প্রকাশিত :  ১৮:২৫
০৪ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:২০
০৪ এপ্রিল ২০২৬

পুঁজিবাজারে নতুন আস্থার ভোর

সম্পাদকীয় কলাম

পুঁজিবাজারে নতুন আস্থার ভোর

বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দীর্ঘদিন ধরেই আস্থাহীনতা, তারল্য সংকট ও নীতিগত দুর্বলতার এক জটিল চক্রে আটকে ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের ২ এপ্রিলের একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত—আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ তানভীর গনিকে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ—এই স্থবিরতার ভেতর এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এটি কেবল একটি নিয়োগ নয়; বরং অর্থনীতির গতিপথ বদলের একটি সুস্পষ্ট সংকেত।

নতুন সরকারের অর্থনৈতিক দর্শন স্পষ্ট—প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতার বাইরে গিয়ে বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টেকনোক্র্যাটদের যুক্ত করে দ্রুত সংস্কার। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন যে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তার বাস্তবায়নে পুঁজিবাজারকে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করতেই হবে। আর সেই জায়গাতেই তানভীর গনির মতো অভিজ্ঞ বিনিয়োগ কৌশলবিদের উপস্থিতি সময়োপযোগী ও কৌশলগত।

আস্থাহীনতা থেকে আস্থার পুনর্গঠন

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান সংকটের মূল সমস্যা অর্থের ঘাটতি নয়—আস্থার ঘাটতি। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বাজারে স্বচ্ছতা, ন্যায়বিচার ও সুশাসনের অভাব অনুভব করেছেন। ফলে সূচক পতনের পাশাপাশি নতুন বিনিয়োগও কমেছে। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যখন পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে, তখন বাংলাদেশের বাজার পিছিয়ে পড়েছে।

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় কাজ হলো আস্থা পুনর্গঠন। তানভীর গনির পেশাগত অভিজ্ঞতা—বিশেষ করে গোল্ডম্যান স্যাকস ও টাইবার্ন ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টে নেতৃত্বের ভূমিকা—তাকে বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের মানসিকতা ও প্রত্যাশা সম্পর্কে গভীর ধারণা দিয়েছে। তিনি জানেন, একটি বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ আসার পূর্বশর্ত হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

সংস্কারের বাস্তব রূপরেখা

পুঁজিবাজারের উন্নয়ন কোনো একক পদক্ষেপে সম্ভব নয়; এটি একটি সমন্বিত সংস্কার প্রক্রিয়া। এখানে তিনটি ক্ষেত্র বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—

প্রথমত, কর্পোরেট গভর্নেন্স: তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহিতা ও সংখ্যালঘু বিনিয়োগকারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বাজারে বড় কোম্পানির অন্তর্ভুক্তি: রাষ্ট্রায়ত্ত ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে বাজারে আনা গেলে বাজারের গভীরতা বাড়বে এবং তারল্য সংকট অনেকটাই কমবে।

তৃতীয়ত, কারসাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স: বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ জরুরি।

এই তিনটি ক্ষেত্রেই তানভীর গনির বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে হেজ ফান্ড ও প্রাইভেট ইকুইটি ব্যবস্থাপনায় তার দক্ষতা বাংলাদেশের বাজারে নতুন ধরনের বিনিয়োগ পণ্য ও কাঠামো প্রবর্তনের সুযোগ তৈরি করবে।

বৈদেশিক বিনিয়োগ: নতুন সম্ভাবনার দ্বার (মূল লেখায় 'দুয়ার' ছিল, যা 'দ্বার' হলে বেশি প্রমিত)

বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এখনো জিডিপির তুলনায় খুবই কম। অথচ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো এই ক্ষেত্রেই দ্রুত এগিয়েছে। তানভীর গনির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক—যা তিনি বহু বছর ধরে গড়ে তুলেছেন—বাংলাদেশকে নতুন করে বৈশ্বিক বিনিয়োগ মানচিত্রে স্থান দিতে পারে।

বিশেষ করে প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি-প্রযুক্তি ও জলবায়ুসংক্রান্ত খাতে ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিংয়ের যে প্রবণতা বিশ্বজুড়ে বাড়ছে, সেখানে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে প্রয়োজন সঠিক নীতি, স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক মানের বিনিয়োগ পরিবেশ—যা এখন নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আসছে।

বাস্তব চ্যালেঞ্জ, কিন্তু আশাবাদের ভিত্তি মজবুত

এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, উচ্চ খেলাপি ঋণ, নীতিনির্ধারণে সমন্বয়ের অভাব—এসব সমস্যা রাতারাতি সমাধান হবে না। তবে ইতিবাচক দিক হলো, সরকার এখন সমস্যাগুলোকে অস্বীকার না করে সরাসরি মোকাবিলার পথে হাঁটছে।

‘জুলাই চার্টার’-এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা যদি বাস্তবে কার্যকর হয়, তবে পুঁজিবাজারে আস্থার পুনর্জাগরণ ঘটতেই বাধ্য। কারণ পুঁজিবাজার মূলত বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটি কাঠামো—যেখানে সুশাসনই সবচেয়ে বড় প্রণোদনা।

একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে

বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, অন্যদিকে নতুন নেতৃত্ব ও সংস্কারের প্রত্যাশা। এই প্রেক্ষাপটে তানভীর গনির নিয়োগ একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়বদল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

যদি নীতিগত ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, সংস্কার বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা অটুট থাকে এবং বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করা যায়—তবে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। শুধু ঘুরে দাঁড়ানোই নয়, এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকা শক্তি হয়ে উঠতে পারে। (মূল লেখায় ‘চালিকাশক্তি’—একত্রে না লিখে ‘চালিকা শক্তি’ লেখা বেশি প্রমিত)

পুঁজিবাজারে ভালো সময় আসবে—এটি এখন আর কেবল প্রত্যাশা নয়, বরং একটি যৌক্তিক সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি হয়েছে সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় বসানোর মধ্য দিয়ে।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর