প্রকাশিত :  ১৬:২৭
০৫ এপ্রিল ২০২৬

ভূ-রাজনীতি ও জ্বালানি সংকটে ডিএসইর মহাধস, পুঁজিবাজারে আতঙ্ক

ভূ-রাজনীতি ও জ্বালানি সংকটে ডিএসইর মহাধস, পুঁজিবাজারে আতঙ্ক

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ইতিহাসে আজ এক কালো অধ্যায় রচিত হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা আর অভ্যন্তরীণ জ্বালানি অস্থিরতার দাপটে এক দিনেই প্রায় ১০৮ পয়েন্ট হারিয়েছে বাজার। ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স নেমেছে ৫ হাজার ১১২ পয়েন্টের কাছাকাছি। শতাংশের হিসেবে যা ২ দশমিক ০৬ শতাংশ পতন। দিন শেষে বিনিয়োগকারীদের মুখে শুধু হতাশা আর আতঙ্ক।

লেনদেন শুরু হয় সকাল সাড়ে ১০টায়। তার আগেই বাজারে ভাঙনের আভাস ফুটে ওঠে। সূচকের রেখা শুরু থেকেই নিচের দিকে নামতে থাকে। দুপুর ২টার দিকে গিয়ে তা পৌঁছে যায় দিনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। কেন এই ধস? একক কোনো কারণ নয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট আর মূল্যস্ফীতির চাপ—সব মিলে এক নিখাদ ঝড়।

আজ ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে মোট ৩৯০টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার। তার মধ্যে দর বেড়েছে মাত্র ২৪টির। আর কমেছে ৩৫১টির। অপরিবর্তিত ছিল ১০টি। এত বিপুল সংখ্যক কোম্পানির দরপতন স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, বিক্রির চাপ ছিল সর্বব্যাপী। ‘প্যানিক সেলিং’-এ পুরো বাজার মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থার এই সংকটের ফলাফল লেনদেনের পরিমাণেও ধরা পড়েছে। আগের কার্যদিবসে ৬২৬ কোটি টাকা লেনদেন হলেও আজ তা নেমেছে ৫১২ কোটি টাকায়। ট্রেডের সংখ্যা ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪৭৭টি, আর মোট শেয়ার লেনদেন হয়েছে ২১ দশমিক ৬১ কোটি।

গত ২ এপ্রিল ডিএসইএক্স সূচক ছিল ৫ হাজার ২১৯ পয়েন্টের ওপরে। আজ তার চেয়ে ১০৭ পয়েন্ট কম। শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস কমেছে ১৮ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট, ব্লু-চিপ সূচক ডিএস৩০ হারিয়েছে ৩৫ পয়েন্ট। সবচেয়ে উদ্বেগজনক ব্যাপার হলো, সাধারণত ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে বিনিয়োগকারীরা বড় ও মৌলভিত্তি কোম্পানিগুলোকেই নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে করেন। কিন্তু আজ ডিএস৩০ সূচকের পতন প্রমাণ করে দিল, সেই আশ্রয়স্থলগুলোও নিরাপদ নয়।

বাজার বিশ্লেষকরা আজকের মহাধসের জন্য চারটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন।

১. ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা: ইরান-ইসরায়েল সংঘাতে হরমুজ প্রণালী বন্ধের হুমকি বিশ্ব তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। প্রতি ব্যারেল ১০৫ ডলার ছাড়িয়েছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এটি বড় সংকেত। উৎপাদন ব্যয় বাড়ার আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা পুঁজিবাজার থেকে সরে যাচ্ছেন।

২. জ্বালানি সংকট ও লেনদেনের সময় কমানো: সরকার ৫ এপ্রিল থেকেই পুঁজিবাজারের লেনদেনের সময় ৩০ মিনিট কমিয়ে দুপুর ২টা পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে। ব্যাংকের লেনদেনের সময়ও কমেছে। বিনিয়োগকারীরা এই সিদ্ধান্তকে জ্বালানি পরিস্থিতির ভয়াবহতা হিসেবেই দেখছেন। এর প্রভাবে শিল্পোৎপাদন ব্যাহত হতে পারে বলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

৩. উচ্চ সুদের হার ও মূল্যস্ফীতি: চলতি বছরের শুরুতেই জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রেপো রেট ১০ শতাংশে ঠেকিয়েছে। ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশ ছাড়িয়েছে। এতে কোম্পানিগুলোর পক্ষে বিনিয়োগ বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি এড়িয়ে ব্যাংক আমানত বা বন্ডের নিশ্চিত আয়ের দিকে ঝুঁকছেন।

৪. নীতিমালার অনিশ্চয়তা: বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর সম্প্রতি অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) অবসায়ন প্রসঙ্গে যে মন্তব্য করেছেন, তাতে বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত—তাদের অর্থ হারিয়ে যেতে পারে। এর সঙ্গে বিএসইসির কঠোর পদক্ষেপ ও নতুন আইপিওর অভাবে বাজার স্থবির হয়ে পড়েছে।

সব খাতেই পতন, তবে হারের তারতম্য আছে। লেনদেনের শীর্ষে ঔষধ ও রসায়ন খাত (১৬ দশমিক ৯ শতাংশ)। তবে এই খাতের স্কয়ার ফার্মা ও রেনাটার মতো কোম্পানিগুলোর দর কমেছে। প্রকৌশল খাতের অবস্থা সর্বনাশা—প্রায় ৯৫ শতাংশ কোম্পানি লাল জোনে। বস্ত্র খাতেও একই চিত্র। গ্যাস সংকটের আশঙ্কায় বিনিয়োগকারীরা সেখান থেকে টাকা তুলে নিচ্ছেন। ব্যাংক খাতে ব্র্যাক ব্যাংক ও সিটি ব্যাংকে কিছু লেনদেন থাকলেও সূচক নিম্নমুখী। ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিও পতনের কবল থেকে বাঁচতে পারেনি।

পুঁজিবাজারের পতনে মিউচুয়াল ফান্ডগুলোও দুরবস্থার মুখে। অধিকাংশ ফান্ডের নিট সম্পদ মূল্য (এনএভি) ফেস ভ্যালু ১০ টাকার নিচে নেমেছে। যেমন ক্যাপএমআইবিবিএলএমএফের বাজার মূল্যে এনএভি মাত্র ৭ দশমিক ৮৯ টাকা, অথচ ক্রয়মূল্যে এনএভি ১১ দশমিক ৪৩ টাকা। ভিএএমএলআরবিবিএফ, ক্যাপএমবিডিবিএলএমএফ, এলআরএফবিএফ১, এসইএমএলএফবিএসএলজিএফ—সবগুলোর অবস্থা একই রকম। বাজারে আস্থার সংকট এতটাই প্রকট যে ইউনিট দর এনএভির চেয়েও কমে কেনাবেচা হচ্ছে।

সূচক যখন ৫ হাজার ২০০ পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক সীমা ভাঙে, তখন অনেক বিনিয়োগকারীর ‘স্টপ-লস’ ট্রিগার হয়ে যায়। ফলাফল—স্বয়ংক্রিয়ভাবে আরও বেশি বিক্রির চাপ। প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও বাজারকে সমর্থন না দিয়ে সাইডলাইনে থেকে পোর্টফোলিও পুনর্বিন্যাসের অজুহাতে শেয়ার ছেড়েছেন। খুচরা বিনিয়োগকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ট্রেডিং ফ্লোরে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। গত ১৭ দিনে বিনিয়োগকারীরা প্রায় ২৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার বাজার মূলধন হারিয়েছেন।

২০২৫ সাল থেকেই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ নেতিবাচক। নির্বাচন পরবর্তী আশা ম্লান করে দিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ। ডলারের বিপরীতে টাকার মান ১২২ টাকার কাছাকাছি, যা বিনিয়োগের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ভারতের বিএসই সেনসেক্স ও নিফটি ৫০ সূচকও পতন দেখেছে। তবে সেখানে কারণ ছিল ট্যাক্স বৃদ্ধি ও প্রযুক্তি খাতের অস্থিরতা। বাংলাদেশের পতন আরও গভীর, কারণ এখানে জ্বালানি ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ উৎপাদন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

বাজার ম্যাপ কী বলছে?

ডিএসইর বাজার ম্যাপে প্রকৌশল খাতের লাল জোন সবচেয়ে তীব্র। অর্থাৎ ওই খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার দর ২ শতাংশের বেশি কমেছে। জ্বালানি ও বস্ত্র খাতেও একই চিত্র। ঔষধ খাতের দু-একটি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের কিছু ইউনিটে সবুজের আভাস থাকলেও তা নগণ্য। শীর্ষ গেইনারের তালিকায় রয়েছে রংপুর ফাউন্ড্রি, ড্যাফোডিল কম্পিউটার্স ও বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স। কিন্তু তাদের দরবৃদ্ধি বাজারের পতন রুখতে পারেনি। লুজারের তালিকায় নিউ লাইন ক্লোথিংস ও ফ্যামিলি টেক্স প্রায় ৫ শতাংশ দর হারিয়েছে।

৫ এপ্রিলের এই ধস আবারও প্রমাণ করল পুঁজিবাজার কতটা ভঙ্গুর। জ্বালানি সংকট ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা প্রশমিত হলেই বাজারের আস্থা ফেরার সম্ভাবনা। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে বড় উত্থানের আশা কম। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও দীর্ঘায়িত হলে এবং তেলের দাম ১২০ ডলার ছাড়ালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

বিনিয়োগকারীদের ধৈর্য ধারণের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশ্লেষকরা। শুধু মৌলভিত্তি শক্ত কোম্পানিতে বিনিয়োগ ধরে রাখার কথা বলা হচ্ছে। সরকার ১৭ লাখ টন জ্বালানি কেনার যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তা সফল হলে এবং উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলে দীর্ঘমেয়াদে বাজার ঘুরে দাঁড়াতে পারে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। পুঁজিবাজারের এই সংকট শুধু অর্থনীতির একটি খাতের পতন নয়, বরং গোটা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার এক বড় পরীক্ষা।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর