নিজস্ব প্রতিবেদক | অর্থনীতি | তেহরান : মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে যে ছায়া যুদ্ধ বা 'শ্যাডো ওয়ার' চলছিল, ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে তা এক নজিরবিহীন সরাসরি যুদ্ধে রূপ নিয়েছে। এক সময় যা ছিল গোপন গুপ্তহত্যা আর প্রক্সি যোদ্ধাদের আড়ালে চলা সংঘাত, আজ তা তেহরান আর তেল আবিবের আকাশসীমায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই সরাসরি আক্রমণের ধারা ২০২৫ সালের 'বারো দিনের যুদ্ধ' এবং ২০২৬ সালের 'অপারেশন রোয়ারিং লায়ন' পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে, যা কেবল এই দুটি রাষ্ট্রকেই নয়, বরং পুরো বিশ্বের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ফলে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেইয়ের মৃত্যু এবং দেশটির পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্যকে আমূল বদলে দিয়েছে।
সরাসরি আক্রমণের সংখ্যা ও বিবর্তনের চিত্র
ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে সরাসরি আক্রমণের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সাল ছিল এই সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ। ২০২৪ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৪ মার্চ পর্যন্ত উভয় পক্ষ একে অপরের ওপর মোট চারবার করে বড় ধরনের সরাসরি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।
আক্রমণের এই কালপঞ্জি শুরু হয় ২০২৪ সালের এপ্রিলে। সিরিয়ার দামেস্কে ইরানি কনস্যুলেটে ইসরাইলি হামলার প্রতিবাদে ১৩ এপ্রিল ইরান প্রথমবারের মতো ইসরাইলি ভূখণ্ডে সরাসরি ৩০০-এর বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। এর জবাবে ১৯ এপ্রিল ইসরাইল ইরানের ইসফাহানে পাল্টা হামলা চালায়। এরপর ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর ইরান দ্বিতীয়বারের মতো সরাসরি বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এর পাল্টা জবাব হিসেবে ২৬ অক্টোবর ইসরাইল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন কারখানা ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করে আকাশপথে বড় অভিযান পরিচালনা করে।
সংঘাতের তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়ে যায় ২০২৫ সালের জুন মাসে। 'বারো দিনের যুদ্ধ' নামে পরিচিত এই দফায় ১৩ জুন ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনাগুলোতে প্রায় ৩৬০টি বিমান হামলা চালায়। ইরানও দমে না গিয়ে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলীয় শহরগুলোতে এবং কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়। সবশেষ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতটি শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। 'অপারেশন রোয়ারিং লায়ন' নামে এই অভিযানে ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সরকারি ভবন এবং সর্বোচ্চ নেতার বাসভবনে সরাসরি আঘাত হানে, যাতে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেই নিহত হন। ইরান এর জবাবে 'অপারেশন ট্রু প্রমিজ ৪' শুরু করেছে, যার আওতায় তারা এ পর্যন্ত ৫০০-এর বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং ২,০০০ ড্রোন নিক্ষেপ করেছে।
যুদ্ধের বিশ্লেষণ: কেন এই সংঘাত এবং ফলাফল কী?
এই যুদ্ধ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দীর্ঘদিনের 'রেড লাইন' বা সীমারেখাগুলো এখন পুরোপুরি মুছে গেছে। ইসরাইলের মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করা এবং দেশটির শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জুন মাসে নাতাঞ্জ ও ফোর্দোর পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন-ইসরাইল যৌথ হামলা ইরানের কয়েক দশকের অর্জনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
সামরিক কৌশলগত দিক থেকে ইসরাইল তার প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করেছে। অন্যদিকে, ইরান বিশাল ভূখণ্ড এবং বিপুল সংখ্যক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে 'ওভারহুইল্ম' বা অকেজো করে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তবে গোয়েন্দা তথ্যের দিক থেকে ইসরাইলের ব্যাপক অনুপ্রবেশ ইরানের কমান্ড ও কন্ট্রোল সিস্টেমকে দুর্বল করে দিয়েছে, যার চূড়ান্ত প্রমাণ শীর্ষ নেতৃত্বের সফল হত্যাকাণ্ড।
রাজনৈতিকভাবে, এই যুদ্ধ ইরানকে এক গভীর অস্তিত্ব সংকটে ফেলেছে। খামেনেইয়ের মৃত্যুর পর তেহরানে যে নেতৃত্বের শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা দেশটিকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন। অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ায় এটি কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং একটি বৈশ্বিক সংঘাতে রূপ নিয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি ও বাংলাদেশের ওপর প্রভাব
এই সংঘাতের বারুদের গন্ধ এখন বিশ্ব অর্থনীতিতেও অনুভূত হচ্ছে। ইরানের হরমুজ প্রণালী অবরোধ এবং জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার ফলে ২০২৬ সালের ৪ মার্চ নাগাদ তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৪ ডলারে পৌঁছেছে। কাতার এনার্জি তাদের গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রাখায় ইউরোপ ও এশিয়ায় গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এই যুদ্ধ এক বড় উদ্বেগের কারণ। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রায় ২২ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি এখন সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। আবুধাবি ও দুবাইয়ের বিমানবন্দরে হামলার কারণে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় হাজার হাজার শ্রমিক আটকা পড়েছেন। এছাড়া জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং রপ্তানি বাণিজ্যে স্থবিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের শাকসবজি ও কৃষিপণ্যের বড় বাজার মধ্যপ্রাচ্যে হওয়ায় রপ্তানিকারকরা ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন।
ইরান ও ইসরাইলের এই সংঘাত কেবল দুটি দেশের শক্তি প্রদর্শনের লড়াই নয়, এটি আধুনিক বিশ্বের অন্যতম বড় নিরাপত্তা বিপর্যয়। ২০২৬ সালের ৪ মার্চের এই তপ্ত দুপুর পর্যন্ত যুদ্ধের যে ভয়াবহতা দেখা যাচ্ছে, তাতে শান্তির কোনো আশু সম্ভাবনা নেই। কূটনীতির টেবিল যখন ব্যর্থ হয়, তখন তার মূল্য দিতে হয় সাধারণ মানুষকে—চাই সে তেহরানে হোক কিংবা তেল আবিবে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি সংকটের বিকল্প সমাধান খুঁজে বের করা।
Leave Your Comments