প্রকাশিত :  ১৭:০৯
২৪ মার্চ ২০২৬

'প্রস্তুত' শ্রীমঙ্গল, নাকি প্রস্তুতির সংকট? ঈদের ভিড়ে বাস্তবতার মুখোমুখি পর্যটন নগরী

'প্রস্তুত' শ্রীমঙ্গল, নাকি প্রস্তুতির সংকট? ঈদের ভিড়ে বাস্তবতার মুখোমুখি পর্যটন নগরী
সংগ্রাম দত্ত: পর্যটন নগরী ও চায়ের স্বর্গরাজ্য শ্রীমঙ্গল—নামের মধ্যেই যার সৌন্দর্যের পরিচয়। চারদিকে বিস্তৃত চা-বাগানের সবুজ সমারোহ, বনাঞ্চল, হাওর-লেক, ঝোপ-জঙ্গল, ছোট-বড় টিলা আর পাহাড় মিলিয়ে যেন প্রকৃতি এখানে নিজেই সাজিয়েছে এক নৈসর্গিক ক্যানভাস। নিরব সবুজ চাদরের মতো বিস্তৃত এই জনপদ সারা বছরই টানে ভ্রমণপিপাসু মানুষকে। আর ঈদ এলেই সেই টান রূপ নেয় জনস্রোতে।

ঈদের আগে প্রতিবছরের মতো এবারও শোনা গেছে পরিচিত সেই বাক্য—"পর্যটকদের বরণ করতে প্রস্তুত শ্রীমঙ্গল"। কিন্তু ঈদের ছুটির বাস্তব চিত্র যেন সেই ঘোষণাকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা এই শহর এবারও পর্যটকদের ঢলে মুখর হলেও, সামনে এসেছে অব্যবস্থাপনার পুরনো চিত্র।

ঈদের দিন থেকে শুরু করে পরবর্তী তিন দিন শ্রীমঙ্গল-কমলগঞ্জ সড়কজুড়ে তৈরি হয় চরম যানজট ও মানুষের ভিড়। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রবেশপথ থেকে শ্রীমঙ্গল শহর সংলগ্ন হবিগঞ্জ রোডের পল্লী বিদ্যুৎ গেইট পর্যন্ত কয়েক মাইলজুড়ে যানবাহনের দীর্ঘ সারি এবং মানুষের উপচে পড়া ভিড় স্বাভাবিক চলাচলকে প্রায় অচল করে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে লেগেছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।

ঈদের তৃতীয় দিনেও একই চিত্র দেখা গেছে। পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের সামনের সড়ক থেকে প্রায় পাঁচ মাইল দূরে লাউয়াছড়া প্রবেশদ্বার পর্যন্ত ভিড় এতটাই ছিল যে, সহজে সেখানে পৌঁছানো ছিল একপ্রকার দুরূহ কাজ। অনেক পর্যটককেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা কিংবা পায়ে হেঁটে গন্তব্যে যেতে হয়েছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরব হয়েছেন শ্রীমঙ্গলের পরিচিত মুখ মোঃ তারিক হাসান। তার একটি ভিডিও পোস্ট দ্রুত ভাইরাল হয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বলেন, “শুধু কয়েকটি রিসোর্ট থাকলেই কি একটি শহর পর্যটনবান্ধব হয়ে যায়?” তাঁর এই মন্তব্য স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও ক্ষোভের প্রতিফলন বলেই মনে করছেন অনেকে।

অন্যদিকে পর্যটকদের উপস্থিতিতে শ্রীমঙ্গলের প্রায় সব দর্শনীয় স্থানই ছিল পরিপূর্ণ। বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন, শ্যামলী পর্যটন কেন্দ্র, বিটিআরআই, শংকরটিলা, কালিটিলা, নির্মাই শিববাড়ি, ফিনলে টি কোম্পানির চা-বাগান, জেরিন, ইস্পাহানি, রাধানগর, ডলুছড়াসহ বিভিন্ন স্পটে ছিল উপচে পড়া ভিড়। আন্তর্জাতিক মানের ফাইভস্টার রিসোর্ট, হোটেল-মোটেল এবং স্থানীয় আধুনিক আবাসনগুলোতেও ছিল শতভাগ দখল।

পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে টুরিস্ট পুলিশকে রাখতে হয়েছে বাড়তি সতর্কতা। বিভিন্ন স্পটে টহল জোরদার করা হয়। এ সময় নবনির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুজিবুর রহমান চৌধুরীকেও পর্যটকদের সঙ্গে কথা বলতে এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে দেখা গেছে।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—পর্যটনবান্ধব শহর হিসেবে শ্রীমঙ্গলের যে পরিচয় তুলে ধরা হয়, তা কতটা বাস্তবসম্মত? পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা, যানজট নিয়ন্ত্রণ, পর্যটক ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ—এসব ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকায় প্রতি বছরই ঈদের সময় একই চিত্র ফিরে আসে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পর্যটকের সংখ্যা বাড়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। এতে স্থানীয় অর্থনীতি চাঙা হয়, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসে। কিন্তু পরিকল্পিত অবকাঠামো ও সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ছাড়া এই চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। শুধু প্রচারণা নয়, বাস্তব প্রস্তুতির প্রতিফলনই পারে একটি পর্যটন নগরীকে সত্যিকারের অর্থে "প্রস্তুত" করে তুলতে।

সব মিলিয়ে, অপরূপ প্রকৃতির টানে মানুষ বারবার ছুটে আসে শ্রীমঙ্গলে। কিন্তু সেই টানকে টেকসই রাখতে হলে সৌন্দর্যের পাশাপাশি প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা—যেখানে "প্রস্তুতি" শুধু কথায় নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতায় প্রতিফলিত হবে।

Leave Your Comments




ভ্রমণ এর আরও খবর