প্রকাশিত : ১৮:৪১
২০ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ | অর্থনীতি
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকাশে এখন কালো মেঘ। ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি নবনির্বাচিত সরকার যখন শপথ নিতে যাচ্ছে, তখন তাদের পায়ের তলায় ফুল নয়, বরং পাথর। তারা উত্তরাধিকার সূত্রে পাচ্ছে এক বিশাল ঋণের পাহাড়। এই পাহাড় হঠাৎ করে জমা হয়নি। ২০০১ থেকে ২০২৬—এই আড়াই দশকের যাত্রায় আমরা উন্নয়নের গল্প শুনেছি, মেগা প্রকল্পের স্লোগান শুনেছি। কিন্তু সেই গল্পের আড়ালে জমেছে এক সুবিশাল ঋণের স্তূপ, যা আজ দেশের প্রতিটি মানুষের কাঁধে বোঝা হয়ে চেপে বসেছে। আজকের এই সম্পাদকীয়তে আমরা খতিয়ে দেখব, কীভাবে এই ঋণের বোঝা বাড়ল, আর আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকার মিলে নবনির্বাচিত সরকারের জন্য কত বড় ধাঁধা রেখে গেল।
২০০১-২০০৬: শ্লথ গতি, স্থির নীতি
২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার দায়িত্ব নেয় এমন এক সময়ে, যখন অর্থনীতি ছিল সতর্ক পথচারীর মতো। তখন বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ বলতে ছিল উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থাগুলোর দেওয়া সহজ শর্তের ঋণ। ২০০১ সালে ঋণের স্থিতি ছিল ১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলার, যা সে সময়ের বিনিময় হার অনুযায়ী এক লাখ কোটি টাকারও কম। জিডিপির তুলনায় ঋণের অনুপাত ছিল স্থিতিশীল, প্রায় ৩১ শতাংশ।
তখন ঋণ নেওয়া হতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায়, সুদের হার ছিল ১ শতাংশের নিচে, গ্রেস পিরিয়ড ছিল দীর্ঘ। ২০০৬ সালে সরকারের মেয়াদ শেষে ঋণ দাঁড়ায় ২০.১৬ বিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ ৫ বছরে বেড়েছিল মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলার। তখন ঋণের বোঝা ছিল সহনীয়, কারণ কৌশল ছিল রাজস্ব ব্যয় সংকুচিত করে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়া। ঋণ তখন ফাঁদ নয়, বরং উন্নয়নের হাতিয়ার ছিল।
২০০৯-২০২৪: মেগা প্রকল্পের মায়াজাল, ঋণের উল্লম্ফন
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় বসে। তখন মোট ঋণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণ ছিল ২৫.৩৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু তারপর শুরু হয় ভিন্ন অধ্যায়। সরকার উন্নয়নকে দৃশ্যমান করতে মেগা প্রকল্পের মডেল নেয়। বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে।
২০১০ সালের পর থেকে ঋণের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ দাঁড়ায় ৪১.১৭ বিলিয়ন ডলারে, আর ২০২৪ সালে তা ছাড়িয়ে যায় ১০০ বিলিয়ন ডলার। এই ১৫ বছরে ঋণের চরিত্রও বদলে যায়। বহুপাক্ষিক সহজ শর্তের ঋণের জায়গা নেয় দ্বিপাক্ষিক, কঠিন শর্তের বাণিজ্যিক ঋণ। চীন, রাশিয়া, ভারত থেকে নেওয়া এসব ঋণের সুদের হার বেশি, পরিশোধের সময় কম।
২০২৪ সালের জুনে মোট ঋণ দাঁড়ায় ১৮ লাখ ৩২ হাজার ২৮২ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদেশি ঋণ ৮ লাখ ১২ হাজার ৭৭ কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ ১০ লাখ ২০ হাজার ২০৫ কোটি টাকা। ২০০৯ সালের তুলনায় ঋণ বেড়েছে প্রায় আট গুণ। এই অঙ্কই বলে দেয়, উন্নয়নের রং কতটা ঋণের রঙে মিশেছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার: ধস নামা অর্থনীতি, বাড়তি দায়
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়ায়। রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে, ব্যাংক খাত দেউলিয়া হওয়ার পথে, বকেয়া বিদেশি বিলের পাহাড়। অন্তর্বর্তী সরকার বড় কোনো প্রকল্প না নিলেও, তাদের সময়ে ঋণ কমেনি, বরং বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১৪ মাসে তারা যোগ করেছে ২ লাখ ৬০ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা বাড়তি ঋণ।
এর কারণ তিনটি: আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া বকেয়া বিল পরিশোধ, রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখতে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে নেওয়া বাজেট সহায়তা ঋণ, আর টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন, যা আগের ঋণের দায় টাকার অঙ্কে বাড়িয়ে দেয়।
মেগা প্রকল্প: স্বপ্ন নয়, ফাঁদ
ঋণের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির মূলে রয়েছে মেগা প্রকল্পের মায়াজাল। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে নেওয়া ১ হাজার ১৩৮ কোটি ডলার ঋণের সুদ ৪ শতাংশ। ২০২৬ সাল থেকে প্রতি বছর ৫০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হবে। মেট্রোরেল জাইকার ঋণে তৈরি হলেও এর আয় দিয়ে ঋণ শোধ সম্ভব নয় বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের জন্য চীনের কাছ থেকে নেওয়া ২৬৭ কোটি ডলারের ঋণের কিস্তিও শুরু হচ্ছে ২০২৬ সালে। এসব প্রকল্প থেকে কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব না আসায় সেগুলো এখন দেশের গলায় পাথর বেঁধে দিচ্ছে।
২০২৬-এর চ্যালেঞ্জ: ঋণের পাহাড়, ফুরফুরে রাজস্ব
নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের সামনে এখন ঋণের চিত্র ভয়াবহ। সরকারের মোট ঋণের স্থিতি ২৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা জিডিপির প্রায় ৪২ শতাংশ। আওয়ামী লীগের ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ এখন প্রায় আট গুণ বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার যোগ করেছে আরও প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা।
২০২৬ ও ২০২৭ সাল ঋণ পরিশোধের পিক টাইম। ২০২৬ সালে ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়বে ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে, রাজস্ব আদায়ের অবস্থা শোচনীয়, কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে। ফলে নতুন সরকারকে হয় নতুন ঋণ নিয়ে পুরোনো ঋণ শোধ করতে হবে, নয়তো উন্নয়ন ব্যয় কমিয়ে হাতে গোনা কিছু প্রকল্পে সীমিত রাখতে হবে।
উত্তরণের পথ, শঙ্কার দেয়াল
২৩ লাখ কোটি টাকার ঋণের বোঝা নিয়ে পথচলা শুরু করা সরকারের জন্য সামনের দিনগুলো কঠিন। আওয়ামী লীগ উন্নয়নের ফানুস উড়িয়েছিল, কিন্তু সেই ফানুস এখন ফুটো। অন্তর্বর্তী সরকার সংকট সামাল দিতে গিয়ে ঋণের অঙ্ক আরও বাড়িয়েছে।
নতুন সরকারের সামনে দুটি পথ: আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে পুনরায় দরকষাকষি করে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা বাড়ানো, অথবা কঠোর আর্থিক কৃচ্ছ্রসাধন ও রাজস্ব সংস্কার। কিন্তু প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের কাছ থেকে টাকা আদায় এবং অর্থ পাচার রোধ করা না গেলে, শুধু ঋণ নিয়েই অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা যাবে না।
বাংলাদেশের মানুষ ভবিষ্যতের আশায় ভোট দিয়েছে। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ এখন ঋণের শেকলে বন্দি। ২০০১ থেকে ২০২৬—এই ২৫ বছরে উন্নয়নের নামে আমরা ঋণের পাহাড় গড়েছি। এখন সেই পাহাড় আমাদের দম আটকে ধরেছে। নতুন সরকারের দক্ষতা, সততা ও সাহসই নির্ধারণ করবে, আমরা এই ফাঁদ থেকে বেরোতে পারব কি না। সাংবাদিক হিসেবে আমাদের কলম সেই সত্যই বলে যাবে, যা আজকের অর্থনীতির নির্মম বাস্তবতা।
বিস্তারিত বিশ্লেষণ: প্রতিটি স্তরের ব্যবচ্ছেদ
১. বিএনপি আমল (২০০১-২০০৬): ঋণ ছিল সহজ শর্তের, দীর্ঘমেয়াদি, সুদ নামমাত্র। জিডিপির তুলনায় ছিল ভারসাম্যপূর্ণ। বাজেটের ৫-৭ শতাংশ ব্যয় হতো ঋণ পরিশোধে।
২. আওয়ামী লীগ আমল (২০০৯-২০২৪): ঋণ বেড়েছে রকেটগতিতে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক ঋণের দিকে ঝোঁক। রূপপুর, পদ্মা রেলের মতো প্রকল্পে "সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট" নেওয়া হয়েছে, যা বেশি সুদে এবং কম সময়ে পরিশোধযোগ্য।
৩. অন্তর্বর্তী সরকার (২০২৪-২০২৬): বকেয়া পরিশোধ, আইএমএফ ঋণ, টাকার মান পতন—এই তিন কারণে ঋণ বেড়েছে।
৪. ২০২৬-এর উত্তরাধিকার: আওয়ামী লীগ ১৮-১৯ লাখ কোটি টাকা এবং অন্তর্বর্তী সরকার ৩-৪ লাখ কোটি টাকা যোগ করে রেখে গেছে। মোট ২৩ লাখ কোটি টাকার পাহাড়। রূপপুরসহ বড় প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে ২০২৬ সালে। এটি নতুন সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা।