প্রকাশিত :  ১৮:১৬
২৩ মার্চ ২০২৬

এবার বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র...

এবার বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা স্থগিত করল যুক্তরাষ্ট্র...

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৬ সালের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও ভিসা নীতিতে এক নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। এটি শুধু ওয়াশিংটনের কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং ঢাকা থেকে নিউ ইয়র্ক—লাখ লাখ বাংলাদেশির জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ। ট্রাম্প প্রশাসনের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ধারাবাহিকতায় নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত সাধারণ ভ্রমণকারী থেকে শুরু করে দীর্ঘদিনের অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা স্থগিতাদেশ এবং ৩৮টি দেশের ওপর আরোপিত উচ্চমূল্যের ‘ভিসা বন্ড’ প্রথা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এই লেখায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা নীতির বিভিন্ন দিক, এর আইনি ভিত্তি, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব এবং ক্ষতিগ্রস্তদের মানবিক সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

অভিবাসী ভিসা স্থগিতাদেশ: প্রেক্ষাপট ও কৌশল

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর সম্প্রতি ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য অভিবাসী ভিসা ইস্যু অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে। এই সিদ্ধান্তের মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ‘পাবলিক চার্জ’ বা সরকারি জনকল্যাণ সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ার আশঙ্কা। মার্কিন প্রশাসনের দাবি, এসব দেশের নাগরিকরা যুক্তরাষ্ট্রে এসে কর্মসংস্থানের চেয়ে সরকারি সহায়তার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন, যা মার্কিন করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে।

পাবলিক চার্জের নতুন সংজ্ঞা ও বাংলাদেশের অবস্থান

যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও জাতীয়তা আইনের (আইএনএ) ২১২(এ)(৪) ধারা অনুযায়ী, কারও ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অযোগ্য ঘোষণা করা যেতে পারে। ২০২৬ সালের এই নীতিতে পাবলিক চার্জের মূল্যায়ন প্রক্রিয়া আরও কঠোর করা হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রচারিত একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় কনস্যুলার কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে, তারা যেন আবেদনকারীর আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি স্বাস্থ্যগত অবস্থা, পারিবারিক কাঠামো এবং ইংরেজি ভাষার দক্ষতাও গভীরভাবে যাচাই করেন।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই কঠোরতার পেছনে পরিসংখ্যানগত কারণও দেখানো হয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারগুলোর মধ্যে ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ কোনো না কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা গ্রহণ করে। এই উচ্চ হারের কারণেই বাংলাদেশকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যদিও অভিবাসন আইনজীবীরা যুক্তি দেন যে অভিবাসীরা শুরুতে কিছুটা সরকারি সহায়তা নিলেও দীর্ঘমেয়াদে তারা মার্কিন অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখেন, কিন্তু বর্তমান প্রশাসন জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অজুহাতে এই যুক্তিকে উপেক্ষা করছে।

অভিবাসী ভিসা স্থগিতাদেশটি ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে। বাংলাদেশসহ মোট ৭৫টি দেশের সব ক্যাটাগরির অভিবাসী ভিসা—যেমন আইআর-১, আইআর-২, আইআর-৫ এবং এফ-ক্যাটাগরি—এই স্থগিতাদেশের আওতায় পড়েছে। মূল কারণ হিসেবে পাবলিক চার্জ বা সরকারি সহায়তার ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতার ঝুঁকিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও কনস্যুলার সাক্ষাৎকার চলমান থাকবে, তবে নতুন করে আর কোনো ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে না।

৭৫ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের সহযাত্রীরা

যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিবাসন নীতির পরিধি ব্যাপক। স্থগিতাদেশের তালিকায় থাকা ৭৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার আরও তিনটি দেশ—আফগানিস্তান, ভুটান ও নেপাল—রয়েছে। এ ছাড়া আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশ এই নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছে। লক্ষণীয়, ট্রাম্পের পূর্ববর্তী মেয়াদের ‘ট্রাভেল ব্যান’ বা ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকায় না থাকা ব্রাজিল, কলম্বিয়া ও ঘানার মতো দেশগুলো এবার ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, এবারের কড়াকড়ি শুধু নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং এটি একটি গভীর অর্থনৈতিক ছাঁটাই প্রক্রিয়ার অংশ।

ভিসা বন্ড: ভ্রমণের ওপর নতুন আর্থিক প্রাচীর

অভিবাসী ভিসা স্থগিতের পাশাপাশি অনভিবাসী বা অস্থায়ী ভিসার (বিশেষ করে বি-১/বি-২) ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র এক অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশসহ ৩৮টি দেশের নাগরিকদের জন্য ‘ভিসা বন্ড’ বা জামানত প্রথা চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় পর্যটক বা ব্যবসায়ীকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগে পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত জামানত জমা দিতে হতে পারে।

ভিসা বন্ডের পরিমাণ আবেদনকারীর সামাজিক ও আর্থিক অবস্থার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে সাক্ষাৎকারের সময় কনস্যুলার কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত নেন, আবেদনকারীকে বন্ড দিতে হবে কি না এবং কত পরিমাণ জামানত রাখতে হবে। পাঁচ হাজার ডলারের বন্ড (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৬ লাখ ১১ হাজার ৫৫০ টাকা) সাধারণত স্বচ্ছ আর্থিক রেকর্ড ও শক্তিশালী সামাজিক বন্ধন সম্পন্ন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ১০ হাজার ডলারের বন্ড (প্রায় ১২ লাখ ২৩ হাজার ১০০ টাকা) দেওয়া হয় মাঝারি মানের আর্থিক সক্ষমতাসম্পন্ন বা প্রথমবার ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রে। আর ১৫ হাজার ডলারের বন্ড (প্রায় ১৮ লাখ ৩৪ হাজার ৬৫১ টাকা) দেওয়ার কথা বলা হয়েছে তরুণ আবেদনকারী বা যাদের দেশে ফেরার জোরালো প্রমাণ কম, এমন ব্যক্তিদের জন্য।

এই অর্থ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। আবেদনকারীকে বা তার স্পনসরকে যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি দপ্তরের ফর্ম আই-৩৫২ পূরণ করতে হয় এবং মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের ওয়েবসাইট ‘পে.গভ’-এর মাধ্যমে অর্থ জমা দিতে হয়। দূতাবাসগুলো সতর্ক করে দিয়েছে, যেন কেউ তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে বা আগেভাগে এই অর্থ জমা না দেয়। বন্ডটি কেবল তখনই ফেরতযোগ্য হবে, যদি ভ্রমণকারী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করেন এবং ভিসার কোনো শর্ত ভঙ্গ না করেন।

ভিসা বন্ড প্রোগ্রামের আওতায় যারা ভিসা পাবেন, তাদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও প্রস্থানের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিমানবন্দর ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। এতে করে ইমিগ্রেশন বিভাগ সহজেই নিশ্চিত করতে পারে যে বন্ডধারী ব্যক্তি সময়মতো দেশ ছেড়েছেন কি না। নির্ধারিত বিমানবন্দরগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউ ইয়র্কের জেএফকে (যা অধিকাংশ বাংলাদেশি ব্যবহার করেন), বোস্টনের লোগান এবং ওয়াশিংটন ডিসির ডালস। এই তিনটি বিমানবন্দরের বাইরে অন্য কোনো পথে প্রবেশ বা প্রস্থান করলে বন্ডের অর্থ বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই বিধিনিষেধ বাংলাদেশের ভ্রমণকারীদের জন্য এক ধরনের ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।

অর্থনৈতিক আঘাত: রেমিট্যান্স ট্যাক্স ও মুদ্রার প্রবাহ

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভিসা ও অভিবাসন নীতির প্রভাব শুধু ব্যক্তি বা পরিবার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপর মার্কিন প্রশাসনের নতুন কর আরোপ বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য শঙ্কার বিষয়।

ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিটি ১০০ মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স পাঠানোর ওপর এক ডলার অতিরিক্ত কর আরোপ করেছে। আপাতদৃষ্টিতে এই কর ক্ষুদ্র মনে হলেও সামষ্টিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব বিশাল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতি বছর কয়েক বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বাংলাদেশে আসে। এই অতিরিক্ত কর প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা পাঠানোর আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এই কর সরাসরি রেমিট্যান্সের ওপর বড় ধাক্কা। এটি প্রবাসীদের হুন্ডির মতো অনানুষ্ঠানিক পথে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত করবে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে।

ভিসা বন্ডের জন্য ১৫ হাজার ডলার বা প্রায় ১৮ লাখ টাকা জোগাড় করতে অনেক পরিবারকে তাদের শেষ সম্বল জমি বা সম্পত্তি বিক্রি করতে হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বৈধ পথে বিদেশে পাঠানোর ক্ষেত্রেও নানা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রবাসীদের অনেকে তাদের কষ্টার্জিত অর্থ মার্কিন ব্যাংকে না রেখে অন্য পথে বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করছেন, কারণ তারা আশঙ্কা করছেন যে কোনো সময় তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা সম্পদের ওপরও কঠোর বিধিনিষেধ আসতে পারে।

মানবিক সংকট: বিদীর্ণ পরিবার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

পরিসংখ্যান ও অর্থনীতির ঊর্ধ্বে এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ মানুষ। বাংলাদেশে হাজারো পরিবার আছে যাদের অর্ধেক সদস্য যুক্তরাষ্ট্রে, অর্ধেক বাংলাদেশে। অভিবাসী ভিসা স্থগিত হওয়ায় এই পরিবারগুলোর পুনর্মিলন এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিকদের জন্য তাদের বাবা-মাকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার জনপ্রিয় মাধ্যম আইআর-৫ ভিসা। অনেক সন্তান তাদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে শেষ জীবনে কাছে রাখতে কয়েক বছর ধরে আবেদন করে অপেক্ষা করছিলেন। ঢাকার মার্কিন দূতাবাস এই ক্যাটাগরির জন্য দুই দিনের বিশেষ সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়া চালু করলেও শেষ পর্যন্ত স্থগিতাদেশের কারণে কোনো ভিসা ইস্যু করা হচ্ছে না। ফলে অনেক বৃদ্ধ বাবা-মা বাংলাদেশে একা পড়ে আছেন, আর তাদের সন্তানরা যুক্তরাষ্ট্রে থেকেও তাদের জন্য কিছুই করতে পারছেন না।

অনেক বাংলাদেশি-আমেরিকান সম্প্রতি বাংলাদেশে এসে বিয়ে করেছেন এবং তাদের জীবনসঙ্গীকে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার আবেদন করেছেন। কিন্তু ২১ জানুয়ারির পর থেকে এই প্রক্রিয়াগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। অভিবাসন আইনজীবীদের মতে, এমন অনেক দম্পতি আছেন যাদের ভিসা আবেদনের সব ধাপ সম্পন্ন হয়েছিল, শুধু সিল মোহরের অপেক্ষায় ছিলেন, তারাও এখন এই স্থগিতাদেশের কবলে। পরিবারের এই বিচ্ছেদ প্রবাসীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে।

২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশিদের জন্য ইস্যু করা মোট মার্কিন ভিসার সংখ্যা ছিল ৫৯ হাজার ২৫৪টি। এর মধ্যে অনভিবাসী ভিসা (বি-১/বি-২, এফ-১ ইত্যাদি) ছিল ৪৪ হাজার ৬৭৪টি এবং অভিবাসী ভিসা (গ্রিনকার্ড প্রত্যাশী) ছিল ১৪ হাজার ৫৮০টি। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেয়েছিলেন ১৪ হাজার ৮৯০ জন বাংলাদেশি। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশিদের জন্য ইস্যু করা মোট ভিসার প্রায় ২৫ শতাংশই ছিল অভিবাসী ভিসা। এই বৃহৎ অংশটি এখন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি যারা শুধু ভ্রমণের জন্য ৪৪ হাজারের বেশি ভিসা পেয়েছিলেন, তাদেরও এখন বন্ডের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হবে।

আইনি লড়াই: ক্লিনিক বনাম স্টেট ডিপার্টমেন্ট

যুক্তরাষ্ট্রের এই ‘বৈষম্যমূলক’ নীতির বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে মার্কিন আদালতে আইনি চ্যালেঞ্জ শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বেশ কিছু নাগরিক অধিকার সংস্থা এবং মার্কিন নাগরিকরা নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটন ফেডারেল আদালতে একটি মামলা দায়ের করেছেন, যা ‘ক্লিনিক ভার্সেস স্টেট ডিপার্টমেন্ট’ নামে পরিচিত।

বাদীপক্ষের আইনজীবীদের প্রধান যুক্তি হলো, অভিবাসন ও জাতীয়তা আইন অনুযায়ী কাউকে কেবল তার নাগরিকত্ব বা জন্মভূমির ভিত্তিতে ভিসা দিতে অস্বীকার করা যায় না। আইন অনুযায়ী প্রতিটি আবেদনকারীকে তার নিজস্ব যোগ্যতা ও পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। কিন্তু সরকার ৭৫টি দেশের সবাইকে ঢালাও স্থগিতাদেশ দিয়ে আইনের মৌলিক নীতি লঙ্ঘন করেছে। এ ছাড়া এই স্থগিতাদেশটি কোনো রাষ্ট্রপতির ঘোষণা হিসেবে আসেনি, বরং এটি প্রশাসনিক নীতি হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে যা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া বা ফেডারেল রেজিস্টারে প্রকাশ করা হয়নি। আইনজীবীরা আরও দাবি করেছেন যে অতীতে কেউ সরকারি সহায়তা নিয়েছে বা ভবিষ্যতে নিতে পারে—শুধু এই আশঙ্কায় কাউকে অযোগ্য ঘোষণা করা মার্কিন সংবিধানের চেতনার পরিপন্থী।

অন্যদিকে সরকারি পক্ষের আইনজীবীরা ২০১৮ সালের ‘ট্রাম্প ভার্সেস হাওয়াই’ মামলার নজির টেনে বলছেন যে জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে রাষ্ট্রপতির যে কোনো দেশ থেকে আগন্তুকদের প্রবেশ সীমিত করার অবারিত ক্ষমতা রয়েছে। এই আইনি লড়াইয়ের ফলাফল বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের ভাগ্যের চাবিকাঠি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্বকাপ ২০২৬

একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র যখন তার সীমান্ত বন্ধ করার এবং ভিসা নীতি কঠোর করার পথে হাঁটছে, তখনই তারা ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ ও ২০২৮ সালের অলিম্পিকের মতো বৈশ্বিক আসর আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে যে বিশ্বকাপ উপলক্ষে তারা বিনিয়োগকারী ও ফুটবল ভক্তদের জন্য ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার চেষ্টা করবে। কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ বা নাইজেরিয়ার মতো দেশের ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ১৫ হাজার ডলারের বন্ড দিয়ে খেলা দেখতে যাওয়া একটি প্রহসন ছাড়া আর কিছু নয়। এই বৈপরীত্য বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সফট পাওয়ার’ বা সাংস্কৃতিক প্রভাবকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অনেকে মনে করছেন, অভিবাসী ভিসা স্থগিত করার মাধ্যমে কনস্যুলার কর্মকর্তাদের কাজের চাপ কমবে, ফলে শিক্ষার্থী (এফ-১) এবং পর্যটক ভিসার সাক্ষাৎকার দ্রুত পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু বন্ডের কড়াকড়ি সেই সুবিধার ওপর জল ঢেলে দিচ্ছে। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং মার্কিন দূতাবাসগুলোর আংশিক বন্ধ থাকাও ভিসা প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের বিলম্ব ঘটাচ্ছে।

ভবিষ্যৎ ভাবনা ও সম্ভাব্য বিকল্প পথ

যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির মুখে বাংলাদেশের অভিবাসন প্রত্যাশীরা এখন নতুন পথ খুঁজছেন। অনেকে মনে করছেন, শুধু আমেরিকার ওপর নির্ভর না করে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা ইউরোপের দেশগুলোতে অভিবাসনের চেষ্টা করা এখন বেশি বাস্তবসম্মত। যারা উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যেতে চান, তাদের ক্ষেত্রে বন্ডের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম স্ক্রিনিংয়ের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ট্রাম্প প্রশাসন শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং আমেরিকান মূল্যবোধের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। পেশাজীবীদের জন্য এইচ-১বি ভিসার ক্ষেত্রেও বিশাল ফি ও কঠোর স্ক্রিনিং আরোপ করা হয়েছে। অনেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এখন ভিসা জটিলতার কারণে তাদের কর্মীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে বা অন্য দেশে সরিয়ে নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের নতুন ভিসা নীতি বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তনের খবর নয়, এটি একটি জাতীয় ও সামাজিক সংকটের প্রতিচ্ছবি। একদিকে পাবলিক চার্জের অজুহাতে অভিবাসী ভিসা স্থগিত করা হয়েছে, অন্যদিকে আকাশচুম্বী বন্ডের মাধ্যমে ভ্রমণের অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। এই দ্বিমুখী চাপে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন দেশের সাধারণ মানুষ, অর্থনীতি এবং হাজারো পরিবার। তবে মার্কিন আদালতে শুরু হওয়া আইনি লড়াই এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে ওয়াশিংটন তাদের নীতিতে কোনো পরিবর্তন আনে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। যতক্ষণ এই অনিশ্চয়তা কাটছে না, ততক্ষণ বাংলাদেশি অভিবাসন প্রত্যাশীদের জন্য ‘আমেরিকান ড্রিম’ এক ধূসর মরিচিকা হয়েই থাকবে।


Leave Your Comments




জাতীয় এর আরও খবর