রেজুয়ান আহম্মেদ
ঢাকার আকাশ আজ বড় বেশি কৃত্রিম। বনানী সংলগ্ন সুউচ্চ অট্টালিকার চূড়ায় যখন নিয়ন আলো নীল ও রক্তিম আভায় দুলছিল, সুলতান সাহেব তখন তাঁর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত দপ্তরে বসে আইপ্যাডে শেয়ারবাজারের সূচক পর্যবেক্ষণ করছিলেন। জানালার কাচের ওপারে শহরটা যেন এক মায়াবী জাদুকরী—চাকচিক্যে ঢাকা তার যাবতীয় ক্ষত। সুলতান সাহেবের মনে পড়ল না, ঠিক তিনশ মাইল দূরে তাঁর শিকড় যে গ্রামে, সেখানকার খরাদীর্ণ ফসলহীন মাটি আজ এক ফোঁটা বৃষ্টির অপেক্ষায় নেই, আছে এক মুঠো আশ্রয়ের অপেক্ষায়।
পবিত্র রমজানের চাঁদ উদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সুলতান সাহেবের ব্যস্ততা বেড়েছে। যাকাত দিতে হবে—শাড়ি আর লুঙ্গির ভাঁজে ভাঁজে তাঁর আভিজাত্যের ছাপ রাখতে হবে। অথচ তিনি কি জানেন, গত চার দশকে এই বণ্টনের মর্যাদাহানিকর সংস্কৃতিতে পদদলিত হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন তিন শতাধিক মানুষ? এই যে বিত্তবানের দুয়ারে দরিদ্রের হাহাকার, এটি কি যাকাতের প্রকৃত লক্ষ্য ছিল?
গ্রামে এখন হামিদার কুটিরে অন্ধকার নেমেছে। কেরোসিন কেনার সামর্থ্য নেই, তাই সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকারই তার পরম সহচর। হামিদার শরীরটা আজ ভীষণ অবশ হয়ে আসছে। গত দুদিন ধরে উনুনে আগুন জ্বলে না। রমজানের চাঁদ উঠেছে গতকাল, অথচ হামিদার কাছে চাঁদ মানে স্নিগ্ধতা নয়, বরং এক দীর্ঘ প্রতীক্ষা—কবে কেউ এক মুঠো চাল নিয়ে আসবে।
সুলতান সাহেবের দপ্তরে যখন যাকাতের শাড়ি আর লুঙ্গির ক্যাটালগ দেখা হচ্ছিল, তখন হামিদা ভাবছিল তার কিশোরী মেয়ের কথা, যার বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হয়েছে স্রেফ এক জোড়া মার্জিত পোশাকের অভাবে। কোরআনের ভাষায় যাকাত তো কোনো দয়ার দান নয়, এটি ‘হক’—অলঙ্ঘনীয় অধিকার। “তাদের সম্পদে রয়েছে নির্ধারিত অধিকার—প্রার্থনাকারী ও বঞ্চিতের জন্য” (সুরা আল-মাআরিজ ৭০:২৪-২৫)। এই অধিকারবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠাই হতে পারে বাংলাদেশের আগামীর সামাজিক বিপ্লবের মূল ভিত্তি।
পরদিন সকালে সুলতান সাহেবের অফিসের সামনে এক দীর্ঘ সারি। শত শত নারী-পুরুষ রৌদ্রে দগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এক টুকরো কাপড়ের আশায়। সুলতান সাহেব কাঁচের জানালার ওপার থেকে এই দৃশ্য দেখে এক ধরনের আত্মতৃপ্তি পান। তিনি ভাবেন, তিনি কত বড় দাতা। অথচ তিনি কি জানেন, এই শাড়ি-লুঙ্গির সংস্কৃতি গত চার দশকে তিন শতাধিক মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে? মানুষ যখন অন্যের দুয়ারে হাত পাতে, তখন তার মানবিক মর্যাদার বিনাশ ঘটে।
রিফাত, সুলতান সাহেবেরই প্রতিষ্ঠানের এক তরুণ কর্মকর্তা, আজ সাহস করে তাঁর কক্ষে প্রবেশ করল। রিফাতের চোখে নজরুলের সেই বিদ্রোহী আভা। সে ধীর গলায় বলল, “স্যার, আপনি যা দিচ্ছেন তা তো ওদের অধিকার। কিন্তু যেভাবে দিচ্ছেন, তাতে ওদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। ইসলামে যাকাত বণ্টনের মূল লক্ষ্য দারিদ্র্য টিকিয়ে রাখা নয়, বরং দারিদ্র্য বিমোচন করা।” সুলতান সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। রিফাত বলতে থাকল, “স্যার, যদি আমরা এই অর্থ বিচ্ছিন্নভাবে না দিয়ে পরিকল্পিতভাবে পাঁচটি পরিবারকে স্বাবলম্বী করার জন্য বিনিয়োগ করতাম—যেমন একটি সেলাই মেশিন বা একটি ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজি—তবে আগামী বছর হয়তো তারা আর লাইনে দাঁড়াত না।”
বাতাসে ভ্যাপসা গরম আর ঘামের কটু গন্ধ। বনানীর সেই সুউচ্চ অট্টালিকার নিচতলার প্রশস্ত চত্বরে এখন এক রণক্ষেত্র। শাড়ি আর লুঙ্গির ভাঁজে যে আভিজাত্য সুলতান সাহেব বিলি করতে চেয়েছিলেন, তা এখন ধুলোয় বিলীন হচ্ছে। সারিবদ্ধ মানুষের ধৈর্য যখন ক্ষুধার উত্তাপে বাষ্পীভূত হয়ে যায়, তখনই শুরু হয় সেই মরণপণ লড়াই—যাকে সংবাদপত্রের ভাষায় আমরা বলি ‘যাকাত নিতে গিয়ে পদদলিত হয়ে মৃত্যু’। কিন্তু এই পদদলন কি কেবল শরীরের? নাকি এটি একটি জাতির মানবিক মর্যাদার ওপর শোষক শ্রেণির করাঘাত?
হামিদা সেই ভিড়ের ঠিক মাঝখানে ছিল। তার পরনের জীর্ণ শাড়ি আর মলিন জুতোগুলো যেন এই বৈভবের শহরে বড়ই বেমানান। যখন হুড়োহুড়ি শুরু হলো, তখন তার কানে বাজছিল সেই আর্তনাদ, যা শত শত মানুষের শেষ নিঃশ্বাস হয়ে ঝরেছে। মানুষ যখন একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ে, তখন ক্ষুধার্ত শরীরের হাড়জিরজিরে খাঁচাগুলো মটমট করে ভেঙে যায়। হামিদা দেখল, তার চোখের সামনে এক বৃদ্ধা ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল। কেউ তাকে তুলতে এল না, বরং সেই ঝকঝকে শাড়িটার জন্য আরও দশটি পা তাকে মাড়িয়ে চলে গেল। এটাই কি সেই ‘সালাত ও যাকাতের যুগলবন্দি’ যা আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বারবার উচ্চারণ করেছেন? যেখানে যাকাত হওয়ার কথা ছিল পবিত্রতা ও প্রবৃদ্ধির (Growth) প্রতীক, সেখানে তা আজ হয়ে দাঁড়িয়েছে বঞ্চনা আর লাঞ্ছনার এক নিষ্ঠুর মহড়া।
সুলতান সাহেব উপর থেকে সিসিটিভি ক্যামেরায় এই দৃশ্য দেখছিলেন। তাঁর হাতে তখন দামি কফির কাপ। রিফাতের কথাগুলো তাঁর মাথায় হুলের মতো বিঁধছে। তিনি তাঁর ল্যাপটপে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক আয়বৈষম্যের এক পরিসংখ্যান খুললেন। দেখলেন, দেশের ‘গিনি সহগ’ (Gini Index) ০.৪৯৯-এ পৌঁছে গেছে—যা সমাজবিজ্ঞানীদের মতে এক বিপজ্জনক সীমা। এর মানে হলো, দেশের মোট জাতীয় আয়ের প্রায় ৪২.৬৭ শতাংশ বর্তমানে জনসংখ্যার উপরের দিকের মাত্র ১০ শতাংশ মানুষের হাতে কুক্ষিগত, বিপরীতে নিচের দিকের ১০ শতাংশ মানুষের আয় মোট জাতীয় আয়ের মাত্র ১.৩১ শতাংশ।
এই যে বিশাল বৈষম্য, একে কি ‘চুঁইয়ে পড়া নীতি’ (Trickle-down theory) দিয়ে নিরসন করা সম্ভব? সুলতান সাহেব ভাবেন, তিনি তো যাকাত দিচ্ছেন, তবে সমাজ কেন বদলাচ্ছে না? আসলে তিনি যা দিচ্ছেন, তা হলো ‘আপেক্ষিক দারিদ্র্য’ দূর করার এক ভ্রান্ত প্রয়াস, যেখানে ‘নিরঙ্কুশ দারিদ্র্য’ হাড়কাঁপানো বাস্তবতায় ধুঁকছে। রিফাত ঠিকই বলেছিল, যাকাত কোনো মৌসুমি করুণা নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক অধিকার যা সম্পদকে একতরফা পুঞ্জীভূত হতে বাধা দেয়। সুলতান সাহেবের মনে পড়ল নজরুলের সেই তীক্ষ্ণ বাণী—যেখানে তিনি সেই সব ধর্মব্যবসায়ীদের বিদ্রূপ করেছিলেন যারা ত্যাগের বেলায় ‘সং’ সাজে কিন্তু যাকাত দিতে গেলে তাদের বুক কাঁপে।
পরদিন সকালে অফিসের পিনপতন নীরবতায় রিফাত সুলতান সাহেবকে একটি কবিতার বই উপহার দিল। বইটির নাম ‘দারিদ্র্য রেখা’। রিফাত বলল, “স্যার, আপনি কি জানেন কবি তারাপদ রায় কীভাবে আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন যে আমরা অভাবী মানুষকে নিয়ে কেবল সংজ্ঞার খেলা খেলি?”
সুলতান সাহেব পাতা উল্টালেন। কবি সেখানে বলছেন, দাতা এসে যখন তাকে ‘অভাবী’ (Needy) বলল, তখন তার দিন কাটছিল নিরন্তর অভাবের দীর্ঘশ্বাসে। যখন সে আরও দুর্বল হলো, দাতা তখন এসে বলল—না, তুমি অভাবী নও, তুমি ‘নিঃস্ব’ (Destitute)। এরপর যখন সে প্রায় কঙ্কালসার হয়ে রাস্তার ধারে শুয়ে থাকল, দাতা তখন তাকে সংজ্ঞায়িত করল ‘বঞ্চিত’ (Deprived) বলে। প্রতিটি নতুন সংজ্ঞা যেন তার যন্ত্রণার গায়ে একেকটি তকমা, কিন্তু পেটের ক্ষুধা মেটানোর অন্ন সেখানে অনুপস্থিত। শেষে দাতা যখন ব্ল্যাকবোর্ডে চক দিয়ে একটি উজ্জ্বল দীর্ঘ রেখা টেনে দিয়ে বলল—এই যে তোমার সীমানা, তুমি এর নিচে থাকো; তখন শোষিত মানুষের আর ওঠার শক্তি থাকে না। সুলতান সাহেব অনুভব করলেন, তিনি তাঁর ড্রইংরুমে যে ক্যালিগ্রাফি ঝুলিয়ে রেখেছেন, তা আসলে হামিদাদের জন্য এক ধরনের ‘ব্ল্যাকবোর্ড’, যেখানে তিনি নিজের স্বার্থে এক কাল্পনিক রেখা টেনে রেখেছেন।
দুপুরের রোদে রিফাত এবং সুলতান সাহেব বেরিয়ে পড়লেন শহরের এক বস্তি পরিদর্শনে। রিফাত সুলতান সাহেবকে শোনাল নজরুলের সেই অমিয় পঙক্তি—“তব মসজিদ মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবী / মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি”। সুলতান সাহেব দেখলেন, রিকশাচালকের ছোট্ট সন্তানটি ধুঁকছে বিনা চিকিৎসায়, অথচ পাশের মসজিদেই দানবাক্সে টাকার পাহাড়।
যাকাতের খাতগুলো তো স্পষ্ট ছিল—ফকির, মিসকিন, যাকাত আদায়কারী, যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন, দাস-মুক্তি, ঋণগ্রস্ত, আল্লাহর পথে এবং মুসাফির। কিন্তু আমাদের সমাজব্যবস্থায় যাকাত হয়ে গেছে কেবল পোশাক বিতরণের এক লোকদেখানো উৎসব। রিফাত বলল, “স্যার, যাকাত শব্দের অর্থই হলো পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। যদি আমরা এই অর্থ মসজিদভিত্তিক যাকাত কমিটির মাধ্যমে সঠিকভাবে বণ্টন করতাম, তবে আজ এই শিশুটিকে ধুঁকতে হতো না।” মসজিদকে যদি সমাজ বিনির্মাণের কার্যকরী ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তবেই ইমাম সাহেবরা এই মহৎ বিবর্তনের গর্বিত অংশীদার হতে পারবেন।
গল্পের দৃশ্যপট এবার বদলে গেল। কুশিয়ারা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে হামিদা দেখল, তার শেষ সম্বলটুকু মেঘনার করাল গ্রাসে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। নদীভাঙা এই সাত লাখ মানুষের দীর্ঘশ্বাস যেন আকাশের গায়ে এক অদৃশ্য মেঘ হয়ে জমে আছে। যে মানুষটির এক সময় বিশাল অট্টালিকা ছিল, সে আজ পথের ভিখারি। নদী যখন তার সম্পদটুকু নিমিষেই গিলে নেয়, তখন তার ভেতর যে বেদনা কাজ করে, তা দ্বিতীয় কেউ হয়তো সেভাবে বুঝবে না।
হামিদার কাছে যাকাত মানে তখন কেবল এক বছরের খোরাকি নয়, বরং এমন কিছু যা তাকে আবার মাটির সঙ্গে যুঝতে শেখাবে। অথচ আমাদের সমাজ এই ছিন্নমূল মানুষদের ‘ঠিকানাহীন’ বলে এড়িয়ে যায়। ইসলামের সোনালী যুগে যাকাত ব্যবস্থাপনাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে সারাদিন ঘুরেও যাকাত নেওয়ার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যেত না। আর আজ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির গল্প বলা হলেও নদীভাঙা মানুষগুলো একবেলা আধপেটা খেয়ে সন্তানের দায় ফেরি করে ফুটপাতে। এই বৈপরীত্যের অবসান ঘটানোই যাকাতের মূল সামাজিক দায়বদ্ধতা।
অফিসে ফিরে সুলতান সাহেব এবার মনোযোগ দিয়ে ‘সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্ট’ (CZM)-এর ১৫ বছরের যাত্রার ইতিহাস দেখতে শুরু করলেন। তিনি অবাক হয়ে দেখলেন, যাকাতকে যখন ‘জীবিকা’ (Jeebika) মডেলের মতো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়, তখন তা কীভাবে স্বনির্ভর দারিদ্র্য বিমোচন প্রোগ্রামে রূপান্তরিত হয়। মানিকগঞ্জের ‘চান্দির চর’ গ্রামের সেই পাইলট প্রকল্পের কথা পড়লেন তিনি, যেখানে মাত্র তিন বছরের মধ্যে ৩ শতাংশ যাকাতগ্রহীতা যাকাতদাতা হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
রিফাত বুঝিয়ে বলল, “স্যার, যাকাত কেবল নগদ সহায়তা নয়; এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা।” CZM যেভাবে কারিগরি প্রশিক্ষণ (নৈপুণ্য বিকাশ), প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (ফেরদৌসী) এবং শিক্ষাবৃত্তি (জিনিয়াস) প্রদান করছে, তা হলো যাকাতের প্রকৃত বাস্তবায়ন। সুলতান সাহেব হিসাব করে দেখলেন, যদি বাংলাদেশের সম্ভাব্য যাকাতের পরিমাণ জিডিপির ১.৬৩% হয়, তবে প্রতি বছর ২৮ হাজার ২৩১ কোটি টাকার বেশি অর্থ সংগ্রহ সম্ভব—যা দিয়ে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব।
রমজানের শেষ বিকেল। সুলতান সাহেবের হৃদয়ে আজ এক নতুন ভোরের সূর্য উদয় হয়েছে। তিনি তাঁর দপ্তরের সেই শাড়ি-লুঙ্গির ক্যাটালগগুলো সরিয়ে ফেললেন। পরিবর্তে তিনি রিফাতকে বললেন, “আমাদের কোম্পানির যাকাত তহবিল থেকে এবার আমরা পাঁচটি নদীভাঙা পরিবারকে পুনর্বাসন করব। তাদের হাতে তুলে দেব সেলাই মেশিন, রিকশা এবং গবাদি পশু—যা তাদের এক বছরের প্রয়োজন মিটিয়ে স্বচ্ছলতা ফিরিয়ে দেবে।”
সুলতান সাহেব আজ বুঝতে পেরেছেন, যাকাত কোনো দাতা-গ্রহীতার করুণার সম্পর্ক নয়; এটি এক অনন্য ভ্রাতৃত্বের বন্ধন। তিনি যখন যাকাতের চেকটি রিফাতের হাতে দিলেন, তখন তাঁর মনে হলো তাঁর সম্পদ আজ আক্ষরিক অর্থেই পবিত্র হলো। আকাশের সেই রূপালী চাঁদ যেন আজ হামিদাদের অন্ধকার ঘরেও এক ফালি আলোর রেখা নিয়ে এল। ‘যাকাতের নীরব কান্না’ আজ ‘বিজয়ের হাসিতে’ রূপান্তরিত হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ নিল। বাংলাদেশের প্রতিটি শহর আর গ্রাম আজ যেন সমস্বরে বলতে শুরু করল—যাকাত হোক মর্যাদার পুনর্জাগরণ, হোক ক্ষুধার বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত সামাজিক বিপ্লব।
সুলতান সাহেব আজ দপ্তরের নিভৃত কোণে বসে একটি ভিন্ন সত্যের মুখোমুখি হলেন। রিফাত তাকে মনে করিয়ে দিয়েছিল ‘নতুন দরিদ্র’ (New Poor) জনগোষ্ঠীর কথা, যারা অতিমারি-পরবর্তী সময়ে শহর ও মফস্বলের মানচিত্র থেকে প্রায় মুছে গিয়েছিল। প্রায় ২৯ লাখ মানুষ যারা আগে দরিদ্র ছিল না, তারা হঠাৎ করেই নিম্ন আয়ের বসতিগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। তাদের আত্মসম্মানবোধ এতটাই প্রখর যে তারা শাড়ি-লুঙ্গির লাইনে দাঁড়াতে পারে না, বরং ঘরের অন্ধকারেই ক্ষুধার নীরব দহনে জ্বলে মরে।
যাকাত কেবল সেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের জন্য নয়, এটি সেই সব মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষেরও অধিকার, যারা ঋণের জালে পিষ্ট হয়েও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। সুলতান সাহেব ভাবলেন, যাকাত যদি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ‘বাইতুল মাল’-এর আদলে গঠিত হতো, তবে এই নিভৃত কান্নাগুলো শোনার মতো একটি মাধ্যম থাকত। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যাকাতের ভূমিকা নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সেই প্রতিবেদনের কথা তাঁর মনে পড়ল, যেখানে বলা হয়েছে বাংলাদেশের যাকাত অর্থনীতির সম্ভাবনা বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। এই সম্ভাবনাকে অবহেলা করা মানে একটি জাতির উন্নতির গতিকে রুদ্ধ করে দেওয়া।
গ্রামের সেই হামিদার ছোট ছেলে কাসেমের একটিই আবদার ছিল—ঈদে সে একটি ‘লাল পিরাণ’ (লাল শার্ট) পরবে। ২২শে রমজান যখন চৌধুরী বাড়িতে যাকাতের কাপড় দেওয়া হচ্ছিল, হামিদা তার ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিল সেই মিছিলে। সে জানত না, যাকাত মানে সম্মানের সঙ্গে প্রাপ্য বুঝে নেওয়া, সে জানত না এটি কোনো মহাজনী অনুগ্রহ নয়। কাসেমের স্বপ্ন ছিল সেই লাল শার্টটা পরে সে বন্ধুদের সঙ্গে ইদগাহে যাবে।
কিন্তু চৌধুরী বাড়ির সেই দীর্ঘ সারিতে কেবল শাড়ি আর লুঙ্গিই ছিল, কাসেমের মাপের কোনো লাল শার্ট ছিল না। রিফাত সুলতান সাহেবকে বলল, “স্যার, আপনি কি জানেন, ব্যক্তিগত উদ্যোগে ৫০০-১০০০ টাকা বিলি করে দারিদ্র্য কমানো যায় না? কিন্তু যদি সেই টাকা একত্রিত করে কাসেমের মায়ের জন্য একটি গরু কিনে দেওয়া হতো, তবে সেই গরুর দুধ বিক্রি করে কাসেম নিজেই তার লাল শার্ট কিনতে পারত।” সুলতান সাহেবের হৃদয়ে কাসেমের সেই তৃষ্ণার্ত চোখগুলো ভেসে উঠল। তিনি বুঝলেন, সম্পদের সুষম বণ্টন কেবল একটি ধর্মীয় বিধান নয়, এটি একটি শিশুর শৈশবকে রক্ষা করার একমাত্র উপায়।
সুলতান সাহেব তাঁর পরিচালনা পর্ষদের সভায় আজ এক বিপ্লবী প্রস্তাব দিলেন। তিনি চাইলেন কোম্পানির সিএসআর (Corporate Social Responsibility) তহবিল নয়, বরং শেয়ারহোল্ডারদের যাকাতের অংশটিকে একটি বিশেষ তহবিলে রূপান্তর করতে। তিনি ব্যাখ্যা করলেন, যাকাত ও সিএসআর-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। সিএসআর হলো একটি বাণিজ্যিক কৌশল, কিন্তু যাকাত হলো একটি ঐশী এবং নৈতিক দায়বদ্ধতা।
পর্ষদের সদস্যরা প্রথমে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তাঁরা মুনাফার হিসাব নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু সুলতান সাহেব তথ্য দিয়ে দেখালেন যে, যাকাত প্রদানকারীর সম্পদ কমে না, বরং তা পবিত্র ও পরিবর্ধিত হয় (Growth)। তিনি সুরা আল-বাকারার সেই আয়াতের উদ্ধৃতি দিলেন যেখানে সালাত ও যাকাতকে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি আরও বললেন, যদি যাকাত বোর্ড ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের মাধ্যমে ঘরে বসে যাকাত প্রদানের সুবিধা নেওয়া যায়, তবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। কোম্পানিটি যদি একটি মডেল যাকাত তহবিল গঠন করে, তবে তা পুরো শিল্পখাতের জন্য এক উদাহরণ হয়ে থাকবে।
সুলতান সাহেব জানতে পারলেন যে, বাংলাদেশে ১৯৮২ সাল থেকে একটি সরকারি যাকাত বোর্ড গঠিত হয়েছিল। যদিও চার দশক পর ‘যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩’ প্রণীত হয়েছে, তবুও জনগণের আস্থা ও প্রচারণার অভাবে এই তহবিলটির পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২০ সালে যেখানে যাকাত তহবিলে মাত্র সাড়ে তিন কোটি টাকা জমা পড়েছিল, ২০২৩ সালে তা সাড়ে ১১ কোটিতে পৌঁছেছে।
সুলতান সাহেব ভাবলেন, যদি দেশের সকল বিত্তবান ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান এই সরকারি তহবিলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করত, তবে এক বছরের যাকাতের অর্থে পদ্মা সেতুর মতো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো। এই তথ্যটি তাকে রোমাঞ্চিত করল। তিনি রিফাতকে বললেন, “আমাদের কেবল দান করলেই হবে না, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত বাধ্যতামূলক আদায় ও পরিকল্পিত ব্যবহারের জন্য জনমত তৈরি করতে হবে।” কারণ যাকাতের অর্থ যখন সমষ্টিগতভাবে বণ্টিত হয়, তখনই তা দারিদ্র্য ও বৈষম্য মোচনে সুদূরপ্রসারী অবদান রাখতে পারে।
ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নে সুলতান সাহেব যাকাতকেও যুক্ত করতে চাইলেন। তিনি জানলেন যে, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বর্তমানে অ্যাপ্লিকেশন সফটওয়্যারের মাধ্যমে ঘরে বসেই যাকাত প্রদানের ব্যবস্থা চালু করেছে। যাকাত ক্যালকুলেটর অ্যাপের মাধ্যমে মানুষ এখন সহজেই তাদের নিসাব পরিমাণ সম্পদ হিসাব করতে পারে এবং সরাসরি সরকারি তহবিলে জমা দিতে পারে।
সুলতান সাহেব সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর কোম্পানির সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য একটি ‘যাকাত অ্যাপ’ ও অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করবেন। এর ফলে যাকাতদাতারা জানতে পারবেন তাদের দেওয়া অর্থ ঠিক কোন খাতে—ফকির, মিসকিন নাকি কোনো মেধাবী ছাত্রের বৃত্তিতে ব্যয় হচ্ছে। প্রযুক্তির এই স্বচ্ছতা মানুষের ভেতর যাকাত দেওয়ার আগ্রহ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। যাকাত আর তখন ‘গোপন করুণা’ থাকবে না, বরং তা হবে এক দৃশ্যমান সামাজিক উন্নয়ন শক্তি।
সুলতান সাহেব যখন গ্রামে গেলেন, তিনি দেখলেন কৃষকরা রৌদ্রে দগ্ধ হয়ে ফসল ফলালেও তাদের ঋণের বোঝা কমে না। রিফাত তাকে মনে করিয়ে দিল ‘উশর’ বা ফসলের যাকাতের কথা। জমাকৃত স্বর্ণ-রুপার যেমন যাকাত হয়, তেমনি জমি থেকে উৎপন্ন ফল ও ফসলেরও একটি নির্দিষ্ট অংশ (১০% বা ৫%) যাকাত হিসেবে প্রদান করা ফরজ।
হামিদার মতো প্রান্তিক কৃষকরা যদি এই উশরের সঠিক ব্যবহার পেত, তবে তাদের উপকরণ সংগ্রহের জন্য মহাজনদের কাছে অর্থের অভাব হতো না। সুলতান সাহেব দেখলেন, গ্রামের মানুষরা অনেক ক্ষেত্রে অজ্ঞতাবশত এই বিধানটি পালন করে না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের ইমামদের মাধ্যমে উশরের গুরুত্ব এবং এর মাধ্যমে গ্রামীণ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করবেন। কৃষির উৎপাদনের সঙ্গে যদি প্রান্তিক মানুষদের নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত করা যায়, তবেই গ্রামীণ দারিদ্র্যের হার দ্রুত হ্রাস পাবে।
সুলতান সাহেব গবেষণায় দেখলেন যে, যাকাত ব্যবস্থাপনায় কেবল বাংলাদেশ নয়, ইন্দোনেশিয়া ও সুদান অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। ইন্দোনেশিয়ার ‘ডমপেট ডুফা’ (Dompet Dhuafa) বা এতিমদের মানিব্যাগ নামক সংস্থাটি যাকাত ও সদকা সংগ্রহের পর তার ১০ শতাংশ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচিতে ব্যয় করে। অন্যদিকে সুদানের ‘আল-আমান মাইক্রোফাইন্যান্স’ যাকাত ফান্ডের অর্থে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রদান করে দারিদ্র্য বিমোচনে সফল হয়েছে।
সুলতান সাহেব ভাবলেন, বাংলাদেশের যাকাত ব্যবস্থাপনাকেও যদি এই আন্তর্জাতিক মডেলগুলোর আদলে আধুনিকায়ন করা যায়, তবে তা ক্ষুদ্রঋণের বিকল্প এক শক্তিশালী ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়াবে। তিনি রিফাতকে বললেন, “আমাদেরও এমন একটি ‘যাকাত ব্যাংক’ বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন যা অমুসলিমদের সামাজিক নিরাপত্তার জন্য যেমন বাইতুল মাল থেকে সহায়তা করবে, তেমনি মুসলমানদের জন্য যাকাতভিত্তিক সমৃদ্ধি আনবে।” এটি কেবল বাংলাদেশের জন্য নয়, সারা বিশ্বের জন্য একটি রোল মডেল হতে পারে।
দারিদ্র্য কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি অনেক সময় পারিবারিক সহিংসতারও সূতিকাগার। হামিদার জীবনের গল্পটি সুলতান সাহেব যখন শুনলেন, তাঁর বুকটা কেঁপে উঠল। অভাবের তাড়নায় হামিদার স্বামী তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করত, যা এক পর্যায়ে তাকে গৃহহীন করে তুলেছিল। যে শিশুরা এই ধরনের সহিংসতাপূর্ণ পরিবেশে বেড়ে ওঠে, তারা মানসিক ট্রমা ও ভীতি নিয়ে বড় হয়।
সুলতান সাহেব বুঝলেন, যাকাত যদি কেবল চাল-ডালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে এই ধরনের সামাজিক পচন রোধ করা সম্ভব নয়। যাকাতের অর্থের একটি অংশ যদি এই নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসন এবং শিশুদের মানসিক বিকাশে ব্যয় করা হয়, তবেই সমাজ তার হৃত গৌরব ফিরে পাবে। যাকাত ব্যবস্থাপনার আওতায় যদি সুরক্ষা বলয় (সেফটি নেট) কার্যক্রম এবং পুনর্বাসন সহায়তা প্যাকেজ অন্তর্ভুক্ত থাকে, তবে হামিদার মতো নারীরা সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারবে। দারিদ্র্য ও প্রাচুর্যের এই যে বিপরীতমুখী সহাবস্থান, তা দূর করাই যাকাতের মূল লক্ষ্য।
আবার সেই কালরাত্রির স্মৃতি ফিরে আসে। সেই মর্মান্তিক পদদলনের ঘটনায় যে নারীটি প্রাণ হারিয়েছিল, সে ছিল হামিদার প্রতিবেশী সখিনা। সখিনার সেই মৃতদেহের ওপর পড়ে থাকা আধছেঁড়া যাকাতের শাড়িটি যেন পুরো সমাজব্যবস্থার ওপর এক প্রবল উপহাস। সুলতান সাহেব সেই স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নয়, বরং একটি ‘মর্যাদা কেন্দ্র’ গড়ে তোলার শপথ নিলেন।
তিনি বুঝলেন, এই পদদলনের জন্য কেবল অব্যবস্থাপনা দায়ী নয়, বরং দাতার সেই উচ্চম্মন্যতা দায়ী যা গ্রহীতাকে ভিখারির স্তরে নামিয়ে আনে। যাকাতদাতার মনে যদি আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা থাকত, তবে তিনি কখনো গ্রহীতাকে এভাবে লাইনে দাঁড় করাতেন না। নজরুল যেমন বলেছিলেন, যারা যত বড় ডাকাত-দস্যু, তারা আজ তত বেশি সম্মানি গুণী জাতি-সংঘে। এই ভ্রান্ত সামাজিক আভিজাত্যের তালা ভাঙতে হবে। যাকাত হতে হবে নিঃস্ব ও নিপীড়িত মানবতার ঢাল।
রমজানের শেষ জুমা। সুলতান সাহেব আজ বড় মসজিদের খুতবার পর দাঁড়িয়ে তাঁর পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করলেন। তিনি জানালেন, তাঁর কোম্পানি এখন থেকে আর ব্যক্তিগতভাবে কাপড় বিতরণ করবে না। পরিবর্তে তারা মসজিদ কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত হকদারদের তালিকা তৈরি করবে এবং যাকাত অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেবে।
সুলতান সাহেব হামিদাকে সেই মঞ্চে ডেকে নিলেন। তিনি ঘোষণা করলেন, হামিদার সেলাই প্রশিক্ষণ এবং একটি ক্ষুদ্র ব্যবসার পুঁজির দায়িত্ব তাঁর কোম্পানির যাকাত তহবিল বহন করবে। হামিদার চোখে আজ আনন্দ ও অপমানের জল নেই, আছে এক নতুন সাহসের দীপ্তি। সে আজ আর ‘অভাবী’ বা ‘নিঃস্ব’ তকমাধারী নয়, সে আজ তার প্রাপ্য অধিকারের অংশীদার। মসজিদের সেই আলোকোজ্জ্বল প্রাঙ্গণে রিফাত অনুভব করল, ‘অধিকারের অমিয় রেখা’ আজ দীর্ঘ হতে শুরু করেছে। শহর আর গ্রামের বৈষম্য ঘুচিয়ে এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন আজ নিয়ন আলোর চেয়েও উজ্জ্বল হয়ে ফুটে উঠেছে। যাকাত হোক মর্যাদার পুনর্জাগরণ, হোক ক্ষুধার বিরুদ্ধে এক নীরব কিন্তু চূড়ান্ত বিপ্লব।
Leave Your Comments