প্রকাশিত :  ১৬:২২
০১ এপ্রিল ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৯:২০
০১ এপ্রিল ২০২৬

পুঁজিবাজারের বাঁকবদল: ১ এপ্রিলের তেজ ও আগামীর কঠিন সমীকরণ

পুঁজিবাজারের বাঁকবদল: ১ এপ্রিলের তেজ ও আগামীর কঠিন সমীকরণ

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

২০২৬ সালের প্রথম এপ্রিল বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় হয়ে থাকবে। দীর্ঘদিনের মন্দার গ্লানি কাটিয়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) হঠাৎ উত্থান সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মনে আশার আগুন জ্বালালেও বাজার বিশ্লেষকদের কপালে চিন্তার রেখা এঁকেছে। প্রশ্নটি তাই স্বাভাবিক—এই উল্লম্ফন কি নিছকই একটি ক্ষণস্থায়ী প্রতিক্রিয়া, নাকি সুস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি ইঙ্গিত? উত্তর খুঁজতে হলে ডিএসইর চার্ট, সামষ্টিক অর্থনীতির সূচক এবং বিশ্ব রাজনীতির জটিল সমীকরণ—সবকিছুকে একসূত্রে গাঁথতে হবে।

গতকাল লেনদেন শেষে ডিএসইএক্স (DSEX) সূচক দাঁড়িয়েছে ৫,২৭২.৭৯ পয়েন্টে, যা আগের দিনের তুলনায় ৯৪.৪৮ পয়েন্ট বা ১ দশমিক ৮২ শতাংশ বেশি। এই উত্থান এমন এক সময়ে ঘটল, যখন মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সংকট দেশের অর্থনীতিকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল।

বাজারের অভ্যন্তরীণ শক্তি ও লেনদেনের গতি

গতকাল ডিএসইর চার্ট বিশ্লেষণ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে, লেনদেন শুরুর সময় থেকেই বাজার ছিল অস্বাভাবিক ইতিবাচক। মোট ৩২৬টি কোম্পানির শেয়ার দর বেড়েছে, যা মোট লেনদেন হওয়া ইস্যুগুলোর ৮৫ শতাংশ। অন্যদিকে দর হারিয়েছে মাত্র ৩৭টি কোম্পানি এবং অপরিবর্তিত ছিল ২২টির দর। এত ব্যাপকভিত্তিক উত্থান সাধারণত দেখা যায় না। বরং এতে বোঝা যায়, বাজারে এক ধরনের ‘প্যানিক বায়িং’ বা সুযোগ হাতছাড়া না করার প্রবণতা কাজ করেছে।

ডিএসইএক্স সূচকের অন্তর্দিবসীয় গতিপথ লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সকাল সাড়ে দশটায় লেনদেন শুরুর পর থেকেই সূচক ঊর্ধ্বমুখী ছিল এবং দুপুর দুইটার পরে তা সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছায়। মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৭১৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যা গত কয়েক দিনের তুলনায় অনেক বেশি। আয়তনের দিক থেকে ৩১ কোটি ৯১ লাখ শেয়ার হাতবদল হয়েছে। এই আয়তন বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে বাজারে নতুন তারল্য আসছে, যা মূলত প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তার ফল। বিশেষ করে ডিএস৩০ সূচকের ২ দশমিক ১২ শতাংশ বৃদ্ধি প্রমাণ করে যে মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরতে শুরু করেছে।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ ও গেইনারদের আধিপত্য

খাতভিত্তিক লেনদেনের দিকে তাকালে টেক্সটাইল, ইন্স্যুরেন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং খাত আজকের বাজারে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে। গেইনার তালিকার শীর্ষে থাকা টেক্সটাইল খাতের এই চাঙ্গাভাবের পেছনে কিছু আন্তর্জাতিক কারণ রয়েছে। যেমন, মার্কিনভিত্তিক কন্টুর ব্র্যান্ডস তাদের ঋণের বোঝা কমানোর খবর এবং ইউএস-বাংলাদেশ বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা টেক্সটাইল খাতের শেয়ারগুলোতে নতুন গতি সঞ্চার করেছে।

