প্রকাশিত : ১৯:১৬
২৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
বাংলাদেশ ব্যাংকের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো। প্রথমবারের মতো কোনো পেশাদার ব্যবসায়ী, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত একজন উদ্যোক্তা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। মো. মোস্তাকুর রহমানের এই নিয়োগকে অনেকে নিছক একটি প্রশাসনিক রদবদল হিসেবে দেখলেও গভীরে গিয়ে এটি অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ কাঠামোতে নতুন চিন্তার সঞ্চার করতে পারে। বিশেষ করে পুঁজিবাজারের জন্য তাঁর আগমন এক আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এখন ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী মহলে তৈরি হচ্ছে।
মোস্তাকুর রহমান শুধু একজন সফল শিল্প উদ্যোক্তাই নন, তিনি আর্থিক খাতের নিয়মকানুন, করপোরেট গভর্নেন্স ও বিনিয়োগ কৌশল নিয়েও সমানভাবে পারদর্শী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞানে পড়াশোনা ও খরচ ও ব্যবস্থাপনা হিসাববিদ (সিএমএ) হিসেবে পেশাগত প্রশিক্ষণ তাঁকে ব্যাংকিং ও অর্থায়নের জটিল দিকগুলো বুঝতে সহায়তা করেছে। কিন্তু তাঁর অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি হলো পুঁজিবাজারের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা। এক সময় তিনি একটি ব্রোকারেজ হাউসের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের নিয়ন্ত্রক কমিটিতেও কাজ করেছেন। ফলে পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক কাঠামো, বিনিয়োগকারীদের মনস্তত্ত্ব ও ব্রোকারেজ হাউসের কার্যপ্রণালী—সবই তাঁর জানার মধ্যে পড়ে।
একজন নিয়ন্ত্রকের জন্য তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন খাতের বাস্তবচিত্র সম্পর্কে ধারণা থাকা অত্যন্ত জরুরি। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকিং খাতের ভূমিকা অপরিসীম। ব্যাংকগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনা, সুদ হারের নীতি ও বিনিয়োগ নির্দেশনা—সবকিছুই পুঁজিবাজারের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলে। তাই একজন গভর্নর যদি পুঁজিবাজারের ভেতরটা আগে থেকেই চেনেন, তাহলে তিনি নীতি প্রণয়নের সময় আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। এটি পুঁজিবাজারের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
অবশ্য নতুন এই নিয়োগ নিয়ে কিছু প্রশ্নও উঠেছে। ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের কঠিন সময়ে একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর করে আনা কতটা যুক্তিযুক্ত? অতীতে পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউস ও আবাসন ব্যবসায় যুক্ত থাকার কারণে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হবে কি না? প্রশ্নগুলো অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু নিয়োগের শর্তে তাঁকে অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে পেশাগত সম্পর্ক পরিত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্রমাণ করা যে তিনি কোনো নির্দিষ্ট স্বার্থ বা গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন না, বরং পুরো অর্থনীতির স্বার্থেই কাজ করবেন। পুঁজিবাজারের একজন শীর্ষ নির্বাহী যেমন মন্তব্য করেছেন, যিনি বাজারের ভেতরটা বোঝেন, তিনি যদি সৎ ও সাহসী হন, তাহলে নিয়ন্ত্রকের দৃষ্টিভঙ্গিই বদলে যেতে পারে।
বর্তমানে দেশের ব্যাংকিং খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রিজার্ভের স্থিতিশীলতা ও বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ব্যবস্থাপনা—এসব বিষয়ে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে হবে নতুন গভর্নরকে। তবে এর পাশাপাশি পুঁজিবাজারের উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা থাকতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা অপরিহার্য।
মোস্তাকুর রহমানের নিয়োগকে আমরা একটি নতুন দিগন্তের সূচনা হিসেবে দেখতে চাই। একজন অভিজ্ঞ শিল্প উদ্যোক্তা ও আর্থিক প্রশাসক হিসেবে তিনি যদি ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে মনোনিবেশ করেন, তাহলে পুঁজিবাজার ও সামগ্রিক অর্থনীতি উপকৃত হবে। বিনিয়োগকারী মহলের দৃষ্টি এখন তাঁর প্রথম পদক্ষেপের দিকে। আমরা আশাবাদী, তিনি সেই আস্থার প্রতিদান দিতে সক্ষম হবেন।