প্রকাশিত :  ১৭:৫৯
২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

আস্থার রক্তক্ষরণ ও একুশের পুনর্জাগরণ: পুঁজিবাজারের সন্ধিক্ষণে এক গভীর পাঠ

আস্থার রক্তক্ষরণ ও একুশের পুনর্জাগরণ: পুঁজিবাজারের সন্ধিক্ষণে এক গভীর পাঠ
✍️ ড. নাজমুল ইসলাম
পুঁজিবাজার কেবল কিছু বিমূর্ত সংখ্যার ওঠানামা বা গ্রাফের চড়াই-উতরাই নয়; এটি লাখো মানুষের ঘাম, দীর্ঘশ্বাস আর লালিত স্বপ্নের এক জীবন্ত দর্পণ। ১৯ ফেব্রুয়ারির সেই বিষাদময় লেনদেন শেষে যখন চারপাশ জুড়ে 'লাল স্রোত' বইল, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীর মনে কেবল একটিই প্রশ্ন—আগামীকাল কি নতুন কোনো সূর্যোদয় হবে, নাকি পতনের এই অন্ধ গহ্বর আরও প্রসারিত হবে? পুঁজিবাজারের ইতিহাসে লাল রঙ সবসময় কেবল পতনের প্রতীক নয়, বরং কখনো কখনো তা বিনিয়োগকারীর হৃদয়ের রক্তক্ষরণকেও চিহ্নিত করে। বর্তমান এই অস্থিরতা নিছক কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়; এর গভীরে লুকিয়ে আছে আস্থার এক বিশাল ফাটল ও সুশাসনের তীব্র সংকট।
১৯ ফেব্রুয়ারির 'লাল স্রোত': আস্থাহীনতার ব্যবচ্ছেদ
পুঁজিবাজারের পরিভাষায় ১৯ ফেব্রুয়ারির দিনটিকে 'লাল স্রোত' হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে, কারণ এদিন সিংহভাগ শেয়ারের দাম কমেছে এবং সূচক তার গুরুত্বপূর্ণ 'সাপোর্ট লেভেল' হারিয়েছে। এই পতন শুধু একটি বাণিজ্যিক দিনের পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিত আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সূচক যখন একটি নির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক সীমানার নিচে নেমে আসে, তখন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যৌক্তিক বিচার-বুদ্ধির চেয়ে এক আদিম আতঙ্ক বা 'প্যানিক সেলিং' বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
বাজারের এই নিম্নমুখী প্রবণতা সামষ্টিক অর্থনীতির কিছু দুর্বল দিককে উন্মোচিত করছে। ব্যাংক খাতের উচ্চ খেলাপি ঋণ—যা প্রায় ৩৬ শতাংশে পৌঁছেছে—এবং তারল্য সংকট পুঁজিবাজারে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাজারের চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম যখন কমতে শুরু করে, তখন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা হয়ে নিজেদের শেষ সম্বলটুকু রক্ষা করতে বেপরোয়াভাবে শেয়ার বিক্রি করতে থাকেন।
পুঁজিবাজারের এই দোদুল্যমানতা কেবল অভ্যন্তরীণ সংকটের ফল নয়; এর সঙ্গে বিশ্ববাজারের অস্থিরতা, বিশেষ করে মার্কিন ডলারের বিনিময় হারের অনিশ্চয়তাও জড়িত। তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতটি তৈরি হয়েছে আস্থার অভাবে। বিনিয়োগকারীরা যখন মনে করেন যে, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও নীতিনির্ধারকরা তাদের স্বার্থ রক্ষায় যথেষ্ট তৎপর নন, তখন তারা পুঁজি সরিয়ে নিতে শুরু করেন। ১৯ ফেব্রুয়ারির সেই দিনটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, বাজারকে কেবল কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন একটি শক্ত অর্থনৈতিক ভিত্তি ও স্বচ্ছ লেনদেন প্রক্রিয়া।
আগামীকালের দৃশ্যপট: তিনটি সমান্তরাল পথ
আগামীকাল যখন লেনদেনের ঘণ্টা বাজবে, তখন বিনিয়োগকারীদের সামনে তিনটি প্রধান দৃশ্যপট উন্মোচিত হতে পারে। বিশ্লেষকরা এই সম্ভাবনাগুলোকে নিছক অনুমান নয়, বরং প্রযুক্তিগত সূচক ও বাজারের মনস্তত্ত্বের ভিত্তিতে সাজিয়েছেন।
