প্রকাশিত : ০৬:৪০
১৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
পুঁজিবাজারে আস্থার সংকট নতুন নয়। কিন্তু আস্থার ভিত্তিটাই যদি নীতিনির্ধারকের সিদ্ধান্তে কেঁপে ওঠে, তখন প্রশ্নটি আর কেবল সূচকের নয়—আইনের শাসনেরও। ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেড-এর প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের জন্য অতিরিক্ত তিন বছর বা '৩২-তলা ভবন' নির্মাণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত লক-ইন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দিয়েছে। প্রশ্ন হলো—এই সিদ্ধান্ত কি আইনের স্বীকৃত ন্যায্যতা ও সামঞ্জস্যের পরীক্ষায় টিকে?
পুঁজিবাজারে প্লেসমেন্ট বিনিয়োগকারীরা যে শর্তে পুঁজি বিনিয়োগ করেন, তা মূলত বিদ্যমান আইন, বিধিমালা ও প্রসপেক্টাসে বর্ণিত লক-ইন কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। Securities and Exchange Ordinance, ১৯৬৯-এর ধারা ২০এ কমিশনকে জনস্বার্থে নির্দেশ দেওয়ার ক্ষমতা দিলেও, সেই ক্ষমতা অসীম নয়; তা হতে হবে যুক্তিসঙ্গত, সমানুপাতিক ও বৈষম্যহীন। একইভাবে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ধারা ১৭এ কমিশনকে তদারকি ও প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার দেয়, কিন্তু কোথাও বলা নেই যে পূর্বনির্ধারিত শর্তে বিনিয়োগ করা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ওপর অনির্দিষ্ট মেয়াদের শাস্তিমূলক বিধিনিষেধ আরোপ করা যাবে।
আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো—legitimate expectation বা 'ন্যায়সংগত প্রত্যাশা'। বিনিয়োগকারীরা যখন নির্দিষ্ট লক-ইন মেয়াদ জেনে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন, তখন মাঝপথে সেই মেয়াদ বদলে দেওয়া তাঁদের চুক্তিভিত্তিক প্রত্যাশাকে আঘাত করে কি না—এ প্রশ্ন উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সংবিধানের ৩১ ও ৪০ অনুচ্ছেদে আইনের আশ্রয় ও সম্পত্তির অধিকারের যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তা কি এখানে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে?
আরেকটি প্রশ্ন দায় বণ্টন নিয়ে। যদি আইপিও তহবিল ব্যবহারে অনিয়ম হয়ে থাকে, অথবা প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যত্যয় ঘটে থাকে, তবে তার দায় উদ্যোক্তা ও পরিচালনা পর্ষদের। ১৮৩ জন সাধারণ প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডার, যারা কোম্পানির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনায় যুক্ত নন, তাঁদের ওপর সমানভাবে লক-ইনের বাড়তি শাস্তি চাপানো কি 'সমষ্টিগত শাস্তি'র সামিল নয়? ফৌজদারি আইনের ন্যায়নীতিতে যেমন অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে সামঞ্জস্য অপরিহার্য, তেমনি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও সমানুপাতিকতার নীতি (principle of proportionality) প্রযোজ্য।
বিএসইসি '৩২-তলা ভবন নির্মাণ ও রাজউকের অকুপেন্সি সনদ' পাওয়ার শর্ত যুক্ত করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বড় প্রকল্প শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগা অস্বাভাবিক নয়। ফলে লক-ইন কার্যত অনির্দিষ্টকালের কারাবাসে রূপ নিতে পারে। শাস্তি যদি সময়সীমাহীন হয়ে যায়, তবে তা আর সংশোধনমূলক থাকে না; হয়ে ওঠে প্রতিহিংসাপরায়ণ।
নিয়ন্ত্রকের কঠোরতা দরকার—এ নিয়ে দ্বিমত নেই। কিন্তু সেই কঠোরতা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে বাজারে বিপরীত বার্তা যায়। উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের জরিমানা, শেয়ার বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা বা দীর্ঘমেয়াদি লক-ইন আরোপ করা যেত। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বাধীনতা খর্ব করলে ভবিষ্যতে কোনো কোম্পানিই প্লেসমেন্টে পুঁজি তুলতে সাহস পাবে না। এর প্রভাব পড়বে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানে।
পুঁজিবাজারের ইতিহাস বলছে—সূচক পড়ে গেলে তা একদিন ঘুরে দাঁড়ায়। কিন্তু নীতিগত আস্থা ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠনে সময় লাগে বহুগুণ বেশি। নিয়ন্ত্রকের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা—আইনের কঠোর প্রয়োগ হোক, কিন্তু তা যেন ন্যায়বিচারের সীমা অতিক্রম না করে। শাস্তি হোক দৃষ্টান্তমূলক, তবে দায় নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তাতে হবে। কারণ আস্থা—এই বাজারের সবচেয়ে বড় মূলধন। সেটি যদি লক-ইনের বেড়াজালে বন্দী হয়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে কেবল ১৮৩ জন নয়, গোটা পুঁজিবাজারই।