প্রকাশিত : ২৩:৩২
১৩ মার্চ ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
মধ্যপ্রাচ্য আবারও উত্তপ্ত। ইরান ও ইসরাইলের সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাত শুধু দুটি দেশের সীমাবদ্ধ দ্বন্দ্ব নয়; এটি ধীরে ধীরে এমন এক ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্ব রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর। এই সংঘাতের ঘটনাপ্রবাহে একদিকে যেমন সামরিক শক্তির প্রদর্শন রয়েছে, অন্যদিকে তেমনই পরাশক্তিগুলোর কৌশলগত হিসাব-নিকাশও যুক্ত হয়েছে। ফলে প্রশ্নটি এখন আর শুধু আঞ্চলিক নয়—এটি বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
দীর্ঘদিন ধরেই ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। তবে সাম্প্রতিক হামলা-পাল্টা হামলার ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ছায়াযুদ্ধের সেই দীর্ঘ অধ্যায় এখন অনেকটাই প্রকাশ্য সংঘাতে রূপ নিতে চলেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং প্রক্সি রাজনীতির প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থান ক্রমেই মুখোমুখি অবস্থানে চলে এসেছে।
ইসরাইল বহু বছর ধরেই অভিযোগ করে আসছে যে, ইরান মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে তাদের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। অন্যদিকে ইরানের বক্তব্য, ইসরাইলের নীতিই অঞ্চলের অস্থিরতার প্রধান কারণ। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসের পরিবেশেই সামরিক উত্তেজনা ধীরে ধীরে চরমে পৌঁছেছে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরাইলের প্রধান কৌশলগত মিত্র। ফলে ইরান-ইসরাইল সংঘাতের প্রতিটি পর্যায়ে ওয়াশিংটনের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও চীনের মতো পরাশক্তিগুলোর অবস্থানও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আলোচনার বিষয়। ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটায় মস্কো মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কৌশলগত ভারসাম্য তৈরি করতে চাইছে বলে অনেক বিশ্লেষকের ধারণা। অন্যদিকে চীন সরাসরি সংঘাতে জড়াতে না চাইলেও জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
এই সংঘাতের আরেকটি বড় মাত্রা হলো এর অর্থনৈতিক প্রভাব। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্ব জ্বালানি বাজারের অন্যতম কেন্দ্র। এখানকার সামান্য অস্থিরতাও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা সেই আশঙ্কাকেই বাস্তবে পরিণত করেছে।
জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা শুধু শিল্পোন্নত দেশগুলোকেই নয়, বরং উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও বড় ধরনের চাপের মুখে ফেলে। বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের মতো দেশের জন্যও এই বাস্তবতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনও জ্বালানি আমদানির ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে গেলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন খরচ, কৃষি উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের ওপর। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকেও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত। ওই অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা তৈরি হলে শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে, যা দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহকেও ব্যহত করতে পারে।
তবে এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো—এই সংঘাত কত দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে? অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যদি এতে আরও দেশ সরাসরি জড়িয়ে পড়ে, তবে তা বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে পারে। আবার অন্য অনেক বিশ্লেষকের মতে, বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় বড় শক্তিগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়। ফলে সংঘাত সীমিত পরিসরেই আটকে থাকার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবুও ঝুঁকিটি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আধুনিক যুদ্ধের ধরন এখন অনেকটাই বদলে গেছে। সরাসরি সামরিক সংঘাতের পাশাপাশি সাইবার হামলা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং প্রক্সি যুদ্ধ এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। ফলে সংঘাতের প্রভাব অনেক সময় সীমানা পেরিয়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
এই বাস্তবতায় কূটনীতির গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উত্তেজনা প্রশমিত করা এবং সংঘাতকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বড় যুদ্ধ প্রায়ই শুরু হয় ভুল বোঝাবুঝি, প্রতিশোধের রাজনীতি এবং কূটনৈতিক ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিও সেই ঝুঁকির বাইরে নয়। তাই এখন প্রয়োজন সংযম, সংলাপ এবং কূটনৈতিক উদ্যোগ।
বিশ্ব যখন নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক সংঘাত—তখন আরেকটি বড় যুদ্ধ মানবসভ্যতার জন্য এক নতুন বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে বিশ্বনেতাদের এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সংঘাতের পথ থেকে সরে এসে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসা। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত শক্তির নয়, প্রজ্ঞা ও সংযমের সিদ্ধান্তকেই টিকিয়ে রাখে।