অন্যদিকে, ওষুধ ও রসায়ন খাত মোট লেনদেনের মূল্যের দিক থেকে শীর্ষে ছিল, যা বোঝায়, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা এখনো এই খাতকে সবচেয়ে নিরাপদ মনে করছেন। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, গত মার্চ মাস জুড়ে জেড-ক্যাটাগরির বা দুর্বল কোম্পানিগুলো গেইনার তালিকার শীর্ষে ছিল, যা বাজারের সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। গতকাল সেই প্রবণতা কিছুটা কমলেও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের এখনো সতর্ক থাকা জরুরি।

সামষ্টিক অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

পুঁজিবাজার কখনোই বিচ্ছিন্ন কোনো দ্বীপ নয়। ১ এপ্রিলের এই উত্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ নীতিমালার বড় ভূমিকা রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) প্রাক-বাজেট বৈঠকে ব্যাংকিং খাতের কর্পোরেট কর কমানোর এবং আবগারি শুল্কের সীমা বাড়ানোর যে ইঙ্গিত দিয়েছে, তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে ব্যাংক কর্পোরেট কর ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার প্রস্তাব এবং আবগারি শুল্কের অব্যাহতি সীমা ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়ানোর ইঙ্গিত ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য আশার খবর।

এনবিআর চেয়ারম্যানের এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ হাজার কোটি টাকার বিশেষ রেপো নিলামের মাধ্যমে বাজারে তারল্য সরবরাহের চেষ্টা করছে। ব্যাংকগুলোর তারল্য সংকট কাটলে তারা পুঁজিবাজারে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে, যা দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। তবে মুদ্রাস্ফীতির হার ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে থাকা এবং রেপো রেট ১০ শতাংশে উন্নীত হওয়া এখনো বাজারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।

বৈশ্বিক অস্থিরতা ও জ্বালানি সংকট

বাংলাদেশের বাজারের এই তেজি ভাবকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা। ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বাংলাদেশের পরিবহন ও শিল্প উৎপাদন খাতে। হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতা আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, যা আমাদের রিজার্ভের ওপর আরও চাপ তৈরি করবে। বিনিয়োগকারীরা আশঙ্কা করছেন, এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন পুঁজিবাজারের এই উত্থানকে থামিয়ে দিতে পারে।

টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস: সাপোর্ট ও রেজিস্ট্যান্স লেভেল

প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের দিক থেকে ডিএসইএক্স সূচকটি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। গতকাল ৯৪ পয়েন্টের লাফ সূচকটিকে ৫,২৭২ পয়েন্টে নিয়ে গেছে। ডিএসইর ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, ৫,৩০০ পয়েন্ট একটি শক্তিশালী রেজিস্ট্যান্স লেভেল হিসেবে কাজ করে। যদি আজ সূচকটি ৫,৩০০ পয়েন্টের বাধা অতিক্রম করতে পারে এবং সেখানে স্থিতিশীল হয়, তবে পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হতে পারে ৫,৫০০ পয়েন্ট।

সূচকটির সাপোর্ট লেভেল এখন ৫,১৮০ থেকে ৫,২০০ পয়েন্টের মধ্যে অবস্থান করছে। যদি বৈশ্বিক কোনো সংবাদের কারণে বাজারে বিক্রয়চাপ বাড়ে, তবে সূচক এই লেভেলে ফিরে আসতে পারে। আরএসআই এবং মুভিং এভারেজ নির্দেশকগুলো বর্তমানে ‘ওভারবট’ জোনের কাছাকাছি থাকলেও বাজারের সেন্টিমেন্ট এখনো ইতিবাচক।

বর্তমান বাজারে অনেক মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানির পিই অনুপাত ১২ থেকে ১৫-এর মধ্যে রয়েছে, যা নির্দেশ করে শেয়ারগুলো এখনো অতিমূল্যায়িত নয় এবং বিনিয়োগের জন্য আকর্ষণীয়। বিশেষ করে ওষুধ ও ব্যাংকিং খাতের অনেক কোম্পানির ডিভিডেন্ড ইল্ড ব্যাংক জমার সুদের হারের চেয়েও বেশি হতে পারে, যদি প্রস্তাবিত করছাড় বাস্তবায়িত হয়।

আগামীকালের পুঁজিবাজার: একটি নির্মোহ পূর্বাভাস

আজ অর্থাৎ ২ এপ্রিল বাজার কেমন যাবে—তা মূলত তিনটি প্রধান চলকের ওপর নির্ভর করছে।

প্রথমত, এনবিআরের খবরের ফলো-আপ। গতকাল এনবিআরের ইতিবাচক বক্তব্যের পর আজ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা বাজারে বড় ধরনের ‘এন্ট্রি’ নিতে পারেন। বিশেষ করে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর শেয়ারে বড় উত্থান প্রত্যাশিত।

দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যের খবর। রাতারাতি যদি ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের নতুন কোনো মোড় আসে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারের পতন আমাদের বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিনিয়োগকারীরা তখন নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে শেয়ার বিক্রি করে দিতে পারেন।

তৃতীয়ত, প্রফিট বুকিং প্রবণতা। যেহেতু গতকাল ৮৫ শতাংশ শেয়ারের দাম বেড়েছে, তাই আজ অনেক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী তাদের অর্জিত মুনাফা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। এর ফলে লেনদেনের শুরুর দিকে বাজারে কিছুটা অস্থিরতা বা সূচকের ওঠানামা দেখা দিতে পারে।

তবে সব মিলিয়ে আজ বাজারের টোন ইতিবাচক থাকার সম্ভাবনাই বেশি। যদি ডিএসইএক্স ৫,৩০০ পয়েন্টের ওপরে ক্লোজিং দিতে পারে, তবে এটি হবে বাজারের জন্য একটি বড় অর্জন। বিনিয়োগকারীদের প্রতি পরামর্শ থাকবে, তারা যেন কেবল সূচকের পেছনে না ছুটে কোম্পানির মৌলভিত্তি, ক্যাশ ফ্লো এবং আসন্ন লভ্যাংশের খবর বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেন।

দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি ও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এলডিসি তালিকা থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই উত্তরণ আমাদের অর্থনীতির জন্য যেমন গৌরবের, তেমনি এটি কিছু চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসবে। শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার মুখে আমাদের শিল্পখাতকে আরও দক্ষ হতে হবে। পুঁজিবাজার এই ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কোম্পানিগুলো যদি আইপিও বা বন্ডের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহ করতে পারে, তবে তারা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত হতে পারবে।

সাজিদা ফাউন্ডেশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে ‘অরেঞ্জ বন্ড’ বা ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টমেন্টের যে নতুন ধারা শুরু হয়েছে, তা আমাদের পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়াবে। বিনিয়োগকারীদের শুধু ইক্যুইটি শেয়ারে সীমাবদ্ধ না থেকে বন্ড মার্কেটেও বৈচিত্র্য আনা উচিত।

১ এপ্রিল ২০২৬-এর ডিএসই চার্ট আমাদের এক নতুন আশার কথা বলছে। কিন্তু পেশাদার সাংবাদিকের কলমে বলতে গেলে, এই আশার মধ্যে মিশে আছে একরাশ সতর্কতা। বাজারের এই তেজ যাতে কৃত্রিমভাবে তৈরি না হয় এবং ‘জেড’ ক্যাটাগরির শেয়ারের মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা যাতে প্রতারিত না হন, তা নিশ্চিত করতে বিএসইসি এবং ডিএসই কর্তৃপক্ষকে কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে হবে। আজকের বাজার হবে একটি অগ্নিপরীক্ষা—যদি বাজার ৫,৩০০ পয়েন্টের বাধা পার হতে পারে, তবে আমরা হয়তো এক নতুন র‍্যালি সূচনা দেখতে যাচ্ছি। অন্যথায়, বৈশ্বিক অস্থিরতার চোরাবালিতে বাজার আবার স্থির হয়ে যেতে পারে। বিনিয়োগই হোক গবেষণালব্ধ এবং ধৈর্যই হোক আপনার মূলধন।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর