প্রকাশিত :  ১৮:২৮
২২ মার্চ ২০২৬

বেক্সিমকো গ্রুপ: পতনের মুখে এক কিংবদন্তি শিল্পগোষ্ঠী, ফার্মা শাখাই একমাত্র ভরসা

বেক্সিমকো গ্রুপ: পতনের মুখে এক কিংবদন্তি শিল্পগোষ্ঠী, ফার্মা শাখাই একমাত্র ভরসা

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বৈরী পরিস্থিতির মুখে পড়া বেক্সিমকো লিমিটেডের ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে আছে একটি জাপানি বিনিয়োগ প্রকল্প, হাইকোর্টের রায় ও জনতা ব্যাংকের নিলামের দোলাচলে।

পুঁজিবাজারে একসময়ের শক্তিশালী এই প্রতিষ্ঠানটির মূল ব্যবসা টেক্সটাইল ও গার্মেন্টস প্রায় স্থবির। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ের আর্থিক প্রতিবেদন বলছে, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় রাজস্ব ৭১ শতাংশের বেশি কমে মাত্র ৪১৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটি ৩৫৬ কোটি টাকার নিট লোকসানে পড়েছে। শেয়ারপ্রতি লোকসান দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৭৮ টাকা। উৎপাদন বন্ধের মূল কারণ ব্যাংকগুলোর এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) বন্ধ করে দেওয়া।

বেক্সিমকো শেয়ার দীর্ঘদিন ধরে ১১০ দশমিক ১০ টাকার ‘ফ্লোর প্রাইসে’ আটকে আছে। বিএসইসির এই পদক্ষেপ বিনিয়োগকারীদের জন্য লিকুইডিটি ট্র্যাপ সৃষ্টি করেছে—শেয়ার বিক্রি করতে চাইলেও ক্রেতা নেই। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কাছে বেক্সিমকোতে তাদের বিনিয়োগের তথ্যও চেয়েছে, যাতে পদ্ধতিগত ঝুঁকি মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়।

অন্যদিকে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসি (বিএক্সফার্মা) উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। গত জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে তাদের রাজস্ব ৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ বেড়ে ২৪ দশমিক ০১ বিলিয়ন টাকায় উন্নীত হয়েছে। নিট মুনাফা বেড়েছে ১৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ। গ্রুপের অন্যান্য কোম্পানির ধসের মধ্যেও ফার্মা শাখা তাদের ঋণ পরিশোধ করছে নিয়মিত। কোম্পানিটি ‘ট্রাইকো’ নামের সিস্টিক ফাইব্রোসিসের জেনেরিক ওষুধ বাজারে আনছে। বিশ্বের ৫০টি দেশে রপ্তানি ও ইউএস এফডিএ’র সনদপ্রাপ্ত কারখানা থাকায় রাজনৈতিক প্রভাব এড়িয়ে ব্যবসা চালাতে পারছে তারা।

তবে ফার্মা কোম্পানিটিও আইনি জটিলতা এড়াতে পারছে না। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে বিএসইসি তাদের পর্ষদে ৯ জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ দেয়। উদ্দেশ্য ছিল কোম্পানির তহবিল যেন গ্রুপের লোকসানি প্রতিষ্ঠানে না যায়। বেক্সিমকো ফার্মা ওই নিয়োগ চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে রিট করে। হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ দিলেও আপিল বিভাগ তা বহাল রাখেনি। আদালতের বেঞ্চ পুনর্গঠনের কারণে এপ্রিলের শেষ নাগাদ শুনানি শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। এই জটিলতায় গত কয়েক প্রান্তিকের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি কোম্পানি। লন্ডনের এআইএম বাজারে তাদের জিডিআর লেনদেনও ২ জানুয়ারি ২০২৬ থেকে স্থগিত হয়ে গেছে।

গ্রুপের সামগ্রিক ঋণ এখন দেশের ব্যাংকিং খাতের জন্য বড় ঝুঁকি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, গ্রুপের ১৮৮টি প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। জনতা ব্যাংকের একক এক্সপোজারই প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা। জনতা ব্যাংক ইতিমধ্যে বেক্সিমকো লিমিটেডের ১ হাজার ৩২২ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ে বড় নিলাম ডেকেছে। গাজীপুর, আশুলিয়া ও নারায়ণগঞ্জের সাড়ে তিন হাজার ডেসিমেল জমি, ধানমন্ডির বেল টাওয়ার, আরবান ফ্যাশনস ও অ্যাপোলো অ্যাপারেলসের মতো সহযোগী প্রতিষ্ঠানের ১ হাজার ৭৫৪ কোটি টাকার সম্পদ উঠেছে নিলামে। ব্যাংক এখন শুধু ঋণ পুনর্গঠনে নয়, বরং সম্পদ বিক্রির পথে হাঁটছে।

এ অবস্থায় জাপানি বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রস্তাবিত ‘রিভাইভাল’ প্রকল্পটিকে বেক্সিমকো লিমিটেডের জন্য শেষ সম্ভাবনা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। জাপানের রিভাইভাল প্রজেক্ট লিমিটেড ও যুক্তরাষ্ট্রের ইকোমিলি যৌথভাবে বেক্সিমকো টেক্সটাইলে প্রাথমিক ২০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ১৫টি বন্ধ কারখানা চালু করে ২৫ হাজার কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা। আর কারখানার দায়িত্ব পাবেন জাপানি ব্যবস্থাপকরা। উৎপাদিত পণ্য যাবে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে। এতে অর্জিত নিট মুনাফার পুরোটাই যাবে জনতা ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে। মালিক পক্ষ ততদিন কোনো লভ্যাংশ পাবে না। ২০২৭ সালের মধ্যে এই প্রকল্প থেকে বার্ষিক ৫০০ কোটি টাকা মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সফল হলে শেয়ারের মৌলভিত্তি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা আছে।

আবাসন খাতে বেক্সিমকোর স্বপ্ন ‘মায়ানগর’ এখন স্থবির। শ্রীপুর টাউনশিপের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ১৮ হাজার অ্যাপার্টমেন্টের প্রকল্পে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার জিরো কুপন বন্ড ইস্যু করা হলেও মাত্র ৫৪১ কোটি টাকা সংগ্রহ হয়েছে। সংগৃহীত অর্থের ৫০০ কোটি টাকা পুরোনো ব্যাংক ঋণ পরিশোধে চলে যায়। এখন প্রকল্পের কাজ মাত্র ১০ শতাংশ শেষ।

বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক (বিএক্সজিসুকুক) বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের প্রথম শরিয়াহভিত্তিক বড় করপোরেট বন্ড। সুকুকধারীরা প্রতি বছর ২০ শতাংশ সুকুক শেয়ারে রূপান্তর করতে পারেন। ইতিমধ্যে রূপান্তরের ফলে কোম্পানির পরিশোধিত মূলধন ৯৪৩ দশমিক ২৩ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে শেয়ার ফ্লোর প্রাইসে আটকে থাকায় এই রূপান্তর বিনিয়োগকারীদের জন্য লাভজনক হচ্ছে না। আর ডিসেম্বর ২০২৬ সালে সুকুকের মূল টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মেয়াদ আরও ৫ বছর বাড়ানোর প্রস্তাব আসতে পারে।

২০২৬ সালের বাজারে কিছু আশার আলো দেখা যাচ্ছে। ব্র্যাক ইপিএল ও ইবিএল সিকিউরিটিজের বিশ্লেষণ বলছে, মুদ্রাস্ফীতি কমে আসায় সুদের হার কমতে শুরু করবে, যা পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়াবে। বেক্সিমকো ফার্মা ইতিমধ্যে ২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসে ২৯ শতাংশ মুনাফা দিতে সক্ষম হয়েছে। তবে মূল কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেডের বিষয়ে বিনিয়োগকারীরা এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।

যারা ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের জন্য ভবিষ্যৎ তিন পথে হাঁটতে পারে। প্রথম, রিভাইভাল প্রকল্প সফল হলে শেয়ারের দর ফ্লোর প্রাইসের ওপরে ওঠার সম্ভাবনা আছে। দ্বিতীয়, হাইকোর্টের রায়ে পর্ষদ পুনর্গঠন হলে বেক্সিমকো ফার্মার ক্যাশ ফ্লো মূল কোম্পানিকে ঋণ পরিশোধে সাহায্য করতে পারে। তৃতীয়, জনতা ব্যাংকের নিলামে মূল কারখানা ও জমি বিক্রি হয়ে গেলে কোম্পানির অপারেশনাল অস্তিত্ব বিলীন হতে পারে। সেক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীরা লিকুইডেশনের পর অবশিষ্ট সম্পদের সামান্য অংশ পাবেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বেক্সিমকো ফার্মার শেয়ার ধরে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে। কিন্তু মূল কোম্পানির ক্ষেত্রে ধৈর্য ও সতর্কতার পাশাপাশি কোম্পানির পেন্ডিং আর্থিক প্রতিবেদন ও শেয়ারপ্রতি নেট অপারেটিং ক্যাশ ফ্লোর (এনওসিএফপিএস) দিকে নজর রাখা জরুরি। বেক্সিমকো গ্রুপের ভবিষ্যৎ এখন ঝুলে আছে রিভাইভাল প্রকল্প, আদালতের রায় ও ব্যাংকের নিলাম প্রক্রিয়ার সম্মিলিত ফলাফলের ওপর।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর