প্রকাশিত : ১৭:২৯
১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
সর্বশেষ আপডেট: ১৭:৫৩
১৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
বিশেষ বিশ্লেষণ | ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬: পুঁজিবাজার কেবল সংখ্যার ওঠানামা নয়; এটি মূলত আস্থার এক নাজুক স্থাপত্য। সেই আস্থার ভিত যদি নড়ে যায়, তবে সূচকের কৃত্রিম সবুজ রংও দীর্ঘস্থায়ী হয় না। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ লিমিটেডের প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডারদের ওপর অতিরিক্ত তিন বছর বা ৩২-তলা ভবন নির্মাণ শেষ না হওয়া পর্যন্ত লক-ইনের মেয়াদ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাজারের মৌলিক নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এখন প্রশ্নটি কেবল একটি কোম্পানিকে নিয়ে নয়; বরং নীতিনির্ধারণের ধারাবাহিকতা ও ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নিয়ে।
একজন প্লেসমেন্ট বিনিয়োগকারী যখন পুঁজি বিনিয়োগ করেন, তখন তিনি বিদ্যমান আইনি কাঠামো এবং নির্দিষ্ট সময়ের লক-ইন মেয়াদের ওপর আস্থা রেখেই তা করেন। বিনিয়োগের মাঝপথে যদি সেই নিয়ম আকস্মিকভাবে বদলে দেওয়া হয়, তবে তা 'চুক্তিভিত্তিক প্রত্যাশার' সরাসরি লঙ্ঘন কি না—সেই বিতর্ক অমূলক নয়। পুঁজিবাজারের প্রাণ হলো নীতির স্থিতিশীলতা। খেলার মাঝপথে যদি গোলপোস্ট সরিয়ে ফেলা হয়, তবে বার্তাটি স্পষ্ট—এখানে ঝুঁকি কেবল বাজারের অস্থিরতায় নয়, বরং নিয়ন্ত্রক সংস্থার সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তায়ও বিদ্যমান।
সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠেছে দায়ের বণ্টন নিয়ে। এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ যদি আইপিও তহবিলের ব্যবহারে ব্যত্যয় ঘটিয়ে থাকে কিংবা বিধিবহির্ভূতভাবে '৩২-তলা ভবনের' উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করে থাকে, তবে তার দায়ভার এককভাবে কোম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ওপরই আরোপ করা সংগত। কিন্তু যে ১৮৩ জন সাধারণ প্লেসমেন্ট শেয়ারহোল্ডার কোম্পানির দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদের ওপর বছরের পর বছর লক-ইন চাপিয়ে দেওয়া কি 'শাস্তির পরিসর'কে অযৌক্তিকভাবে বিস্তৃত করা নয়? অপরাধীর বদলে নিরপরাধ বিনিয়োগকারীকে 'বলির পাঁঠা' বানানো কোনোভাবেই সুশাসনের লক্ষণ হতে পারে না।
বিএসইসির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে '৩২-তলা ভবন নির্মাণ সমাপ্তি ও রাজউকের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট' পাওয়ার শর্ত যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি মেগা প্রকল্প শেষ হতে এক দশকেরও বেশি সময় লেগে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। ফলে এই লক-ইন কার্যত অনির্দিষ্টকালের এক কারাবাসে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছে। আইনের শাসনের মূলকথা হলো—শাস্তি হতে হবে পূর্বনির্ধারিত, সুস্পষ্ট এবং অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখানে কি সেই সামঞ্জস্য রক্ষা করা হয়েছে?
পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিজস্ব তদারকি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এখানে আলোচ্য। আইপিও-পরবর্তী তহবিল ব্যবহারের অডিট যদি সময়মতো এবং কঠোরভাবে হতো, তবে কি আজ এমন চরম সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়ত? বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে যেমন কঠোরতা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিজস্ব আত্মসমালোচনা। শাস্তির খড়্গ যখন লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, তখন তা বাজারে গভীর ক্ষত তৈরি করে।
অনিয়ম দমনে বিএসইসির কঠোর অবস্থানকে আমরা সাধুবাদ জানাই, কিন্তু সেই কঠোরতার লক্ষ্য হতে হবে সঠিক। উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের জরিমানা বা আজীবন লক-ইন আরোপ করা যেতে পারে। কিন্তু সাধারণ প্লেসমেন্ট হোল্ডারদের বিনিয়োগের স্বাধীনতা খর্ব করা হলে ভবিষ্যতে নতুন কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজি সংগ্রহ অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন।
আমাদের পুঁজিবাজার এখনো আস্থার সংকটের চোরাবালিতে আটকে আছে। এই মুহূর্তে নীতিনির্ধারণে স্বচ্ছতা এবং দায়ের সুনির্দিষ্ট বিভাজন একান্ত জরুরি। নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি প্রত্যাশা—শাস্তি হোক দৃষ্টান্তমূলক, কিন্তু তা যেন কোনোভাবেই সাধারণ বিনিয়োগকারীর জন্য 'মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা' না হয়। মনে রাখা প্রয়োজন, আস্থা ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করতে ৩২-তলা ভবনের চেয়েও বেশি সময়ের প্রয়োজন হয়।