সংগ্রাম দত্ত
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি গুরুতর ঘটনার সারসংক্ষেপ থেকে দেখা যায়, দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এক অপ্রত্যাশিত চাপে রয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসের মধ্যেই রাজধানী ঢাকার উত্তরা স্কয়ারসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড ও মব হামলার ঘটনাগুলো প্রকাশ পেয়েছে, যা সমাজে নিরাপত্তাহীনতার চিত্র আরও গভীর করেছে।
১৬ মার্চ ২০২৬, দৈনিক যুগান্তর “মাথাবিচ্ছিন্ন লাশ উদ্ধার, জানা গেল হত্যার কারণ” শীর্ষক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলায় একজন যুবকের মস্তিষ্ক বিচ্ছিন্ন লাশ উদ্ধার করা হয়। হত্যার সঙ্গে জড়িত দুই আসামিকে বরিশাল থেকে গ্রেফতার করেছে র্যাব-৮। ঘটনার পেছনে মাদক ব্যবসা ও নারী সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশের সহায়তায় র্যাব দ্রুত হত্যাকাণ্ডের ক্লু উদঘাটন করেছে।
এর একদিন আগে, ১৫ মার্চ ২০২৬, কালের কণ্ঠ “পুলিশ কর্মকর্তার মায়ের গলা কাটা লাশ উদ্ধার” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খুলনার পাইকগাছায় পুলিশের এক কর্মকর্তা তাঁর মাকে হত্যার শিকার হন। মৃত ভারতী মন্ডলের লাশ বাড়ির পাশের মাছের ঘের থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে।
রাজধানীতে গুজব-ভিত্তিক সহিংসতার উদাহরণও মেলে। ১৬ মার্চ ২০২৬, ইত্তেফাক “উত্তরায় রিকশাচালককে হত্যার গুজবে বিপণিবিতানে ভাঙচুর, গ্রেপ্তার ১২” প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরে একটি রিকশাচালকের নিহত হওয়ার গুজব ছড়িয়ে পড়লে শপিং মলে ভাঙচুর ও আগুন ধরানো হয়। পরে সিসিটিভি ফুটেজ নিশ্চিত করে যে, রিকশাচালক সুস্থ অবস্থায় ছিল, মূল ঘটনা গুজব মাত্র।
সাম্প্রদায়িক সহিংসতার মাত্রাও উদ্বেগজনক। ১৩ মার্চ ২০২৬, ইত্তেফাক “নতুন সরকারকে ‘মধুচন্দ্রিমা’ শেষ করে দ্রুত দেশের আইনশৃঙ্খলা ফেরানোর আহ্বান জানালেন সংখ্যালঘু নেতারা” শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নেতারা অভিযোগ করেছেন, নির্বাচনের মাত্র এক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে অর্ধশতাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে হত্যা, মন্দিরে হামলা, জমি দখল ও লুটপাটের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত। নেতারা নতুন সরকারকে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা ফেরাতে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আহ্বান জানান।
গত বছরের পরিসংখ্যানও পরিস্থিতির গুরুতর চিত্র ফুটিয়ে তোলে। ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, দি বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড “বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৫: আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) এর পর্যবেক্ষণ” শীর্ষক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মব সন্ত্রাসে অন্তত ২৯৩ জন নিহত হন, যার মধ্যে সংখ্যালঘু, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীও রয়েছে। একই বছর সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির সংখ্যা ৩৮১। দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, কারাগারে মৃত্যুর ঘটনা এবং সংবাদপত্রের অফিসে পরিকল্পিত হামলা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও বিপন্ন করেছে।
উপরের সব ঘটনা প্রমাণ করে, দেশে মব সন্ত্রাস, মাদকসহিত সহিংসতা ও সাম্প্রদায়িক আক্রমণের ধারা গতিশীল। নতুন সরকারের প্রাথমিক একমাসের সময়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তৎপরতা অপরিহার্য। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এখন সময়ের দাবী।
একদিকে আইন ও আদালতের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং অপর দিকে গুজব ও মব সংক্রান্ত সহিংসতা প্রতিরোধ করা—এই দ্বৈত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারের দৃষ্টি দ্রুত প্রয়োজন। নাগরিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার রক্ষায় কোন প্রকার ন্যূনতম সহমর্মিতা অনুপযুক্ত। নতুন সরকারের জন্য এটি শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং দেশের সামাজিক এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পরীক্ষাও বটে।
Leave Your Comments