রেজুয়ান আহম্মেদ দুবাইয়ের সন্ধ্যা যেন নিজেই এক বিশাল আলোকসজ্জা। নিয়নের আলোয় ঝলমলে সড়ক, কাঁচের দেয়ালে আলোর প্রতিফলন, ব্যস্ততার ভেতরেও এক ধরনের হিসেবি নীরবতা। সেই শহরের বুকেই এক রেস্তোরাঁর টেবিলে হঠাৎ করেই আমাদের সামনে নেমে এল আরেক জগৎ—ধোঁয়ার, সুগন্ধের আর অদৃশ্য প্রলোভনের।
সোনালি এক বিশাল থালা। ভারে ও ভঙ্গিতে রাজকীয়। কাবুলের কোনো প্রাচীন দস্তরখান থেকে উঠে আসা যেন তার বংশপরিচয়। থালা থেকে ধোঁয়া উঠছে—নরম, ঘন, প্রায় আধ্যাত্মিক। মুহূর্তের জন্য মনে হলো, আমরা খাবার টেবিলে নই; কোনো সুফি দরবারে বসেছি, যেখানে স্বাদের মধ্য দিয়েই প্রার্থনা সম্পন্ন হয়।
আফগান আতিথেয়তার কথা বহুবার শোনা গেছে। অতিথি না খেয়ে ফিরবে—এ যেন তাদের কাছে অসম্ভব। তবে এখানে আতিথেয়তা উচ্চকণ্ঠ নয়, বরং সংযত। অতিরিক্ত মশলার চমক নেই; আছে শুধু লবণ আর গোলমরিচের মৃদু অথচ আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি। 'শিনওয়ারি' ঢঙে রান্না করা সেই মাংস প্রথম গ্রাসেই বুঝিয়ে দিল—স্বাদের আসল শক্তি সরলতার মধ্যেই লুকিয়ে। মনে হলো, পকেটের দিরহামগুলো কোনো অপচয় নয়; তারা যেন সম্মানের সঙ্গেই আত্মসমর্পণ করেছে।
আমার বন্ধু থালার দিকে এমন মনোযোগে তাকিয়ে ছিল, যেন সে ভাতের স্তূপে লুকানো কাবাবের অবস্থান নির্ণয় করছে। ধোঁয়ার আস্তর সরিয়ে যখন এক টুকরো খাসির মাংস (ল্যাম্ব শ্যাঙ্ক) হাতে উঠে এল, তখন তার চোখে যে তৃপ্তি দেখলাম, তা নিছক ক্ষুধা মেটানোর আনন্দ নয়—এক ধরনের অর্জনের দীপ্তি। সাদা ভাতের নিচে রসালো মাংস, তার মধ্যে জাফরানের গন্ধ আর কিশমিশের হালকা মিষ্টতা—সব মিলিয়ে এক নীরব সিম্ফনি।
পেছনে বসা এক ভদ্রলোক তখন ব্যস্ত হয়ে এক পেয়ালা কাহওয়ার ছবি তুলছিলেন। আমরা ধোঁয়ার ভেতর স্বাদ খুঁজছি, তিনি আলো-ছায়ার ভেতর সৌন্দর্য। ভাবলাম, জীবনও বুঝি এমনই—কেউ লড়াইয়ে আনন্দ পায়, কেউ ফ্রেমে। অথচ ভোজন শেষে সেই কাহওয়াই আমাদেরও শান্ত করল। উষ্ণ চুমুকে পেটের ভেতরের সব অস্থিরতা ধীরে ধীরে থিতিয়ে এল।
আফগান রান্নায় জাফরান ও কিশমিশের ব্যবহার নিছক উপাদান নয়—এ যেন স্বাদের কূটনীতি। নোনতা আর মিষ্টির সূক্ষ্ম সমঝোতা। কিশমিশের ছোট ছোট দানা ভাতের ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে মনে করিয়ে দেয়—প্রাচুর্যের মধ্যেও ভারসাম্য জরুরি। এই দ্রুতগামী, যান্ত্রিক দুবাইয়ে এমন এক থালার সামনে বসে থাকার অর্থই হলো নিজের ভেতরে কিছুটা থমকে দাঁড়ানো।
শেষে বিল এল। অঙ্কটি কম নয়। কিন্তু অদ্ভুতভাবে মনে হলো না যে আমরা কিছু হারালাম। বরং যা পেলাম, তা সংখ্যায় মাপা যায় না। এক সন্ধ্যার পূর্ণতা, এক স্বাদের স্মৃতি আর এক উপলব্ধি—জীবন কেবল হিসাবের খাতা নয়। জীবন হলো ধোঁয়ার আড়াল ভেদ করে নিজের তৃপ্তিকে চিনে নেওয়ার সাহস।
যারা কখনো এই ধোঁয়ার মেঘে পা রাখেননি, তারা হয়তো দুবাই দেখেছেন, কিন্তু তার এক টুকরো আত্মাকে মিস করেছেন। কারণ, কখনো কখনো একটি থালা কাবুলি পোলাও-ই যথেষ্ট—ভ্রমণকে অভিজ্ঞতায় আর অভিজ্ঞতাকে স্মৃতিতে রূপান্তরিত করতে।
Leave Your Comments