুর ফাউন্ড্রি (৭.০৩ শতাংশ) ও ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স (৫.৭৬ শতাংশ) স্থান পেয়েছে। লেনদেনের শীর্ষে ছিল এসিআই ল্যাবরেটরিজ (১৫২.৪২ মিলিয়ন টাকা), এসিএমই পেস্টিসাইড (১৩৯.৫৯ মিলিয়ন টাকা) ও সামিট এলায়েন্স পোর্ট (১২৩.৪৯ মিলিয়ন টাকা)।

কর্পোরেট লভ্যাংশের ঘোষণায় সক্রিয় ছিল বাজার। ইউনিলিভার কনজ্যুমার কেয়ার ৪২০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। আজ ছিল রেকর্ড তারিখ। কোম্পানিটির ইপিএস ৪০ শতাংশ বেড়ে ৪১.২১ টাকা হয়েছে। ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো ৩০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ দেবে; তবে তাদের ইপিএস ৩২.৪২ টাকা থেকে কমে ১০.৮১ টাকায় নেমেছে—সাভার কারখানা স্থানান্তরের এককালীন খরচের কারণে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) পুঁজিবাজারের সুশাসন ও সংস্কারে উদ্যোগ নিয়েছে। পাঁচ সদস্যের টাস্কফোর্স আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ১৭টি ক্ষেত্রে সংস্কার করবে। চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংককে বাজারে বিনিয়োগ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ছয়টি ব্রোকারেজ হাউজের প্রভিশন সংরক্ষণের সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে।

কারিগরি বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ডিএসইএক্স সূচক ৫,১০০ পয়েন্টের গুরুত্বপূর্ণ ‘সাপোর্ট’ লেভেলে দাঁড়িয়ে। আরএসআই বর্তমানে ৪৪.৮৭৫-এ, যা ‘ওভারসোল্ড’ জোনের কাছাকাছি—শেয়ারের দাম সস্তা হয়ে গেছে। এমএসিডি ৩.৩০০ লেভেলে ‘বাই সিগন্যাল’ দিচ্ছে। পাঁচ দিনের মুভিং অ্যাভারেজ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা নির্দেশ করছে।

আগামীকাল, ৭ এপ্রিল বাজার ইতিবাচক শুরুর সম্ভাবনা রাখে। ইউনিলিভারের রেকর্ড তারিখ শেষ হওয়ায় তারল্য প্রবাহ বাড়তে পারে। সুযোগসন্ধানী (‘বার্গেইন হান্টার’) বিনিয়োগকারীরা বড় মূলধনের (লার্জ-ক্যাপ) শেয়ারে সক্রিয় হতে পারেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবং জ্বালানি তেলের দাম না কমলে প্রকৌশল ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ থাকবে। সূচক ৫,১২০ থেকে ৫,১৫০ পয়েন্টের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের জন্য বর্তমান সংকট একটি ‘সুযোগ’ তৈরি করেছে। লভ্যাংশপ্রদানকারী শক্তিশালী মৌলভিত্তির কোম্পানি, বিশেষ করে ওষুধ, টেলিকমিউনিকেশন ও এফএমসিজি খাতের শেয়ার বিবেচনা করা যেতে পারে। গুজবে কান না দেওয়া, পোর্টফোলিও বৈচিত্র্যময় রাখা এবং অন্তত তিন থেকে পাঁচ বছরের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিচ্ছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রশমিত হলে এবং বিএসইসির সংস্কার কার্যক্রম সফল হলে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ আবারও গতি ফিরে পাবে—এমনটাই আশা করছেন বিনিয়োগকারীরা।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর