প্রকাশিত :  ২০:১৭
১৮ মার্চ ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ২০:৪৪
১৮ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে ওএসডি সংস্কৃতি: মেধা ও অর্থের অপচয় এবং সংস্কারের অনিবার্যতা

সম্পাদকীয় কলাম

বাংলাদেশের জনপ্রশাসনে ওএসডি সংস্কৃতি: মেধা ও অর্থের অপচয় এবং সংস্কারের অনিবার্যতা

✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ 

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সবচেয়ে শক্তিশালী ও সংবেদনশীল স্তম্ভ হলো জনপ্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই দুই স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করেই একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, শাসনব্যবস্থা এবং জনসেবা পরিচালিত হয়। তবে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে 'ওএসডি' (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) বা 'বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা' শব্দটি একটি আতঙ্কের নাম হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পদায়ন নয়, বরং এটি মেধা নির্বাসন এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের এক বিশাল অপচয়ের অলিখিত দলিলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামলে প্রশাসনে ওএসডির যে রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছিল, তা কেবল প্রশাসনিক স্থবিরতাই তৈরি করেনি, বরং রাষ্ট্রের বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগকে অনিশ্চয়তার মুখেও ঠেলে দিয়েছিল। একজন দক্ষ কর্মকর্তা তৈরি করতে রাষ্ট্রের যে পরিমাণ অর্থ, সময় ও শ্রম ব্যয় হয়, তাকে কোনো সুনির্দিষ্ট কাজ ছাড়া বসিয়ে রেখে বেতন-ভাতা প্রদান করা কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, বরং এটি এক জাতীয় অপরাধের সামিল।

ওএসডি প্রথার ঐতিহাসিক বিবর্তন ও বর্তমান বাস্তবতা

ওএসডি প্রথাটি মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের উত্তরাধিকার। তৎকালীন ভারতীয় সিভিল সার্ভিসে (আইসিএস) বিশেষ কোনো জরুরি কাজ বা স্বল্পকালীন প্রকল্পের জন্য কোনো কর্মকর্তাকে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যে এই পদটি তৈরি করা হয়েছিল। পাকিস্তান আমলেও এর চর্চা ছিল সীমিত এবং মূলত প্রশাসনিক প্রয়োজনেই তা ব্যবহৃত হতো। তবে স্বাধীন বাংলাদেশে, বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকে গণতন্ত্রের প্রত্যাবর্তনের পর থেকে এই প্রথাটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার একটি প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। যখনই সরকার পরিবর্তন হয়েছে, তখনই পূর্ববর্তী সরকারের আস্থাভাজন বলে পরিচিত কর্মকর্তাদের ওএসডি করার এক সংস্কৃতি দানা বেঁধে উঠেছে। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রে এই সংস্কৃতির নেতিবাচক দিকগুলো চিহ্নিত করে একটি কার্যকর ও মেধাভিত্তিক প্রশাসন গড়ার প্রত্যয় ঘোষণা করেছে।

ওএসডির আক্ষরিক অর্থ বনাম প্রশাসনিক বাস্তবতা

তাত্ত্বিকভাবে ওএসডি পদটি কোনো শাস্তি নয়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের বিধি অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ, অসুস্থতা, ছুটি অথবা পদোন্নতি-পরবর্তী নতুন পদায়নের অপেক্ষায় থাকার সময় কর্মকর্তাদের ওএসডি রাখা যেতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে ওএসডি মানেই 'অকেজো' করে রাখা। একজন ওএসডি কর্মকর্তার কোনো নির্দিষ্ট দপ্তর থাকে না, বসার চেয়ার থাকে না এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, তার কোনো সুনির্দিষ্ট কাজও থাকে না। তাকে প্রতিদিন সচিবালয়ে এসে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে হাজিরা দিতে হয় এবং অধিকাংশ সময় লাইব্রেরিতে বসে সংবাদপত্র পড়ে অলস সময় কাটাতে হয়। মেধার এই অপচয়ের কোনো যৌক্তিক ব্যাখ্যা আধুনিক কোনো প্রশাসনিক তত্ত্বে পাওয়া দুষ্কর।

রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অপচয়: একজন বিসিএস কর্মকর্তার মূল্য

একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা কেবল একটি পদের নাম নয়, তিনি রাষ্ট্রের এক বিশাল সম্পদ। একজন শিক্ষার্থীকে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ক্যাডার হিসেবে নির্বাচিত করা থেকে শুরু করে তাকে দক্ষ প্রশাসক বা পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে গড়ে তুলতে রাষ্ট্রকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় এবং বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়।

একজন ক্যাডার কর্মকর্তা তৈরি করতে প্রথমেই তাকে বিপিএটিসিতে ছয় মাসের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ নিতে হয়, যেখানে আবাসন, খাদ্য, বিশেষজ্ঞ প্রশিক্ষক ও ভাতা বাবদ রাষ্ট্রকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। পুলিশ ক্যাডারের ক্ষেত্রে সারদা পুলিশ একাডেমিতে এক বছর মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যেখানে ড্রিল ও অস্ত্র প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত থাকে। এরপর রয়েছে সাভারে ল্যান্ড সার্ভে, সেনানিবাসে মিলিটারি ওরিয়েন্টেশন এবং সিলেটের জালালাবাদে হেলিকপ্টার প্রশিক্ষণ। অনেক কর্মকর্তাকে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই একাডেমি, ব্ল্যাক ওয়াটারের মতো প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়, যা রাষ্ট্রের জন্য বিপুল ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য সরকার বর্তমানে ১ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি অত্যাধুনিক একাডেমি তৈরি করছে। এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের মূল উদ্দেশ্য হলো এমন একদল দক্ষ কর্মকর্তা তৈরি করা, যারা আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনায় সক্ষম হবেন। কিন্তু যখন এই কর্মকর্তাদের ওএসডি করা হয়, তখন এই ১ হাজার ৮৩৩ কোটি টাকার বিনিয়োগ সরাসরি ক্ষতির তালিকায় যুক্ত হয়।

২০২৪ সালের শেষার্ধের তথ্য অনুযায়ী, প্রশাসনে ওএসডি কর্মকর্তার সংখ্যা ৫৫০ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এদের মধ্যে সিনিয়র সচিব থেকে শুরু করে সহকারী সচিব পর্যন্ত সব স্তরের কর্মকর্তা রয়েছেন। সচিবালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ওএসডি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে সরকারের সরাসরি খরচ হয় অন্তত ৫ কোটি ১৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে মূল বেতন ও উৎসব ভাতা বাবদ মাসিক ব্যয় প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা বাবদ প্রায় দেড় কোটি টাকা এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের গাড়ি ও জ্বালানি সুবিধা বাবদ প্রায় ২৭ লাখ টাকা। বাৎসরিক হিসেবে এই ব্যয় দাঁড়ায় ৬২ কোটি টাকারও বেশি।

এই ৬২ কোটি টাকা কেবল সরাসরি বেতন-ভাতা। এর বাইরে তাদের অফিস স্পেস, যদিও অনেকের বসার জায়গা নেই, অন্যান্য দাপ্তরিক আনুষঙ্গিক ব্যয় এবং সবচেয়ে বড় যে ক্ষতি—তাদের কাছ থেকে রাষ্ট্র যে সেবা পেতে পারত, তার আর্থিক মূল্য হিসাব করলে ক্ষতির পরিমাণ কয়েকশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ওএসডি সংস্কৃতির নগ্ন রূপ

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট একটি মাইলফলক। ছাত্র-জনতার এক রক্তক্ষয়ী অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের একটি শাসনের অবসান ঘটে। এই পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে প্রশাসনে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয় এবং রেকর্ড ৫১৭ থেকে ৫৫০ জন কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে একক সময়ে সর্বোচ্চ।

পূর্ববর্তী সরকারের আমলে আমলাতন্ত্রের এক বিশাল অংশকে 'রাজনৈতিক ক্যাডার' হিসেবে ব্যবহার করার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে আলোচিত। এই কর্মকর্তাদের অনেককেই তখন ওএসডি করা হয়েছিল অথবা বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমলারা যখন রাষ্ট্রের পরিবর্তে কোনো বিশেষ দলের স্বার্থ রক্ষায় লিপ্ত হন, তখন তারা আর 'প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী' থাকেন না, বরং 'দলের কর্মচারী' হয়ে যান। তবে এর বিপরীতে একটি বড় সত্য হলো, এই কর্মকর্তাদের সবাই আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেননি। অনেকেই কেবল চাকরির বিধিবিধান মেনে সরকারের আদেশ পালন করেছেন। চাকরির ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে গিয়ে তারা পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলেন। এই 'পরিস্থিতির শিকার' কর্মকর্তাদের সঙ্গে 'সুবিধাবাদী রাজনৈতিক' কর্মকর্তাদের পার্থক্য করা অত্যন্ত জরুরি।

ওই সময় অনেক দক্ষ ও মেধাবী কর্মকর্তাকে কেবল পূর্ববর্তী সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকার কারণে ওএসডি করা হয়েছিল, যা এক ধরনের 'গণশাস্তি' হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। অনেক কর্মকর্তা দাবি করেছিলেন যে, তারা কোনো বিশেষ দলের অনুগত ছিলেন না, বরং তারা রাষ্ট্রের চাকরি করেছেন এবং পেশাদারিত্ব বজায় রেখেছেন। কেবল অনুমানের ভিত্তিতে বা আন্দোলনের মুখে কর্মকর্তাদের ওএসডি করা প্রশাসনে চরম অস্থিরতা ও ভীতি তৈরি করেছিল।

ওএসডি প্রথার মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব

একজন সরকারি কর্মকর্তার কাছে ওএসডি হওয়া মানে কেবল কাজ হারানো নয়, বরং এটি এক সামাজিক কলঙ্ক। যখন একজন কর্মকর্তা ওএসডি হন, তখন তার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও সমাজের কাছে তিনি একজন 'অপরাধী' হিসেবে গণ্য হন।

একজন মেধাবী শিক্ষার্থী বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখেন দেশের সেবা করার জন্য। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে তিনি যে দক্ষতা অর্জন করেন, তা যখন একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে অকেজো করে দেওয়া হয়, তখন তার সৃজনশীলতা ও মানসিক শক্তি ভেঙে পড়ে। ওএসডি থাকা অবস্থায় অনেক কর্মকর্তা বিষণ্ণতায় ভোগেন। তাদের এই মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্যই ক্ষতিকর, কারণ পরবর্তীতে তাদের কাজে ফেরানো হলেও তারা আর আগের মতো উদ্দীপনা নিয়ে কাজ করতে পারেন না।

প্রশাসনে যখন বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তাকে ওএসডি রাখা হয়, তখন কর্মরত কর্মকর্তাদের ওপর কাজের চাপ বেড়ে যায়। অন্যদিকে, যারা ওএসডি নন, তারাও এক ধরনের অজানা আতঙ্কে থাকেন—কার ওপর কখন ওএসডির খড়্গ নেমে আসে। এই ভীতি কর্মকর্তাদের স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং তারা কেবল 'নিরাপদ' থাকতে চান, যা সুশাসনের পথে বড় বাধা।

পুলিশ ক্যাডার: একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর বিপর্যয়

পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তাদের ওএসডি করার বিষয়টি আরও বেশি স্পর্শকাতর। কারণ পুলিশ একটি আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, যেখানে নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন পুলিশ সুপার বা ডিআইজি পর্যায়ের কর্মকর্তা তৈরি করতে রাষ্ট্রকে অন্তত ২০ বছর সময় দিতে হয়। তারা রাজশাহীর সারদায় এক বছর মেয়াদি মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষ করার পর সাভারে ল্যান্ড সার্ভে, সেনানিবাসে মিলিটারি ওরিয়েন্টেশন এবং সিলেটের জালালাবাদে হেলিকপ্টার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। অনেককে যুক্তরাষ্ট্রের এফবিআই একাডেমিতেও পাঠানো হয়। এই বিশেষায়িত দক্ষতাসম্পন্ন কর্মকর্তাদের বসিয়ে রেখে রাষ্ট্র কেবল তাদের মেধারই অপমান করে না, বরং জাতীয় নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে।

পুলিশের যেসব কর্মকর্তা সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘন বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তাদের সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত। কিন্তু তা না করে গণহারে ওএসডি করে রাখায় আসল অপরাধীরা অনেক সময় আড়ালে চলে যায়, আর নির্দোষ কর্মকর্তারা বিনা অপরাধে শাস্তি ভোগ করেন। এটি কেবল অন্যায় নয়, বরং আইন-শৃঙ্খলার স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

প্রশাসনের রাজত্ব বনাম জনসেবা

আওয়ামী লীগ আমলে যারা 'রাজত্ব' করেছিলেন, তাদের অনেকেই তখনো বহাল তবিয়তে ছিলেন, আবার নতুন করে কেউ কেউ রাজত্ব শুরু করেছিলেন। এটি বাংলাদেশের আমলাতন্ত্রের এক চিরন্তন সত্য।

বাংলাদেশের প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পায়। বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদনে অনেক সময় কর্মকর্তার কাজের গুণমানের চেয়ে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বেশি প্রাধান্য পায়। এই তোষামোদের সংস্কৃতির কারণেই আমলারা রাজনৈতিক দলের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত থাকেন। সরকার পরিবর্তন হলেও এই মানসিকতার পরিবর্তন হয় না, কেবল 'প্রভু' পরিবর্তন হয়।

একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আমলাতন্ত্র হবে নিরপেক্ষ ও আইনানুগ। কিন্তু বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রকে শাসক দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার যে নজির সৃষ্টি হয়েছে, তা ভাঙা অত্যন্ত কঠিন। বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে জনসাধারণের প্রত্যাশা—যারা প্রকৃত অপরাধী তাদের শাস্তি দেওয়া হোক, কিন্তু যারা কেবল পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন, তাদের সুযোগ দেওয়া হোক। এটিই রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক হবে।

জনপ্রশাসন সংস্কারের সুপারিশ ও আমাদের করণীয়

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনপ্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর জন্য একটি উচ্চপর্যায়ের সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল। আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিশন ওএসডি প্রথা বন্ধ এবং বাধ্যতামূলক অবসরের কালো আইন বাতিলের সুপারিশ করেছিল।

সংস্কারের মূল দিকগুলো ছিল সুনির্দিষ্ট ওএসডি নীতিমালা প্রণয়ন, যেখানে পদোন্নতি বা প্রশিক্ষণ ছাড়া অন্য কোনো কারণে ১৫ দিনের বেশি কাউকে ওএসডি রাখা যাবে না। মেধা ও দক্ষতার মূল্যায়নের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে পরীক্ষা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে পদোন্নতি নিশ্চিত করতে হবে। যাদের তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা সম্ভব নয়, তাদের সরকারি কলেজ বা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া ২৫ বছর চাকরি পূর্ণ হলেই কোনো কারণ দর্শানো ছাড়া অবসরে পাঠানোর বিধানটি বাতিল করতে হবে, কারণ এটি অনেক সময় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়।

সংস্কার কমিশনের সুপারিশ কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, যদি না শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের দায়িত্ব—প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত করা। সব তথ্য যাচাই-বাছাই করে কেবল অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া এবং দক্ষ কর্মকর্তাদের কাজে ফেরানো হলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ক্ষতি যেমন কমবে, তেমনি জনসেবাও গতিশীল হবে।

একটি নতুন প্রশাসনিক সংস্কৃতির স্বপ্ন

বাংলাদেশের বর্তমান সংকটের সমাধান কেবল ওএসডি কমানোর মধ্যে নেই, বরং এটি একটি গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের দাবি রাখে। আমাদের এমন একটি প্রশাসন দরকার, যা কোনো বিশেষ দল বা ব্যক্তির নয়, বরং জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবে।

যাদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে, তাদের জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা যেতে পারে। এই কমিটি প্রতিটি কর্মকর্তার অতীত কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করবে। যারা সক্রিয়ভাবে দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বা মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন, তাদের চাকরিচ্যুত করে বিচারের আওতায় আনা উচিত। কিন্তু যারা কেবল দাপ্তরিক কাজ করেছেন, তাদের মেধা ও অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের উন্নয়নে কাজে লাগানো উচিত।

জনগণ যখন জানতে পারবে যে তাদের করের কোটি কোটি টাকা কর্মকর্তাদের বসিয়ে বেতন দিতে ব্যয় হচ্ছে, তখন তারা এর প্রতিবাদ করবে। নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে এই মেধা ও অর্থের অপচয়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনের অভ্যন্তরে স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।

রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক পথ

রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটি জনগণের। আর এই রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে আমলারা যখন কাজ করেন, তখন তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে ওএসডি নামক যে 'ডাম্পিং' ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল, তা কেবল রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডই দুর্বল করেনি, বরং একটি মেধাবী প্রজন্মকে হতাশার সাগরে নিমজ্জিত করেছিল।

একজন অফিসার বানাতে গিয়ে যে অর্থ ব্যয় হয়, তা জনগণের পকেট থেকে আসে। তাই সেই অফিসারকে অকেজো রাখা মানে জনগণের অর্থের অপচয় করা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ঊর্ধ্বে উঠে যদি আমরা একটি নিরপেক্ষ ও কর্মঠ প্রশাসন গড়তে পারি, তবেই ৫ আগস্টের বিপ্লব সার্থক হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার ইতিমধ্যে পরিস্থিতির শিকার কর্মকর্তাদের বিবেচনায় নিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও কর্মসংস্থানের নতুন দিগন্ত উন্মোচনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কেবল ওএসডি করে রাখা কোনো সমাধান নয়; সমাধান লুকিয়ে আছে কর্মসংস্থান ও স্বচ্ছতার মধ্যে। একটি দক্ষ ও নিরপেক্ষ আমলাতন্ত্রই হতে পারে আগামীর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি।

বাংলাদেশের জনপ্রশাসন যেন কেবল রাজত্বের হাতিয়ার না হয়ে সেবার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়, এটাই আজকের দিনে সবচেয়ে বড় দাবি। ওএসডি প্রথার এই কলঙ্কজনক অধ্যায় চিরতরে বন্ধ হোক এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি মেধা জনকল্যাণে নিয়োজিত হোক—এটাই হোক আমাদের প্রত্যাশা।


Leave Your Comments




সম্পাদকীয় এর আরও খবর