প্রকাশিত :  ২১:০৭
০২ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২১:১২
০২ এপ্রিল ২০২৬

নীরবতায় গড়া ত্রিশ বছরের পথ—লেখক রেজুয়ান আহম্মেদের আত্মস্বীকার

নীরবতায় গড়া ত্রিশ বছরের পথ—লেখক রেজুয়ান আহম্মেদের আত্মস্বীকার

✍️ ড. নাজমুল ইসলাম 

ত্রিশ বছর—সময়টা কম নয়। এই দীর্ঘ সময়জুড়ে শব্দের সঙ্গে এক নিরবচ্ছিন্ন সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন কথাসাহিত্যিক, কবি ও প্রাবন্ধিক রেজুয়ান আহম্মেদ। সাহিত্যজীবনের তিন দশক পূর্তি উপলক্ষে তিনি ফিরে দেখেছেন নিজের পথচলা—যেখানে নেই আলোচনার ঝলকানি, আছে নীরব সাধনা আর গভীর আত্মঅন্বেষণ।

১৯৯৬ সালে লেখালেখির শুরু। তখন লক্ষ্য ছিল না খ্যাতি বা প্রতিষ্ঠা; ছিল কেবল অনুভব করার এক তীব্র তাগিদ। সেই অনুভবই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রূপ নিয়েছে গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধে। লেখকের ভাষায়, শব্দ তাঁর কাছে কখনোই প্রকাশের বাহুল্য ছিল না; বরং ছিল নিজেকে বোঝার একটি মাধ্যম।

মূলধারার আলোচনায় খুব বেশি দেখা যায় না তাঁর নাম। সাহিত্য অঙ্গনের প্রচলিত আলোকবৃত্তের বাইরে থেকেই তিনি লিখে গেছেন নিরন্তর। তবুও নিজের লেখা বইগুলোকে তিনি দেখেন জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে—যা তাঁর কাছে ‘আত্মার সঞ্চয়’।

লেখালেখি নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও কিছুটা ভিন্ন। তিনি মনে করেন, সাহিত্য কোনো প্রতিযোগিতা নয়; এটি একান্ত ব্যক্তিগত যাত্রা। করতালির চেয়ে নীরবতাকে এবং স্বীকৃতির চেয়ে সততাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন। তাই তাঁর লেখায় উচ্চারণের চেয়ে অনুচ্চারিত অনুভবই বেশি প্রাধান্য পায়।

সাহিত্য সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাসও স্পষ্ট—সত্যিকারের লেখা নিজেকে জাহির করে না; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের শক্তিতেই দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। ‘সাহিত্য ভোরের সূর্যের মতো’—এই সরল উপমাতেই তিনি ব্যাখ্যা করেন তাঁর দর্শন।

মানবতা, সমাজ ও সময়—এই তিনের আন্তঃসম্পর্কই তাঁর লেখার মূল সুর। নিজেকে বড় কোনো বিশ্লেষক হিসেবে নয়, বরং সময়ের ধারাবাহিক গল্পের একজন নীরব বর্ণনাকারী হিসেবেই দেখতে চান তিনি।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের তালিকাও দীর্ঘ। ‘এক মুঠো গল্প’, ‘সন্দেহের ছায়া’, ‘মায়াবী মুহূর্ত’, ‘শঙ্খের শপথ’, ‘শব্দে তুমি’, ‘গাজার দিনগুলো’, ‘ক্ষুধার্ত ও আত্মার সীমান্ত’, ‘ক্ষুধা’, ‘সাদা এপ্রোনের আড়ালে’, ‘রাতের শিউলি’, ‘সিক্রেট লাভ’, ‘আলোকছায়া’, ‘স্বপ্নের চাকরি’, ‘শেষ সূর্যের আলো’, ‘দ্য ডেজ অফ গাজা’, ‘লাভ অফ দ্য ফরেস্ট বার্ড’, ‘অপেক্ষার ছায়া’, ‘ও-জল’, ‘অভাগী’ ও ‘নিষিদ্ধ পল্লী’—প্রতিটি বইকেই তিনি দেখেন সময়ের দলিল হিসেবে, যেখানে ব্যক্তিগত অনুভবের ছাপ স্পষ্ট।

দীর্ঘ এই পথচলার শেষে এসে তাঁর উপলব্ধি, সফলতা সবসময় পরিচিতির সঙ্গে মেলে না। বরং নিজের ভেতরের সত্যকে অটুট রাখাই প্রকৃত সাফল্য। তিনি নিজেকে ভিড়ের অংশ হিসেবে দেখেন না; আবার আলোচনার কেন্দ্রেও থাকতে চান না। নীরবে কাজ করে যাওয়া একজন সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবেই থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

আগামীতেও এই পথচলা থামবে না—এমন প্রত্যয় ব্যক্ত করে রেজুয়ান আহম্মেদ বলেন, “যতদিন শব্দ ফিরে আসবে, ততদিন লেখা চলবে—নীরবে, ধীরে, কিন্তু গভীরভাবে।”


Leave Your Comments




সাহিত্য এর আরও খবর