প্রকাশিত :  ১৮:৩৬
২০ মার্চ ২০২৬

পুঁজিবাজারের অবমূল্যায়িত শেয়ারে লুকিয়ে আছে লাভের সম্ভাবনা

সম্পাদকীয় কলাম

পুঁজিবাজারের অবমূল্যায়িত শেয়ারে লুকিয়ে আছে লাভের সম্ভাবনা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

ঢাকা: ২০২৬ সালটি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য যেন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা সংশোধনের পরিশ্রান্ত বাজারটি এবার যেন নতুন করে শ্বাস নিতে শিখছে। ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলোর ইতিবাচক ধারা ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ফিরিয়ে এনেছে প্রাণচাঞ্চল্য।

এই পুনরুদ্ধারের সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সেই সব শেয়ার, যাদের বাজার মূল্য বর্তমানে ফেস ভ্যালু বা ১০ টাকার নিচে অবস্থান করছে। সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা—কম দামি শেয়ার মানেই দুর্বল বা ‘জাঙ্ক’। কিন্তু বাজারের গভীর বিশ্লেষণ বলছে ভিন্ন কথা। এমন অনেক কোম্পানি আছে যাদের উৎপাদন কার্যক্রম পূর্ণোদ্যমে সচল, অতীতে শতভাগের বেশি লভ্যাংশ দেওয়ার শক্তিশালী ইতিহাস রয়েছে, অথচ বর্তমানে তাদের অন্তর্নিহিত সম্পদের তুলনায় বাজার দর অত্যন্ত নগণ্য।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা: বাজারের মূল চালিকা শক্তি

পুঁজিবাজারের গতি-প্রকৃতি সব সময় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক অবস্থার প্রতিফলন ঘটায়। ২০২৬ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি ‘সুইট স্পট’-এ প্রবেশ করেছে বলে মনে করছেন অনেক আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বিশ্লেষক। মুদ্রাস্ফীতি, যা এক সময় ১২ শতাংশের রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছিল, বর্তমানে একক অঙ্কের ঘরে নেমে এসেছে। এই পতন কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার কমানোর সুযোগ করে দিয়েছে। সুদের হার কমলে সাধারণ মানুষ ব্যাংক আমানতের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজারকে বেছে নেয়, যা বাজারে নতুন তারল্য সরবরাহ করে।

একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) সম্মিলিতভাবে বাজার সংস্কারের কাজ শুরু করেছে। ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ নীতি সহজ করা এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট নিরসনে গৃহীত পদক্ষেপগুলো পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারে প্রাণের সঞ্চার করেছে।

ডিএসইর ব্রড ইনডেক্স ডিএসইএক্স ৫৩৫০ থেকে ৫৬০০ পয়েন্টের মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে। এ বছর দৈনিক টার্নওভার ১৩০০ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ইঙ্গিত বহন করে। বিদেশি বিনিয়োগও ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে—যা আন্তর্জাতিক আস্থার প্রতিফলন।

এই সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট কম দামি শেয়ারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যখন বাজারে বড় মৌলভিত্তি সম্পন্ন শেয়ারের দাম বাড়ে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা উচ্চমূল্যে শেয়ার কিনতে ভয় পান এবং বিকল্প হিসেবে ভালো মৌলভিত্তি থাকা কম দামি শেয়ারের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এই মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থিক প্রবাহই কম দামি শেয়ারের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়ার পেছনে প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করে।

১০ টাকার নিচের শেয়ার: ‘ভ্যালু ইনভেস্টিং’-এর নতুন দিগন্ত

বিনিয়োগের বিশ্ববিখ্যাত কৌশল ‘ভ্যালু ইনভেস্টিং’-এর মূল কথা হলো এমন শেয়ার খুঁজে বের করা যার বাজার মূল্য তার প্রকৃত মূল্যের চেয়ে কম। বাংলাদেশের বাজারে বর্তমানে ১০ টাকার নিচে থাকা অনেক শেয়ারের নেট অ্যাসেট ভ্যালু (এনএভি) ১৫ থেকে ২০ টাকার বেশি, কিন্তু গত কয়েক বছরের প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে বাজার দর নেমেছে ৫ থেকে ৮ টাকায়। এই বিশাল ব্যবধানই বিনিয়োগের মূল সুযোগ।

ব্যাংকিং খাতের রূপান্তর ও পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা

ব্যাংকিং খাত বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত খাতগুলোর একটি। অনেক প্রথম প্রজন্মের ব্যাংক বর্তমানে ১০ টাকার নিচে লেনদেন হচ্ছে। এর পেছনে মূল কারণ ছিল উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং প্রভিশন ঘাটতি। তবে ২০২৬ সালের শুরু থেকে এই খাতের চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি এবং ব্যাংকগুলোর পর্ষদ পুনর্গঠনের ফলে ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে স্বচ্ছতা ফিরছে।

ন্যাশনাল ব্যাংকের উদাহরণ এ প্রসঙ্গে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক। ব্যাংকটির পর্ষদ পুনর্গঠন এবং নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর এটি পুনরুদ্ধারের পথে। যদিও বর্তমানে শেয়ারটি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে এবং আর্থিক অবস্থা কিছুটা দুর্বল, কিন্তু ব্যাংকটির বিশাল স্থাবর সম্পদ এবং নেটওয়ার্ক বিবেচনায় ৫-৬ টাকার বর্তমান বাজার মূল্য অত্যন্ত নগণ্য। বাজারের ঐতিহাসিক তথ্য বলে, যখনই কোনো ব্যাংক সংকট কাটিয়ে পুনরায় মুনাফায় ফিরেছে, তার শেয়ারের দাম দ্রুত ফেস ভ্যালুর ওপরে চলে গেছে।

একই চিত্র দেখা যায় এবি ব্যাংকে। শেয়ার দর ৬.৬০ টাকা অথচ এনএভি ৭.১৯ টাকা। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের শেয়ার দর ৫.৯০ টাকা, যার এনএভি ১৬.৬৩ টাকা। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের শেয়ার দর মাত্র ১.৯০ টাকা, অথচ এনএভি ২০.৬৬ টাকা। ইউনিয়ন ব্যাংকের শেয়ার দর ১.৫০ টাকা, যার এনএভি ৫.৩৮ টাকা। এই ব্যাংকগুলোর পি/ই রেশিও বর্তমানে নেতিবাচক অথবা অত্যন্ত নিচু পর্যায়ে। যখনই এরা খেলাপি ঋণ আদায় বাড়িয়ে মুনাফায় ফিরবে এবং ডিভিডেন্ড দিতে শুরু করবে, তখন শেয়ারগুলোর চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। বিশেষ করে একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার ফলে দুর্বল ব্যাংকগুলোর সম্পদ শক্তিশালী ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের মনে এক ধরনের প্রিমিয়াম সেন্টিমেন্ট তৈরি করছে।

টেক্সটাইল ও উৎপাদনমুখী শিল্পের নতুন সম্ভাবনা

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস টেক্সটাইল খাত গত কয়েক বছর গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে ভুগেছে। তবে ২০২৬ সালে ফার্নেস অয়েলের দাম কমানো এবং সরকারি জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তনের ফলে উৎপাদন খরচ কমতে শুরু করেছে। এই খাতের অনেক কোম্পানির শেয়ার বর্তমানে ফেস ভ্যালুর অর্ধেকের নিচে লেনদেন হচ্ছে।

জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন এবং অ্যাক্টিভ ফাইন কেমিক্যালসের মতো কোম্পানিগুলো বর্তমানে বিনিয়োগকারীদের রাডারে। জেনারেশন নেক্সটের শেয়ার দর ৩.৫০ থেকে ৪.০০ টাকার মধ্যে ওঠানামা করছে। কোম্পানিটির অপারেশনাল স্ট্যাটাস নিয়ে কিছুটা বিতর্ক থাকলেও এর বিশাল অবকাঠামো এবং অতীতের ভালো ব্যবসার রেকর্ড বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে। অন্যদিকে অ্যাক্টিভ ফাইন কেমিক্যালস ওষুধ শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল উৎপাদন করে, যার চাহিদা বাজারে সব সময় বিদ্যমান। শেয়ার দর ৬.৬০ থেকে ৭.৮০ টাকার মধ্যে থাকলেও এর এনএভি ২২ টাকার উপরে। এই ধরনের ব্যবধান যখনই বাজার শনাক্ত করে, তখনই শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে।

কেন শেয়ারগুলোর দাম দুই থেকে তিন গুণ বাড়বে: যৌক্তিক বিশ্লেষণ

কোনো শেয়ারের দাম বাড়বে কি না, তা শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে না, বরং কিছু শক্তিশালী অর্থনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়ামকের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। ১০ টাকার নিচের শেয়ারগুলোর ক্ষেত্রে এই নিয়ামকগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

বাজার মনস্তত্ত্ব ও পেনি স্টক ইভেন্ট: সাধারণ বিনিয়োগকারীরা ৫০০ টাকার একটি শেয়ার ১০ শতাংশ বেড়ে ৫৫০ টাকা হওয়াকে যতটা কঠিন মনে করেন, ৫ টাকার শেয়ার ১০ টাকা হওয়াকে তার চেয়ে অনেক সহজ মনে করেন। উভয় ক্ষেত্রেই মুনাফার হার ১০০ শতাংশ, কিন্তু কম দামি শেয়ারের ক্ষেত্রে ‘ইউনিট সংখ্যা’ বেশি হওয়ায় বিনিয়োগকারীরা দ্রুত আকৃষ্ট হন। বাজার যখন ঊর্ধ্বমুখী থাকে, তখন এই ধরনের শেয়ারে ব্যাপক তারল্য প্রবাহ ঘটে, যা দামকে দ্রুত ২-৩ গুণ বাড়িয়ে দেয়।

ক্যাটাগরি পরিবর্তন ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার কড়াকড়ি: বিএসইসি বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর ক্যাটাগরি বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অনেক কোম্পানি যারা ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ হয়ে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নেমে গিয়েছিল, তারা এখন ক্যাটাগরি উন্নতির জন্য অন্তত ১০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দিতে বাধ্য হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি ‘জেড’ ক্যাটাগরি থেকে ‘বি’ বা ‘এ’ ক্যাটাগরিতে উন্নীত হলে তার শেয়ারের বিপরীতে মার্জিন ঋণ সুবিধা পুনরায় চালু হয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা সেই শেয়ার কেনা শুরু করে। এই ক্যাটাগরি পরিবর্তনের সংবাদই শেয়ার দরের জন্য বড় অনুঘটক।

স্পন্সর ও ডিরেক্টরদের শেয়ার ক্রয়: সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে, অনেক অবমূল্যায়িত কোম্পানির স্পন্সর ও ডিরেক্টররা বাজার থেকে নিজেদের শেয়ার কিনছেন। কোম্পানির ভেতরের মানুষ যখন শেয়ার কেনেন, তখন এটি শক্তিশালী সংকেত যে কোম্পানির ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল এবং বর্তমান বাজার মূল্য অত্যন্ত কম। এনসিসি ব্যাংক বা ব্যাংক এশিয়ার স্পন্সরদের শেয়ার ক্রয়ের ঘোষণা বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

সম্পদ পুনর্মূল্যায়ন ও বন্ড ইস্যু: অনেক ব্যাংক ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বর্তমানে তাদের মূলধন কাঠামো শক্তিশালী করার জন্য সাবঅর্ডিনেটেড বন্ড বা পারপেচুয়াল বন্ড ইস্যু করছে। এটি প্রতিষ্ঠানের তারল্য সংকট দূর করে এবং ব্যবসায়িক সম্প্রসারণে সাহায্য করে। যখনই কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি মজবুত হয়, তার প্রভাব সরাসরি শেয়ার দরের ওপর পড়ে।

ঐতিহাসিক লভ্যাংশের গুরুত্ব ও স্থিতিশীলতার মাপকাঠি

বিনিয়োগকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—কোন কোম্পানি ভালো আর কোনটি মন্দ? এর উত্তর লুকিয়ে আছে লভ্যাংশ প্রদানের ইতিহাসে। যেসব কোম্পানি বর্তমানে ১০ টাকার নিচে লেনদেন হচ্ছে কিন্তু অতীতে টানা কয়েক বছর ১০ শতাংশের ওপরে ক্যাশ বা স্টক ডিভিডেন্ড দিয়েছে, তারা মূলত সাময়িক খারাপ সময় পার করছে। এই কোম্পানিগুলোর ব্যবসায়িক মডেল ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত।

একটি সহজ হিসাব: শেয়ার দর ৫ টাকা। কোম্পানি যদি ১০ শতাংশ ডিভিডেন্ড দেয় (ফেস ভ্যালু ১০ টাকার ভিত্তিতে ১ টাকা), তবে বিনিয়োগের ওপর লভ্যাংশ ইয়েল্ড দাঁড়ায় ২০ শতাংশ। বর্তমানে ব্যাংকের ফিক্সড ডিপোজিটে যেখানে ৮-৯ শতাংশ সুদ পাওয়া যায়, সেখানে ২০ শতাংশের ডিভিডেন্ড ইয়েল্ড পাওয়া একটি অসাধারণ সুযোগ। এই উচ্চ ডিভিডেন্ড প্রাপ্তির সম্ভাবনা শেয়ারের চাহিদা বাড়িয়ে দেয় এবং চাহিদা বাড়লে শেয়ার দর ফেস ভ্যালুর ওপরে চলে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

১ম জনতা মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার দর বর্তমানে ২.৮০ থেকে ২.৯০ টাকা, যেখানে অতীতে এটি ৭ থেকে ১৩ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দিয়েছে। এবি ব্যাংক ১ম মিউচুয়াল ফান্ডের শেয়ার দর ২.৯০ থেকে ৩.০০ টাকা—পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা স্পষ্ট।

ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সতর্কতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি

একজন দক্ষ বিনিয়োগকারীকে সব সময় মুদ্রার অপর পিঠটিও দেখতে হয়। ১০ টাকার নিচের শেয়ারে যেমন বিপুল লাভের সম্ভাবনা আছে, তেমনি ঝুঁকির মাত্রাও কম নয়। সততার সঙ্গে বলতে হবে, সব কম দামি শেয়ারই আপনার সম্পদ বাড়াবে না। কিছু কোম্পানি দীর্ঘস্থায়ী লোকসানে রয়েছে, যাদের ফ্যাক্টরি বন্ধ বা ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ আছে।

বিনিয়োগের আগে অপারেশনাল স্ট্যাটাস যাচাই করা জরুরি। কোম্পানির অফিস বা ইন্ডাস্ট্রি কি আসলেই সচল? কাগজে-কলমে সচল থাকলেও বাস্তবে উৎপাদন বন্ধ থাকে অনেক সময়। কেয়া কসমেটিকস বা জেনারেশন নেক্সটের মতো প্রতিষ্ঠান নিয়ে এমন খবর মাঝেমধ্যে প্রকাশিত হয়। তবে যারা প্রতিকূলতা কাটিয়ে কার্যক্রম চালু রেখেছে, তারাই মূলত ঘুরে দাঁড়াবে।

ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণের বোঝা খতিয়ে দেখতে হবে। অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ কত এবং প্রভিশন ঘাটতি আছে কি না—তা জানা জরুরি। প্রভিশন ঘাটতি বেশি হলে কোম্পানি মুনাফা করলেও ডিভিডেন্ড দিতে পারবে না।

কারসাজি বা ম্যানিপুলেশনও বড় ঝুঁকি। পুঁজিবাজারে কম দামি শেয়ারগুলো কারসাজিকারীদের প্রধান লক্ষ্য থাকে। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই যদি শেয়ারের দাম প্রতিদিন ৫-১০ শতাংশ বাড়তে থাকে, তবে সেখানে বিনিয়োগের আগে দশবার ভাবা উচিত। কারণ কারসাজিকারীরা শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে উচ্চমূল্যে শেয়ার বিক্রি করে বাজার থেকে সরে পড়ে।

বিনিয়োগকারীদের মূল কৌশল হওয়া উচিত ‘ডাইভারসিফিকেশন’ বা বৈচিত্র্যকরণ। সব টাকা একক কোনো কম দামি শেয়ারে বিনিয়োগ না করে একটি পোর্টফোলিও তৈরি করা উচিত, যেখানে ব্যাংকিং, টেক্সটাইল, ফার্মা এবং মিউচুয়াল ফান্ডের মিশ্রণ থাকবে।

বাজারের রূপান্তর ও বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্তি

২০২৬ সাল বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের জন্য একটি ‘ব্রেকথ্রু’ বছর হতে চলেছে। দীর্ঘ মন্দা কাটিয়ে বাজার যখন আবার ৫৬০০ পয়েন্টের বাধা অতিক্রমের চেষ্টা করছে, তখন অবমূল্যায়িত শেয়ারে পজিশন নেওয়া বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। ১০ টাকার নিচে থাকা শেয়ারগুলোর মধ্যে যারা ঐতিহাসিকভাবে ভালো ডিভিডেন্ড দিয়েছে এবং যাদের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা রয়েছে, তারা আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই ফেস ভ্যালু বা তার ওপরে লেনদেন হবে—এমনটিই মনে করছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।

পুঁজিবাজারে একটি কথা প্রচলিত আছে, ‘সবাই যখন বিক্রি করে তখন আপনি কিনুন, আর সবাই যখন কেনে তখন আপনি বিক্রি করুন।’ বর্তমানে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কম দামি শেয়ার নিয়ে এক ধরনের অনীহা ও ভয় থাকলেও, বুদ্ধিমান বিনিয়োগকারীরা এই ‘ভস্মে ঢাকা মানিক’ সংগ্রহ করছেন। ২০২৬ সালের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সুদের হারের নিম্নগতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার ইতিবাচক সংস্কার এই শেয়ারগুলোর দাম দুই থেকে তিন গুণ করার পেছনে প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে।

সঠিক বিশ্লেষণ এবং ধৈর্যের মাধ্যমে এই শেয়ারগুলোতে বিনিয়োগ করলে আগামী দিনে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা লাভবান হতে পারবেন, যা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের গভীরতা ও স্থিতিশীলতাকেও দীর্ঘমেয়াদে সহায়তা করবে।

সম্পাদকীয় দ্রষ্টব্য: পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ ঝুঁকি সাপেক্ষে। বিনিয়োগের আগে কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদন, ত্রৈমাসিক আর্থিক বিবরণী এবং বাজার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয়। এই কলামটি বিনিয়োগের প্রত্যক্ষ সুপারিশ নয়, বরং তথ্যের ভিত্তিতে একটি বিশ্লেষণধর্মী চিত্র উপস্থাপন মাত্র।


Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর