প্রকাশিত :  ০৯:৩০
২৫ মার্চ ২০২৬

সবুজ হারানোর শঙ্কা: মৌলভীবাজারজুড়ে বন উজাড়ের নীরব মহামারি

সবুজ হারানোর শঙ্কা: মৌলভীবাজারজুড়ে বন উজাড়ের নীরব মহামারি
সংগ্রাম দত্ত: মৌলভীবাজার—চা বাগান আর সবুজে ঘেরা এই জেলার পরিচিতি আজ ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বনভূমি উজাড়, গাছ পাচার এবং প্রভাবশালী মহলের দখলদারিত্ব এখন যেন এক নীরব মহামারিতে পরিণত হয়েছে। প্রশাসনের চোখের সামনে ঘটলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা থামছে না—বরং অভিযোগ উঠছে সংশ্লিষ্টদের একাংশের নীরব সমর্থনের।

সম্প্রতি মৌলভীবাজার জেলা শহরের একসময়ের তুখোড় সাংবাদিক আব্দুল হামিদ মাহবুব তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ছবি ও ভিডিওসহ একটি পোস্ট দিয়ে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আনেন। তিনি লিখেছেন, "আড়াই বছর আগে শহর ছেড়ে এসেছিলাম, সবুজের কাছাকাছি থাকতে। বন বিভাগ সৃজিত বাগানের কাছেই বাসা। সেই বাগানের গাছ কাটা হচ্ছে। বন বিভাগ চেয়েও দেখছে না!"
তাঁর পোস্টে দেখা যায়, বন বিভাগের সৃজিত বাগান থেকে কাটা গাছের টুকরো ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন,
"দেখাশোনা করার মানুষ আছে। কিন্তু তারা দেখেও দেখছে না। বরঞ্চ কোন কোন ক্ষেত্রে কেটে ফেলায় সহায়তা করছে।"
এই ঘটনায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে বিব্রতও হন। কারণ, বিষয়টি নিয়ে কথা বলায় সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি তার বাসায় এসে সমস্যার কথা জানান। পরে তারা প্রতিশ্রুতি দেন—"একটা গাছের জন্য দশটা গাছ লাগাবেন।" মাহবুব জানান, সাতটি গাছের বিপরীতে ৭০টি চারা রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—এভাবে প্রতিশ্রুতি দিয়ে কি বন ধ্বংসের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব?
মাহবুব তাঁর পোস্টে পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরে লেখেন, "গাছ আমাদের অক্সিজেন দেয়… সবুজ গাছগাছালিই সকল বিষ গ্রহণ করে মানুষের বসবাস উপযোগী করে রাখে পৃথিবীকে… মানুষ বেঁচে থাকতে হলে পৃথিবীর গাছ-গাছালি বেঁচে থাকতে হবে।"

শুধু জেলা শহরেই নয়, একই চিত্র দেখা যাচ্ছে জেলার বিভিন্ন উপজেলায়। বড়লেখা ও জুড়ী উপজেলার পাথারিয়া বনাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বনজ সম্পদ উজাড় করে বসতি স্থাপন করা হয়েছে। যা অবশিষ্ট আছে, সেটুকুও এখন হুমকির মুখে।
কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান—দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষিত বনাঞ্চল—সেখানেও দখলদারিত্বের অভিযোগ রয়েছে। 

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী বনভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে সেখানে বসতি, রিসোর্ট এবং আনারস, লেবু ও কাঁঠালের বাগান গড়ে তুলেছে। গত কয়েক দশকে কোটি কোটি টাকার গাছ ও বাঁশ উজাড় করে অনেকেই বিপুল ধনসম্পদের মালিক হয়েছেন। সঙ্ঘবদ্ধ দলের অনেকে রাতারাতি বিলিয়নিয়ার হয়ে লাঠি, গুষ্টি ও টাকার জোরে জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত হয়েছেন বলে শোনা গেছে।

একই অবস্থা কমলগঞ্জের রাজকান্দি ফরেস্টেও। বিশাল বনাঞ্চল উজাড় হয়ে অনেক এলাকায় প্রায় মরুভূমির মতো চিত্র দেখা যাচ্ছে। কুলাউড়া ও শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চলেও একইভাবে মূল্যবান গাছ কেটে বনভূমিকে উন্মুক্ত জমিতে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ প্রভাবশালী চক্র, যাদের সঙ্গে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে। এলাকাবাসী সবকিছু দেখলেও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবার ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয়  সাংবাদিকদের অনেকেই প্রভাবশালী মহলের সাথে স্বার্থসংশ্লিষ্ট থাকায় নীরব থাকেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে বন উজাড়ের সরাসরি প্রভাব পড়ছে বন্যপ্রাণীর ওপর। শ্রীমঙ্গল, কমলগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিভিন্ন বনাঞ্চল ধ্বংস হওয়ায় বন্য পশুপাখির খাদ্য সংকট দেখা দিচ্ছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসছে। প্রায়ই দেখা যাচ্ছে—বন্যপ্রাণী গ্রাম ও শহরাঞ্চলে ঢুকে পড়ছে, যা মানুষের জন্য যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি প্রাণীগুলোর জন্যও মারাত্মক বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বিভিন্ন সময় সড়ক পারাপারের সময় অনেক বন্যপ্রাণী যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে মারা গেছে। আবার কোথাও কোথাও জনসাধারণের হাতে ধরা পড়ে প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটছে। তবে সচেতন কিছু মানুষ বন্যপ্রাণী দেখতে পেলেই বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনকে খবর দেন। সংস্থাটি দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করে। জানা গেছে, গত দুই দশকে এ ধরনের উদ্ধার অভিযানের সংখ্যা দুই  হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, বনাঞ্চল ধ্বংসের ফলে শুধু গাছই হারাচ্ছে না, ব্যাহত হচ্ছে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আবাস ও চলাচল। এতে করে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত দিন দিন বাড়ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি।

মাহবুবের কথায় যেন সেই সতর্কবার্তাই প্রতিফলিত হয়— "যদি পৃথিবীতে বৃক্ষ না থাকতো… কোন প্রাণীর অস্তিত্ব কি তখন দেখা যেত?… মানুষ বাঁচতে হলে গাছ বাঁচাতে হবে।"
পরিবেশ রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে, সবুজের জন্য পরিচিত এই জেলা খুব দ্রুতই হারাতে পারে তার স্বকীয়তা।


প্রতিবছর অন্তত একটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন সাংবাদিক মাহবুব। কিন্তু শুধু গাছ লাগানো নয়—বিদ্যমান বন রক্ষা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Leave Your Comments




ভ্রমণ এর আরও খবর