১. যান্ত্রিক পুনরুদ্ধার বা টেকনিক্যাল বাউন্স: পুঁজিবাজারের একটি চিরাচরিত ধর্ম হলো, টানা পতনের পর বাজার নিজেই সংশোধনের পথে হাঁটে। যদি দিনের শুরুতেই ব্যাংক ও বড় মূলধনী ওষুধ খাতের শেয়ারে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ক্রয়চাপ বাড়ে এবং সূচক ৫৪৫০ পয়েন্টের উপরে স্থিত থাকে, তবে একটি স্বল্পমেয়াদি পুনরুদ্ধার দেখা যেতে পারে। আরএসআই (RSI) বর্তমানে অত্যন্ত নিম্নমুখী অবস্থানে থাকায় এটি একটি স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
২. সাপোর্ট ভাঙার আতঙ্ক: যদি বিক্রির চাপ অব্যাহত থাকে এবং সূচক ৫৪৩০ পয়েন্টের নিচে নেমে যায়, তবে বাজারে নতুন করে আতঙ্ক সৃষ্টি হতে পারে। ৫৪৩০ পয়েন্ট ভেঙে গেলে তা আরও ৫০-৭০ পয়েন্ট পতনের ঝুঁকি তৈরি করবে। এটি হবে একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতি, যেখানে বিনিয়োগকারীরা 'ব্লাডবাথ' বা বেপরোয়া বিক্রয় শুরু করতে পারেন।
৩. স্থবিরতা ও সাইডওয়ে মুভমেন্ট: তৃতীয় সম্ভাবনাটি হলো, বাজার কোনো বড় উত্থান বা পতন ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট পরিসরে (Range) ওঠানামা করবে। বিনিয়োগকারীরা যখন কোনো সুনির্দিষ্ট দিক খুঁজে পান না, তখন তারা 'অপেক্ষা করো এবং দেখো' নীতি গ্রহণ করেন, যার ফলে লেনদেনের পরিমাণ ৪০০ কোটি টাকার নিচে নেমে যেতে পারে।
ইতিহাসের আয়নায় বর্তমান সংকট
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাস বড় বড় ধসের ক্ষতচিহ্নে ভরা। ১৯৯৬ সালের ধস ছিল এক প্রজন্মের কাছে প্রথম বড় শিক্ষা, যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় হারিয়েছিল। এরপর ২০১০ সালের মহাধস আবারও প্রমাণ করে যে, আমাদের বাজার কাঠামো কতটা ভঙ্গুর এবং কারসাজিকারীদের কবলে কতটা জিম্মি। তৎকালীন সময়ে 'বিগ প্লেয়ার' বা বড় বিনিয়োগকারীরা কৃত্রিমভাবে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের টাকা লুটে নেয়।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি কেবল কারসাজিনির্ভর নয়, বরং এটি কাঠামোগত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণের হার গত ৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। এটি কেবল বাজারের লোকসান নয়, বরং অর্থনীতির প্রতি মানুষের ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাসের লক্ষণ। যখন সাধারণ মানুষের সঞ্চয়—তা হোক পেনশনের টাকা বা প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্স—পুঁজিবাজারে এসে ঝুঁকির মুখে পড়ে, তখন তা শুধু একটি আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং একটি সামাজিক বিপর্যয় হিসেবে আবির্ভূত হয়।
রেজুয়ান আহম্মেদের দর্শন: ধৈর্য ও বিচক্ষণতার পথ
অর্থনীতি বিশ্লেষক রেজুয়ান আহম্মেদ তার বিভিন্ন কলামে পুঁজিবাজারের ভাষাকে সংখ্যার ঊর্ধ্বে মানুষের আত্মার সাথে তুলনা করেছেন। তার মতে, বাজার যখন 'লাল স্রোতে' ভেসে যায়, তখন বিনিয়োগকারীর প্রধান অস্ত্র হওয়া উচিত ধৈর্য। তিনি বারবার জোর দিয়েছেন যে, আবেগতাড়িত হয়ে শেয়ার কেনাবেচা করলে ক্ষতির ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। তার দেখানো পথ অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের জন্য চারটি মূলমন্ত্র অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক:
· মৌলিক ভিত্তি যাচাই: কোনো কোম্পানির শেয়ার কেনার আগে তার আর্থিক প্রতিবেদন ও করপোরেট সুশাসন যাচাই করা আবশ্যক।
