প্রকাশিত : ১৮:২৬
১৬ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট এক অভাবনীয় সন্ধিক্ষণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। দীর্ঘ দেড় দশকের একদলীয় শাসনের অবসান ঘটিয়ে ছাত্র-জনতার যে রক্তস্নাত অভ্যুত্থান ঘটেছিল, তা কেবল একটি সরকারের পতন ছিল না; বরং তা ছিল একটি বিধ্বস্ত রাষ্ট্রের পুনর্জন্মের আকাঙ্ক্ষা। এই চরম ক্রান্তিকালে দেশের হাল ধরতে এগিয়ে এসেছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব, যাঁর মেধা, সততা এবং বিশ্বব্যাপী গ্রহণযোগ্যতা ছিল প্রশ্নাতীত। ড. মুহাম্মদ ইউনূস — যিনি কেবল একজন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ নন, বরং বিশ্বজুড়ে শোষিত মানুষের আলোকবর্তিকা — তিনি যখন ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন, তখন তাঁর সামনে ছিল পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। গত ১৮ মাসে তাঁর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কারের বীজ বপন করেছে, তা কেবল সাময়িক কোনো প্রশাসনিক রদবদল নয়, বরং এটি একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মহাকাব্য। ড. ইউনূসের এই ১৮ মাসের অবদান বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে তাঁকে এক অমর আসনে আসীন করেছে, যা কোনো বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় ম্লান হওয়ার নয়।
অভ্যুত্থানের অগ্নিগর্ভ থেকে নবজাতক বাংলাদেশ
চব্বিশের জুলাই মাসের সেই তপ্ত দিনগুলো, যখন রাজপথ রক্তে ভিজে যাচ্ছিল, তখন দেশের ভবিষ্যৎ ছিল অনিশ্চয়তার ঘোর অন্ধকারে আচ্ছন্ন। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর রাষ্ট্র এক বিশাল শূন্যতার সম্মুখীন হয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, পুলিশ বাহিনী ছিল জনরোষের লক্ষ্যবস্তু, আর প্রশাসনিক কাঠামো ছিল দুর্নীতির জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়ানো। ঠিক সেই মুহূর্তে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের পক্ষ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করা হয়, যা দ্রুততম সময়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বিপুল আস্থার সঞ্চার করে। ২০২৪ সালের ৯ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ 'প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব' বা 'Doctrine of Necessity'-এর ভিত্তিতে এই সরকারের বৈধতা প্রদান করে, যা সাংবিধানিক শূন্যতা দূর করতে সহায়ক হয়।
ড. ইউনূস যখন দায়িত্ব নিলেন, তখন তাঁর প্রধান কাজ ছিল কেবল শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা নয়, বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া ফ্যাসিবাদের অবশিষ্টাংশ উপড়ে ফেলা। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল একটি নির্বাচনের আয়োজন করলেই রাষ্ট্রের এই গভীর ক্ষত নিরাময় সম্ভব নয়। তাই তিনি সংস্কার, বিচার এবং রূপান্তরের তিন স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তাঁর শাসনকাল সাজিয়েছিলেন। তাঁর উপদেষ্টা পরিষদে যেমন ছিলেন অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব, তেমনি যুক্ত হয়েছিলেন বিপ্লবের মূল কারিগর দুই ছাত্র প্রতিনিধি, যা বাংলাদেশের শাসন ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার: একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রযন্ত্রের মেরামত
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ওপর গুরুত্ব প্রদান। তিনি চেয়েছিলেন এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে, যেখানে ক্ষমতার অপব্যবহার অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই উদ্দেশ্য সফল করতে তিনি ১০টি পৃথক সংস্কার কমিশন গঠন করেন। এর মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থা, পুলিশ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন এবং সংবিধান সংস্কার কমিশন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ১৮ মাসে এই সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন পাস করেছে এবং ৬০০টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যার বাস্তবায়নের হার ছিল অবিশ্বাস্যভাবে ৮৪ শতাংশ।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার ছিল ড. ইউনূসের অন্যতম বড় সাফল্য। দীর্ঘ সময় ধরে বিচার বিভাগ যখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল, তখন এই সরকার সব আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে আনার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নেয়। বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধা ও স্বচ্ছতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, পূর্ববর্তী সরকারের সময় দায়ের করা কয়েক হাজার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা বাতিলের মাধ্যমে বিচারালয়ে ন্যায়বিচারের পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ: ধ্বংসস্তূপ থেকে স্থিতিশীলতা
উত্তরাধিকারসূত্রে ড. ইউনূস সরকার একটি দেউলিয়া প্রায় ব্যাংকিং খাত এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির অর্থনীতি পেয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ছিল তলানিতে, আর বাজার সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছিল। ড. ইউনূস তাঁর অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা ব্যবহার করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনেন এবং আইএমএফ-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করেন। তাঁর সরকার আইএমএফ-এর ৬.৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণের পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়, যা বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের অস্থিরতা কমাতে সহায়ক হয়।
ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের লক্ষ্যে ড. ইউনূসের প্রশাসন ১১টি দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে এবং পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারে টাস্কফোর্স গঠন করে। এর ফলস্বরূপ, রেমিট্যান্স প্রবাহে এক অভাবনীয় জোয়ার লক্ষ্য করা যায়। ১৮ মাসে রেকর্ড ৩০.৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে, যা অর্থনীতির জীবনীশক্তি ফিরিয়ে দেয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করায় ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি ৮.৪৮ শতাংশে নেমে আসে, যা ছিল গত ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
জুলাই চার্টার: ভবিষ্যতের রক্ষাকবচ
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনের সবচেয়ে দূরদর্শী রাজনৈতিক অর্জন হলো 'জুলাই চার্টার'। প্রায় ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে দীর্ঘ সাত মাসব্যাপী জাতীয় সংলাপের পর এই ঐতিহাসিক দলিলটি চূড়ান্ত করা হয়। জুলাই চার্টার কেবল একটি ঘোষণা নয়, বরং এটি ছিল একটি নতুন সংবিধানের রূপরেখা। এই চার্টারে বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভার প্রস্তাব করা হয়, যেখানে ৪০০ সদস্যের জাতীয় সংসদের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি 'সিনেট' বা উচ্চকক্ষ থাকবে। এই ব্যবস্থা ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করবে এবং ভবিষ্যতে কোনো দল যেন একচ্ছত্র ক্ষমতা ব্যবহার করে স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, তার সুরক্ষা দেবে।
মানবাধিকার ও নিরাপত্তা খাতের নবায়ন
ড. ইউনূসের ১৮ মাসের শাসনামল ছিল মানবাধিকারের এক নতুন জয়গান। তাঁর সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অন্যতম প্রধান কাজ ছিল 'গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদে' স্বাক্ষর করা এবং গুমের ঘটনা তদন্তে একটি বিশেষ কমিশন গঠন করা। পুলিশ বাহিনীকে দলীয় লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করতে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে। র্যাবকে পুনর্গঠন করে এর কার্যপদ্ধতিকে মানবাধিকারবান্ধব করা হয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো কালো আইন বাতিল করে ড. ইউনূস সরকার প্রমাণ করেছে যে, তারা ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। এছাড়া ইন্টারনেটকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে সংবিধানে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগটি ছিল তাঁর আধুনিক রাষ্ট্রচিন্তার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ।
কূটনীতির বিশ্বমঞ্চে ড. ইউনূসের ম্যাজিক
ড. মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর বিশ্বব্যাপী খ্যাতি ব্যবহার করে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। একে '৩৬০ ডিগ্রি কূটনীতি' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর প্রধানদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক বাংলাদেশের জন্য বিপুল বিনিয়োগ ও সমর্থনের দ্বার উন্মোচন করেছে। তাঁর একটি টেলিফোন কলেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে বন্দি থাকা ৫৭ জন বাংলাদেশি মুক্তি পান, যা ছিল তাঁর ব্যক্তিগত ক্যারিশমার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বিদায়বেলা: এক অশ্রুসিক্ত কৃতজ্ঞতা
১৮ মাসের যাত্রা শেষ করে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ড. মুহাম্মদ ইউনূস যখন ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন সারা দেশে এক বিষাদময় পরিবেশ বিরাজ করছিল। ১২ ফেব্রুয়ারি এক উৎসবমুখর ও সহিংসতাহীন নির্বাচনের আয়োজন করে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, সদিচ্ছা থাকলে বাংলাদেশেও সুষ্ঠু ভোট সম্ভব।
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে তিনি যখন বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে তাঁর সেই মুহূর্তটি ছিল আবেগঘন। তিনি কোনো রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে ক্ষমতায় আসেননি, বরং এক জাতির ডাকে সাড়া দিয়েই এসেছিলেন। ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সাধারণ নাম নন; তিনি একটি অধ্যায়, একটি দর্শন। তিনি বিদায় নিচ্ছেন না; তিনি বেঁচে থাকবেন বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের হৃদয়ে, কৃষকের হাসিতে এবং প্রতিটি নাগরিকের স্পন্দনে। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে এক আলোকোজ্জ্বল ধ্রুবতারা হিসেবে, যিনি অন্ধকারের শেষে আমাদের আলোর পথ দেখিয়েছিলেন।