প্রকাশিত : ১৮:২০
১১ মার্চ ২০২৬
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা. ১২ মার্চ ২০২৬: মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে দেশটি থেকে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ‘বিশেষ অনুমতি’ বা অস্থায়ী ছাড় (ওয়েভার) চেয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের জন্য সম্প্রতি ঘোষিত ৩০ দিনের মার্কিন ছাড়ের আদলে বাংলাদেশও একই ধরনের সুযোগ পেতে আগ্রহী বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
বুধবার (১১ মার্চ ২০২৬) সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলানগরে পরিকল্পনা মন্ত্রীর কার্যালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিসটেনসেনের সঙ্গে এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, “রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ভারতকে অস্থায়ী ছাড় দিয়েছে। বাংলাদেশও একই ধরনের সুযোগ পেতে আগ্রহী। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছি এবং তারা আমাদের প্রস্তাবটি নিয়েছে।”
আমীর খসরু আরও জানান, মার্কিন রাষ্ট্রদূত এই অনুরোধটি ওয়াশিংটনের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। রাশিয়ার তেল কিনতে পারলে তা দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতিকে রক্ষায় বড় সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছে সরকার।
বাংলাদেশ যে বিশেষ অনুমতির কথা বলছে, তার ভিত্তি হচ্ছে সম্প্রতি ভারতের জন্য ঘোষিত মার্কিন ছাড়। গত ৫ মার্চ মার্কিন প্রশাসন এক ঘোষণায় জানায়, সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারতের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছে। এই ছাড়ের মেয়াদ ৩০ দিন, যা ৪ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্টের মতে, তেলের বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ সচল রাখতেই এই ‘স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগ’ নেওয়া হয়েছে। মূলত ইরান ও ইসরায়েলের যুদ্ধের ফলে লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরে জ্বালানি পরিবহনে যে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, তা মোকাবিলা করতেই এই সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ এখন সেই একই যুক্তিতে নিজেদের জন্যও সুযোগ খুঁজছে।
ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যকার চলমান সংঘাতের ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক রুট ‘হরমুজ প্রণালি’ বর্তমানে কার্যত স্থবির বা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। বাংলাদেশ এই সংকটে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, কারণ দেশটির জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই আমদানিনির্ভর, যার বড় অংশই আসত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে।
ইতোমধ্যেই সৌদি আরামকো থেকে আসা ১ লাখ মেট্রিক টনের একটি তেলের চালান পারস্য উপসাগরে আটকা পড়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া কাতারি গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরে ডিজেল ও অক্টেনের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে রাশিয়ার সস্তা তেল আমদানির বিকল্প দেখছে না সরকার।
এদিকে দেশে জ্বালানি তেলের কোনো তাৎক্ষণিক ঘাটতি নেই বলে দাবি করেছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তবে যুদ্ধের অনিশ্চয়তার কারণে আগাম সতর্কতা হিসেবে সরকার দেশে ‘রেশনিং’ ব্যবস্থা চালু করেছে। বুধবার সকালে সচিবালয়ে তিনি জানান, ৯ মার্চ দুটি বড় তেলের জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছেছে এবং আগামী কয়েক মাসের ডিজেল আমদানির জন্য ভারত ও চীনের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।
জ্বালানি মন্ত্রী আরও বলেন, “যুদ্ধ কতদিন চলবে আমরা জানি না, তাই আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতা ও কৃচ্ছ্রসাধন বজায় রাখতে হবে।” জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেট্রোল পাম্পগুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার পাশাপাশি বিভাগীয় শহরগুলোতে অক্টেন ও পেট্রোলের সরবরাহ ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চে এসে দেশের মুদ্রাস্ফীতির হার ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ডলারের সংকটের কারণে আমদানি বিল পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিআইআই) সতর্ক করেছে যে, বিশ্ববাজারে তেলের দাম প্রতি ১০ ডলার বাড়লে বাংলাদেশের মাসিক আমদানি ব্যয় ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পায়।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার তেল আমদানির অনুমতি পাওয়া গেলে তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রক্ষায় এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত ঢাকাকে এই ছাড় দেবে কি না, তা এখন বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্ন হিসেবে দাঁড়িয়েছে।