প্রকাশিত :  ১৮:৪০
০২ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার পুনর্গঠনে নতুন দিগন্ত: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে তানভীর গনির নিয়োগের বিশ্লেষণ

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার পুনর্গঠনে নতুন দিগন্ত: প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে তানভীর গনির নিয়োগের বিশ্লেষণ

২০২৬ সালের ২ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য দিন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিনিয়োগ বিশেষজ্ঞ তানভীর গনিকে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজার বিষয়ক বিশেষ সহকারী নিযুক্ত করা হয়েছে। এই নিয়োগের মাধ্যমে সরকার শুধু একজন দক্ষ পেশাদারকে রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে অন্তর্ভুক্ত করেনি, বরং দেশের ভঙ্গুর পুঁজিবাজার ও বৈদেশিক বিনিয়োগে আমূল পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে। তানভীর গনির পদমর্যাদা প্রতিমন্ত্রীর সমান নির্ধারণ করা হয়েছে, যা তার ওপর অর্পিত দায়িত্বের গুরুত্ব ও সরকারের উচ্চাকাঙ্ক্ষী অর্থনৈতিক এজেন্ডাকে প্রতিফলিত করে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন সরকার দেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার লক্ষ্য স্থির করেছে; আর এমন সময়ে তানভীর গনির মতো বৈশ্বিক বিনিয়োগ নেতার উপস্থিতি অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে বিবেচিত হচ্ছে।

নিয়োগের পটভূমি ও প্রশাসনিক গুরুত্ব

২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ১৩তম সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পর প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করে। এই প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশের অর্থনীতি চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল—বিশেষ করে পুঁজিবাজারে সূচকের পতন, তারল্য সংকট ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার অভাব ছিল প্রকট। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সরাসরি বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারের তদারকির জন্য একজন বিশেষজ্ঞের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে। ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে তানভীর গনিকে এ পদে নিযুক্ত করা হয়। রুলস অব বিজনেস ১৯৯৬ অনুযায়ী তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তার বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা প্রতিমন্ত্রীর সমতুল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই নিয়োগ স্পষ্ট করে যে সরকার প্রচলিত আমলাতান্ত্রিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে সরাসরি বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন টেকনোক্র্যাটদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংস্কার ত্বরান্বিত করতে চায়। একই দিনে আরও কয়েকজন বিশেষ সহকারী নিযুক্ত হয়েছেন; যাদের মধ্যে বিজয়ন কান্তি সরকার সংখ্যালঘু বিষয়ক এবং শাকিরুল ইসলাম খান এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ক বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। এটি সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কৌশলগত উন্নয়ন দর্শনের প্রতিফলন।

তানভীর গনির বর্ণাঢ্য পেশাগত জীবন ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা

তানভীর গনির পেশাগত জীবনের অধিকাংশ সময় কেটেছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক আর্থিক কেন্দ্রগুলোতে। গোল্ডম্যান স্যাক্স ও টাইবোর্ন ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্টের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্ব দেওয়া এই বিশেষজ্ঞের মূল দক্ষতার ক্ষেত্র হলো অল্টারনেটিভ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট, হেজ ফান্ড ও প্রাইভেট ইকুইটি—যা বাংলাদেশের মতো উদীয়মান বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গোল্ডম্যান স্যাক্সের হংকং অফিসে প্রায় এক দশক ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন তিনি। সেখানে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ‘ক্যাপিটাল ইন্ট্রোডাকশন’ টিমের প্রধান হিসেবে বিশ্বের বড় বড় হেজ ফান্ড ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে গোল্ডম্যান স্যাক্সের সংযোগ স্থাপনের কৌশলগত দায়িত্ব পালন করেন। এর আগে ওয়েলস ফার্গো ব্যাংকে কর্পোরেট ও কমার্শিয়াল ব্যাংকিং বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন, যা তাকে ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিং ও ঋণবাজার সম্পর্কেও বিশেষজ্ঞ করে তুলেছে।

২০১২ সালে তানভীর গনি ও ঈশ্বর কৃষ্ণন মিলে হংকং-ভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান টাইবোর্ন ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠা করেন। এটি দ্রুত এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ ও প্রভাবশালী বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ২০২১ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকা সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। টাইবোর্নের বিনিয়োগ দর্শন ছিল দীর্ঘমেয়াদি ও মৌলিক গবেষণানির্ভর। তারা মূলত এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের উচ্চ প্রবৃদ্ধিসম্পন্ন প্রযুক্তি, যোগাযোগ ও ভোক্তা খাতের কোম্পানিতে বিনিয়োগ করত; যার মধ্যে আলিবাবা ও সী লিমিটেডের মতো বৈশ্বিক জায়ান্ট উল্লেখযোগ্য।

টাইবোর্নের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তানভীর গনি শুধু পুঁজি ব্যবস্থাপনাই করেননি, বরং প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন। ২০২১ সালের শেষে টাইবোর্ন যখন তাদের ফ্ল্যাগশিপ হেজ ফান্ড বন্ধ করে শুধু প্রাইভেট ইকুইটি ও অংশীদারদের পুঁজি ব্যবস্থাপনায় মনোনিবেশ করে, তখন তার নেতৃত্ব ও কৌশলগত সক্ষমতা প্রশংসিত হয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে টাইবোর্ন সম্পূর্ণরূপে বহিরাগত ক্লায়েন্টের পুঁজি ব্যবস্থাপনা থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়, যা তার অভিজ্ঞতায় নতুন মাত্রা যোগ করে।

বর্তমানে তিনি ওসিরিস গ্রুপের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০১৫ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে রয়েছেন। এর আগে ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টাইবোর্নে সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট, ২০০১ থেকে ২০১১ পর্যন্ত গোল্ডম্যান স্যাক্সে ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং তার পূর্ববর্তী কর্মস্থল ওয়েলস ফার্গো ব্যাংকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অ্যাকাডেমিক সম্পৃক্ততা

তানভীর গনির পেশাগত সাফল্যের পেছনে রয়েছে শক্ত শিক্ষাগত ভিত্তি। ২০০১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স (SIPA) থেকে ফিন্যান্স ও বিজনেস কনসেন্ট্রেশনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন তিনি। পেশাগত জীবনের পরেও তিনি এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন—কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অ্যাডভাইজরি বোর্ডের সদস্য এবং সাস্টেইনেবল ইনভেস্টিং রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের সঙ্গেও জড়িত।

২০১৮ সালে তানভীর গনি ও তার প্রতিষ্ঠান ওসিরিস গ্রুপ কলাম্বিয়া এসআইপিএ-তে ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের একটি গবেষণা তহবিল (ওসিরিস ফান্ড) চালু করার অঙ্গীকার করে। এই তহবিলের লক্ষ্য ছিল টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণের মতো বৈশ্বিক জননীতি চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করা। এই অ্যাকাডেমিক সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে যে তিনি শুধু মুনাফাকেন্দ্রিক বিনিয়োগে বিশ্বাসী নন, বরং উন্নয়নমূলক ও গবেষণালব্ধ বিনিয়োগ দর্শনেও আস্থাশীল। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে নীতি নির্ধারণে তার এই গবেষণাধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।

বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের বর্তমান চিত্র ও চ্যালেঞ্জ

তানভীর গনি এমন এক সময়ে দায়িত্ব নিয়েছেন যখন বাংলাদেশের পুঁজিবাজার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৮৬৫ পয়েন্টে নেমেছে, অথচ একই সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোতে পুঁজিবাজারের উল্টো চিত্র দেখা গেছে। পাকিস্তানের কেএসই সূচক বেড়েছে ৪৫ দশমিক ২৯ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার সিএসই অল-শেয়ার বেড়েছে ৪০ দশমিক ৭৭ শতাংশ, ভারতের বিএসই সেনসেক্স বেড়েছে ৮ দশমিক ৫২ শতাংশ।

এই হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পেছনে একাধিক কারণ দায়ী—নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও বাজার সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব ও আস্থার সংকট, বড় বড় রাষ্ট্রীয় ও বহুজাতিক কোম্পানি তালিকাভুক্ত করতে ব্যর্থ হওয়া, বাজার কারসাজিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণে দুর্বলতা এবং জরিমানা আদায়ে ব্যর্থতা। এ ছাড়া ব্যাংকিং খাতের অস্থিতিশীলতা ও উচ্চ সুদের হার বিনিয়োগকারীদের পুঁজিবাজার থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর নাগাদ ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন ডলার, যা পুরো আর্থিক খাতের জন্য বড় বোঝা।

তানভীর গনির সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এই আস্থাহীনতার পরিবেশ দূর করে পুঁজিবাজারকে বিনিয়োগবান্ধব করে তোলা। তার বৈশ্বিক পরিচিতি কাজে লাগিয়ে তিনি বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগকারীদের পুনরায় বাংলাদেশের বাজারে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে পারেন। এ ছাড়া ওসিরিস গ্রুপের মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘পাঠাও’-র মতো স্টার্টআপে তার বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তিভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসতে পারেন।

সরকারের ‘জুলাই চার্টার’ ও অর্থনৈতিক সংস্কার পরিকল্পনা

প্রধানমন্ত্রী তারিক রহমানের সরকার ‘জুলাই চার্টার’ নামে একটি সংস্কার রূপরেখা বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। এই চার্টারের অধীনে দেশের বিচার বিভাগ, নির্বাচন ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে আমূল পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। তানভীর গনির নিয়োগ এই সংস্কার প্রক্রিয়ারই গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সরকার ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার লক্ষ্য স্থির করেছে, যা অর্জনে বার্ষিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে।

জুলাই চার্টারের মূল অর্থনৈতিক দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা। চার্টারের ৭২, ৭৩ ও ৭৪ নম্বর ধারা অনুযায়ী ট্রাস্ট, ফাউন্ডেশন ও রাজনৈতিক দলের অর্থায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। তানভীর গনি পুঁজিবাজারের কোম্পানিগুলোর কর্পোরেট গভর্নেন্স নিশ্চিত করার মাধ্যমে এই স্বচ্ছতা আনয়নে ভূমিকা রাখতে পারেন। দুর্নীতি দমনের মাধ্যমেও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়ন সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। তানভীর গনির বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা দুর্নীতিমুক্ত ও নিয়মতান্ত্রিক বিনিয়োগ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়ক হবে। ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতির আওতায় বিশ্বের সব দেশের সঙ্গে সমান মর্যাদায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের কথাও বলা হয়েছে।

২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলার জিডিপির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চার কোটি তরুণ ও কয়েক লাখ নারীর স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই উন্নয়ন ও ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং-ভিত্তিক বিনিয়োগ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

ওসিরিস গ্রুপ ও বাংলাদেশে বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা

তানভীর গনি শুধু বিদেশি বাজারে বড় বিনিয়োগকারী নন, তিনি নিজ দেশ বাংলাদেশেও নিয়মিত বিনিয়োগ করে আসছেন। ওসিরিস গ্রুপের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি বাংলাদেশে প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগে সক্রিয়। ওসিরিস গ্রুপ বাংলাদেশের রাইড শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ‘পাঠাও’-এর অন্যতম বিনিয়োগকারী। এ ছাড়া ব্র্যাকের সঙ্গে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি ইমপ্যাক্ট ফান্ড গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করে।

তার এই ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং দর্শন বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওসিরিস গ্রুপ মূলত ছয়টি ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে: জলবায়ু পরিবর্তন, প্রযুক্তি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, কৃষি ও খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা এবং আইসিটি। সরকারের বিনিয়োগ বিষয়ক বিশেষ সহকারী হিসেবে তিনি এসব খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারবেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলায় তার অভিজ্ঞতা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ।

কৌশলগত অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ পথরেখা

তানভীর গনির নিয়োগের পর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারের প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু কৌশলগত পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। তার প্রাথমিক দায়িত্বগুলোর মধ্যে রয়েছে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে দেশ থেকে পাচার হওয়া প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পুনরুদ্ধারে সরকার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা করছে। তানভীর গনির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক ও গোল্ডম্যান স্যাক্সের মতো প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা পাচারকৃত অর্থের উৎস শনাক্ত ও তা দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ সহায়ক হতে পারে।

পুঁজিবাজারের আধুনিকায়নও তার অন্যতম কাজ। বিএসইসি ও ডিএসইতে কাঠামোগত পরিবর্তন এনে বাজারকে আরও গতিশীল করতে হবে; বিশেষ করে সরকারি কোম্পানিগুলোর শেয়ার বাজারে ছেড়ে তারল্য সংকট সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ বর্তমানে জিডিপির মাত্র ১ শতাংশের নিচে; এটিকে উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে উন্নীত করা তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। এ ছাড়া ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে জ্বালানি আমদানির জন্য সরকারের অতিরিক্ত ৩ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন; এই তহবিলের সংস্থান ও জ্বালানি খাতে টেকসই বিনিয়োগ নিশ্চিত করাও তার অগ্রাধিকারগুলোর একটি।

একটি নতুন অর্থনৈতিক ভোরের প্রত্যাশা

তানভীর গনিকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের একটি সাহসী পদক্ষেপ। বিশেষজ্ঞ মহল মনে করছেন, তার ওয়াল স্ট্রিটের অভিজ্ঞতা ও এশিয়ান বাজারে নেতৃত্বের দক্ষতা দেশের পুঁজিবাজারে নতুন প্রাণের সঞ্চার করবে। একদিকে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা ও পেশাগত সাফল্য প্রশ্নাতীত, অন্যদিকে পুঁজিবাজারের সংস্কার ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা তার জন্য একটি কঠিন পরীক্ষা হবে।

বাংলাদেশের বিনিয়োগকারী ও সাধারণ মানুষ এখন অধীর আগ্রহে দেখছেন যে, টাইবোর্ন ও গোল্ডম্যান স্যাক্সের এই কৃতি ব্যক্তিত্ব দেশের অর্থনীতিতে কতটা ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারেন। যদি তিনি তার বৈশ্বিক জ্ঞান ও স্থানীয় বাস্তবতার সফল সমন্বয় ঘটাতে পারেন, তাহলে ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির স্বপ্ন পূরণ হওয়া অসম্ভব নয়। ২০২৬ সালের ২ এপ্রিলের এই প্রজ্ঞাপনটি তাই বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। তানভীর গনির হাত ধরে বাংলাদেশ একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও প্রগতিশীল বিনিয়োগ সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে—এটাই এখন সবার প্রত্যাশা।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর