প্রকাশিত : ১৮:০১
১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
পুঁজিবাজার আবারও একটি পুরোনো সত্যকে অনিবার্যভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—সূচকের পতন শুধুই পরিসংখ্যানের খেলা নয়; এটি বিনিয়োগকারীর আস্থার আয়না। টানা বিক্রির চাপে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স নেমে এসেছে ৫,৪৬৫ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে। এক দিনেই ৫৩ দশমিক ২১ পয়েন্ট বা প্রায় ১ শতাংশ কমেছে এই সূচক। সংখ্যাটি নেহাত চোখে পড়ার মতো বড় না-ও হতে পারে, কিন্তু বাজারজুড়ে লাল রঙের ছড়াছড়ি যে বিস্তৃত এক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়, তা বোঝা যায় লেনদেনের অসম চিত্র দেখলেই। মাত্র ৪৩টি কোম্পানির শেয়ারদর বেড়েছে; বিপরীতে দর হারিয়েছে ৩০৯টির। এই অনুপাত পরিষ্কার জানান দিচ্ছে, পতনটি খণ্ডিত কোনো ঘটনা নয়, বরং এর গভীরতা ও বিস্তৃতি যথেষ্ট উদ্বেগজনক।
তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—লেনদেন স্থবির হয়ে পড়েনি। ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৫০টি পৃথক লেনদেনের মাধ্যমে শেয়ার হাতবদল হয়েছে প্রায় ৫৬০ কোটি টাকার। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা মাঠ ছেড়ে পালাননি; বরং তাঁরা এখনও সক্রিয়। কিন্তু এই সক্রিয়তার উৎস কি আস্থা, নাকি আতঙ্ক? প্রশ্নটি থেকেই যায়।
বিক্রির চাপের ভাষ্য
দিনভর লেনদেনের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুরুতেই কিছুটা ওঠানামা থাকলেও দিন যত গড়িয়েছে, বিক্রির চাপ তত বেড়েছে। দুপুরের পর সূচক নেমে যায় প্রায় দিনের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বাজারের এই আচরণ সাধারণত দুটি বার্তা দেয়—হয় স্বল্পমেয়াদি মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা, নয়তো দ্রুত শেয়ার ছেড়ে ঝুঁকি এড়ানোর তাগিদ।
ব্যাংক, টেক্সটাইল ও ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে লেনদেনের পরিমাণ ছিল সবচেয়ে বেশি, তবে দরপতনের ছোঁয়া লেগেছে সব খাতেই। মূলত বড় মূলধনী কোম্পানি, বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারগুলোর পতনেই সূচকের এই পতন ত্বরান্বিত হয়েছে, যা বাজারের মনোবলকে আরও দুর্বল করেছে।
সাধারণ সংশোধন, নাকি নীতির শূন্যতা?
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি একটি স্বাভাবিক 'সংশোধন' (কারেকশন), যা সুস্থ বাজারেরই অংশ। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য শক্তিশালী মৌলভিত্তির শেয়ার এখন সুযোগ তৈরি করছে। কিন্তু বারবার মনে আসা প্রশ্ন—আমাদের বাজারে কেন প্রতিটি সংশোধন এত তাড়াতাড়ি আতঙ্কে রূপ নেয়? কেন স্বল্পমেয়াদি ওঠানামা একসময় বড় আকারের আস্থাহীনতার জন্ম দেয়?
এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গেলে নীতিনির্ধারণী কাঠামোর দিকেই তাকাতে হবে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) দায়িত্ব শুধু আইন জারি করাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বিনিয়োগকারীর আস্থা সুরক্ষা এবং বাজারে ভারসাম্য রক্ষা করাও কমিশনের আইনি ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। ১৯৬৯ সালের সিকিউরিটিজ আইন এবং ১৯৯৩ সালের সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন—দুটি আইনেই বিনিয়োগকারীর স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বাজারে যখনই অস্বাভাবিক অস্থিরতা দেখা দেয়, নজরদারি জোরদার করা, বাজার কারসাজি রোধ করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রকের কাঁধেই বর্তায়।
প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা কোথায়?
বর্তমানে সূচক ৫,৪৫০ পয়েন্টের গুরুত্বপূর্ণ সমর্থনসীমার কাছে অবস্থান করছে। এই সময়ে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় ও দৃশ্যমান উপস্থিতি। বিশ্বের উন্নত বাজারগুলোতে বড় তহবিল ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা পতনের সময় হস্তক্ষেপ করে স্থিতিশীলতা ফেরান। কিন্তু আমাদের বাজারে সেই কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা কি দেখা যাচ্ছে? সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন তহবিল, বিমা কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডগুলো কি বাজার স্থিতিশীল রাখার দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করছে, নাকি তারাও স্বল্পমেয়াদি মুনাফার কৌশলে আটকে আছে?
আস্থা ফিরবে কীভাবে?
সূচকের পতন সাময়িক হতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগকারীর আস্থার পতন দীর্ঘস্থায়ী হলে, সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া খুবই কঠিন। বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, নির্ধারিত সময়ে তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে পালন করা, ভেতরের লেনদেন (ইনসাইডার ট্রেডিং) ও বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ—এসবের কোনো বিকল্প নেই আস্থা ফেরাতে।
আজকের বাজার আমাদের জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা। লেনদেনের গতি এখনও আছে, কিন্তু মনোবল দুর্বল। বিনিয়োগকারীরা এখন তাকিয়ে দেখছেন, ৫,৪৫০ পয়েন্টের আশপাশে বাজার টেকসই সমর্থন পায় কি না। কিন্তু এর চেয়েও বড় প্রশ্ন—নীতিনির্ধারকেরা কি সময়মতো সেই আস্থার জোগান দিতে পারবেন?
পুঁজিবাজার শুধু সূচকের ওঠানামার মঞ্চ নয়; এটি সমগ্র অর্থনীতির স্পন্দন। এই স্পন্দন যদি বারবার কেঁপে ওঠে, তবে তার দায় শুধু বাজার ব্যবস্থার ওপরই বর্তায় না, এর জন্য নীতিনির্ধারণকেও জবাবদিহির আওতায় আসতে হবে। এখন সময় এসেছে সাহসী ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্তের, যাতে এই লাল সংকেত পেরিয়ে বাজার ফিরে পায় সবুজের পথ।