প্রকাশিত :  ০৮:২৯
১৭ মার্চ ২০২৬

বিশ্ববাজারে কমলেও দেশে বাড়ছে ভোজ্যতেলের দাম

সরবরাহ সংকটের কথা বললেও চট্টগ্রাম বন্দরে খালাস হচ্ছে সাত জাহাজ ভোজ্যতেল

বিশ্ববাজারে কমলেও দেশে বাড়ছে ভোজ্যতেলের দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলেও দেশে উল্টো বাড়ছে ভোজ্যতেলের মূল্য। সরবরাহ সংকটের অজুহাতে খাতুনগঞ্জে  সকালে এক দামে বিক্রি হলেও বিকেলে তা বেড়ে যাচ্ছে। রমজানের মধ্যেই এই পাইকারি মোকামে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম লিটারে ১৩ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

অথচ যুদ্ধ শুরুর আগেই গত আট মাসে দেশে প্রায় ১৫ লাখ টন ভোজ্যতেল আমদানি হয়েছে। এমনকি গত সপ্তাহেও দেশে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন এবং পাম অয়েলের মজুত ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৯ টন।

চট্টগ্রাম বন্দরে ভোজ্যতেল নিয়ে জাহাজ আসছে একের পর এক। বন্দরে ভোজ্যতেল বোঝাই জাহাজ আছে এখন সাতটি। এসব জাহাজে আছে ৩ লাখ ১৪ হাজার টন পণ্য। এগুলোর খালাস কার্যক্রমও শেষ হবে শিগগির। তারপরও ঈদের আগে ভোক্তাদের ভোগান্তি বাড়িয়ে যাচ্ছে ভোজ্যতেল।

চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ পরিদর্শন শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির রোববার বলেন, পাইকারি ও খুচরা বাজারে অনেক ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্য দামের ব্যবধান দেখা যায়। এই ব্যবধানের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, প্রশাসনের সদস্য এবং প্রয়োজন হলে অন্য পেশাজীবীদের নিয়ে একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করা হবে। কমিটি বিষয়টি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে। 

গত সপ্তাহেও মজুত ছিল ২ লাখ ৩৬ হাজার ৯ টন 

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে ভোজ্যতেল ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন সাতটি পরিশোধন কারখানার মালিকরা। তাদের কাছে গত সপ্তাহেও দেশে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন ও পাম অয়েলের মজুত ছিল দুই লাখ ৩৬ হাজার ৯ টন। সাতটির মধ্যে চার কারখানার ঋণপত্র (এলসি) খোলা হয়েছে ৫৫ হাজার ৫০০ টন এবং চার কারখানার ভোজ্যতেল পাইপলাইনে রয়েছে এক লাখ ১০ হাজার টন। কারখানাগুলো প্রতিদিন ৯ হাজার ১০০ টন করে ভোজ্যতেল বাজারে ছাড়ছে। গত ২১ দিনে (১৫ মার্চ পর্যন্ত) তারা সরবরাহ করেছে মোট ৮৫ হাজার টন। 

দামও কমছে আন্তর্জাতিক বাজারে

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন (বিটিটিসি) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছে, এক মাস আগের তুলনায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের ফ্রেইট অন বোর্ড (এফওবি) অর্থাৎ রপ্তানিকারক দেশের বন্দরে জাহাজে তুলে দেওয়া পর্যন্ত মূল্য ৬ শতাংশ কমেছে। গত সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত সয়াবিন তেলের দাম ছিল প্রতি টন এক হাজার ৮৩ মার্কিন ডলার। এটি আগের সপ্তাহে ছিল এক হাজার ১১৪ ডলার। 

বন্দরে খালাস হচ্ছে সাত জাহাজ ভোজ্যতেল 

সরবরাহ সংকটের কথা বলে দাম বাড়লেও চট্টগ্রাম বন্দরে ভোজ্যতেল নিয়ে আসছে একের পর এক জাহাজ। এখন বন্দরে থাকা সাতটি জাহাজে পণ্য আছে তিন লাখ ১৪ হাজার টন। এর মধ্যে এন্ড্রু ভিক্টরি জাহাজে ৪৩ হাজার ৬৩৭ টন, উইকো হল্লি জাহাজে ৪২ হাজার ৮২৮, ওসান ডায়মন্ড জাহাজে ৫৩ হাজার ১৬৬, ডেজার্ট ভারচুতে ৫৮ হাজার ৮৮৩, টমিনি টিনাসিটিতে ৪৮ হাজার ৭৫০, সারকি জাহাজে ৩৬ হাজার ৬৮৪ টন সয়াবিন ও স্টেনা কনকোয়েন্ট জাহাজে আছে ৩০ হাজার ১৩১ টন অপরিশোধিত সয়াবিন তেল।

তবুও দাম বাড়ছে খাতুনগঞ্জে

খাতুনগঞ্জের পাইকারি বাজারে গত এক সপ্তাহে সয়াবিন ও পাম অয়েলের দাম মণপ্রতি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা বেড়েছে। যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) সয়াবিন তেল ৬ হাজার ৭০০ টাকায় এবং পাম অয়েল ৫ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়। গত সপ্তাহে এই দর ছিল যথাক্রমে ৭ হাজার ১০০ টাকা ও পাম অয়েল ৬ হাজার ৬০ টাকা। চলতি সপ্তাহে এটি আরও বেড়ে হয়েছে ৭ হাজার ৩০০ টাকা ও ৬ হাজার ২১০ টাকা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর দুদিন দাম একটু কমলেও এখন তা আবার বাড়ছে। মিল মালিকরা সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ায় দাম নিয়ে অস্থিরতা বিরাজ করছে বলে মনে করছেন পাইকারি মোকামের ব্যবসায়ীরা।

এদিকে, খুচরা পর্যায়ে এর প্রভাব আরও ব্যাপক হারে পড়ছে। চট্টগ্রাম নগরে গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে খোলা সয়াবিন তেলের দাম কেজিতে প্রায় ৯ টাকা বেড়ে ২০২ থেকে ২০৪ টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর খোলা পাম অয়েলের দাম কেজিতে ৭ টাকা বেড়ে ১৭৩ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

খাতুনগঞ্জ ট্রেড অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুস সালাম বলেন, মিলগেট থেকে চাহিদামতো তেল পেলে ভোজ্যতেলের বাজার স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এই বাজার এখন কিছু মানুষের হাতে সীমাবদ্ধ।  

পরস্পরকে দোষারোপ করছেন ব্যবসায়ীরা

নগরীর চৌমুহনী মার্কেটের ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান বলেন, পাইকারি মোকামে চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না তারা। পেলেও কিনতে হচ্ছে তা বেশি দামে। ভোজ্যতেলের অন্যতম আমদানিকারক টি কে গ্রুপের পরিচালক (ফাইন্যান্স অ্যান্ড অপারেশন) শফিউল আতাহার তসলিম বলেছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক আছে। জ্বালানি সংকটে পরিবহন ভাড়া ৩০ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার পরও মিলগেট থেকে পণ্য পাঠাচ্ছেন তারা চাহিদামতো। 

ব্যবসায়ীদের এমন পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ভোক্তার পকেট কাটার কৌশল বলে মনে করে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।  এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ভোজ্যতেলের দাম বাড়াতেই সরবরাহ প্রক্রিয়াতে সংকট তৈরি করা হয়েছে। সরকারের ওপর চাপ তৈরি করে দামটা আবার বাড়াতে চাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা


Leave Your Comments




শিল্প বাণিজ্য এর আরও খবর