· পোর্টফোলিও বৈচিত্র্য: 'সব ডিম এক ঝুড়িতে না রেখে' ব্যাংক, ফার্মা, খাদ্য ও সরকারি বন্ডে বিনিয়োগ ছড়িয়ে দেওয়া উচিত।
· গুজব এড়িয়ে চলা: সোশ্যাল মিডিয়া বা অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কারসাজিমূলক গুজবে কান না দিয়ে প্রযুক্তিগত সূচকগুলো পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
· ধাপে ধাপে বিনিয়োগ: একবারে সব টাকা বিনিয়োগ না করে বাজার স্থিতিশীল হওয়ার সংকেত পেলে ধাপে ধাপে বিনিয়োগ বাড়ানো উচিত।
একুশের বজ্রনিনাদ ও অর্থনৈতিক মুক্তি
আগামীকাল ২১শে ফেব্রুয়ারি। রক্তে রাঙানো সেই দিনটি আমাদের কেবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা মনে করিয়ে দেয় না, বরং এর একটি গভীর অর্থনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ। ভাষার অধিকার ছিল সামষ্টিক অর্থনৈতিক মুক্তির প্রথম সোপান।
বর্তমান পুঁজিবাজারে যে অস্থিরতা আমরা দেখছি, তাকে যদি একুশের চেতনার আয়নায় দেখি, তবে তা এক ধরনের সুশাসনের সংকট হিসেবেই চিহ্নিত হয়। ২১শে ফেব্রুয়ারির এই দিনে আমাদের শপথ হওয়া উচিত একটি স্বচ্ছ, সমৃদ্ধ ও আস্থাশীল পুঁজিবাজার গড়ে তোলার। ভাষার জন্য যেমন সংগ্রাম করতে হয়েছে, তেমনি একটি স্থিতিশীল অর্থনীতির জন্যও আমাদের নীতিনির্ধারক ও বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে আমাদের আহ্বান হওয়া উচিত—আসুন আমরা আমাদের পুঁজিবাজারকে কলঙ্কমুক্ত করি। ২১শে ফেব্রুয়ারির পোস্টার ডিজাইনের ভাবনায় যেমন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের বেদিতে অর্থনীতির প্রতীকী সূচকগুলো সবুজ হওয়ার স্বপ্ন দেখা যায়, তেমনি বাস্তবেও আমরা সেই সমৃদ্ধ আগামীর প্রত্যাশা করি।
আস্থার সংকট ও আগামীর পথ
পুঁজিবাজার মূলত আস্থার প্রতিফলন। ১৯ ফেব্রুয়ারির লেনদেন সেই আস্থায় ফাটল ধরার ইঙ্গিত দিয়েছে সত্য, কিন্তু ইতিহাস বলে বাজার কখনোই একমুখী থাকে না। নীতিগত ইতিবাচক বার্তা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং স্থিতিশীল সামষ্টিক অর্থনৈতিক সূচক—এই তিন উপাদানের সমন্বয় ঘটলে বাজার দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব।
আগামীকাল তাই হতে পারে এক কঠিন পরীক্ষার দিন। সংখ্যার এই ওঠানামার ভেতরে লুকিয়ে আছে লাখো মানুষের ঘাম ও পরিশ্রমের ফসল। প্রতিটি পয়েন্টের পরিবর্তন শুধু গ্রাফের রেখা নয়; এটি হাজারো বিনিয়োগকারীর আশা-নিরাশার গল্প। আগামীকাল সেই গল্পে কোন রঙের প্রাধান্য থাকবে—সবুজ না লাল—তা নির্ভর করবে আমাদের সম্মিলিত আস্থা ও অংশগ্রহণের ওপর। ২০২৬ সালের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা কেবল একটি স্থিতিশীল বাজারের প্রার্থনাই করি না, বরং একটি ন্যায়সংগত ও কর্মসংস্থানমুখী অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ার আহ্বান জানাই। আস্থার সংকট যেদিন দূর হবে, সেদিনই পুঁজিবাজার তার আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হবে। একুশের চেতনা আমাদের শেখায় অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করতে; সেই একই চেতনা নিয়ে আমাদের অর্থনীতিও যেন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে—এটাই হোক মহান শহীদ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার।
সূচক ফিরুক তার আপন শক্তিতে, দূর হোক আস্থার রক্তক্ষরণ।

Leave Your Comments




পুঁজি বাজার এর আরও খবর