প্রকাশিত : ১৫:৪১
১৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
রেজুয়ান আহম্মেদ
পুঁজিবাজারকে আমরা প্রায়ই কেবল সূচকের গ্রাফে আটকে ফেলি। কত পয়েন্ট বাড়ল, কত কোটি টাকার লেনদেন হলো—এই হিসাবেই যেন দিনশেষের সাফল্য-ব্যর্থতা মাপা হয়। কিন্তু প্রশ্নটা অন্য জায়গায়। পুঁজিবাজার কি সত্যিই শুধু সংখ্যার খেলা, নাকি এটি আস্থার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এক সূক্ষ্ম অবকাঠামো?
চার দিন আগে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) যে দৃশ্য দেখা গেল, সেটি কেবল ৮৮ পয়েন্টের উল্লম্ফন ছিল না। ডিএসইএক্স সূচক ৫,৩৯৯.৯৪ পয়েন্টে উঠে ১.৬৬ শতাংশ বাড়ার খবরটি যতটা অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি ছিল মনস্তাত্ত্বিক। ৭৯০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন, ২৮৫টি কোম্পানির দর বৃদ্ধি—এসবের ভেতরে লুকিয়ে ছিল দীর্ঘদিনের হতাশ বিনিয়োগকারীদের এক ধরনের স্বস্তি। যেন বাজার বলছিল, 'আমি এখনো বেঁচে আছি।'
বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের ইতিহাস আলো-ছায়ায় ভরা। উত্থানের উচ্ছ্বাস যেমন ছিল, তেমনি পতনের ক্ষতও কম নয়। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘশ্বাস, নিয়ন্ত্রকদের ব্যাখ্যা, বড় বিনিয়োগকারীদের কৌশল—সব মিলিয়ে এটি এক চলমান বাস্তবতার গল্প। এখানে কেউ স্থায়ী নায়ক নন, কেউ স্থায়ী খলনায়কও নন। সময়ই ঠিক করে দেয়, কে কোন ভূমিকায় স্মরণীয় হন।
এই প্রেক্ষাপটে আবুল খায়ের—বিনিয়োগকারী মহলে 'হিরো' নামে পরিচিত—একটি আলোচিত চরিত্র। তাঁকে ঘিরে বিতর্ক আছে, প্রশ্ন আছে। কিন্তু এটিও অস্বীকার করা যায় না, অনিশ্চয়তার সময়ে তাঁর বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগ বাজারে একটি বার্তা দিয়েছিল। করোনা-পরবর্তী আস্থাহীন সময়ে, যখন সূচক চাপে আর লেনদেন স্থবির, তখন মৌলভিত্তিসম্পন্ন ও অবমূল্যায়িত শেয়ারে বিনিয়োগের কৌশল অনেকের কাছে ঝুঁকি নয়, বরং সাহসের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
তবে ব্যক্তিনির্ভর আস্থা কখনোই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। পুঁজিবাজারের প্রকৃতি সমন্বয়নির্ভর। নিয়ন্ত্রক সংস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, ব্রোকারেজ হাউস এবং ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারী—সবাই মিলে তৈরি করেন এই জটিল কাঠামো। এখানে এক পক্ষ দুর্বল হলে পুরো ব্যবস্থাই নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও ন্যায্যতার প্রশ্নে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে বড় বিনিয়োগকারীদেরও বুঝতে হবে—বাজারে তাঁদের সিদ্ধান্ত কেবল ব্যক্তিগত লাভের নয়, বরং সামষ্টিক আস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। নীতিনির্ধারক ও বড় অংশগ্রহণকারীরা যদি প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযোগী হিসেবে কাজ করেন, তবেই বাজারের ভিত্তি আরও মজবুত হতে পারে।
চার দিন আগের সবুজ সূচক তাই কেবল একটি দিনের উত্থান নয়; এটি ছিল সম্ভাবনার ইঙ্গিত। কিন্তু সতর্কতাও সমান জরুরি। একদিনের উল্লম্ফনকে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা ধরে নেওয়া যেমন ভুল, তেমনি ইতিবাচক সংকেতকে অবহেলা করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ নীতিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগোচ্ছে। এই বাস্তবতায় পুঁজিবাজারকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন দ্বন্দ্ব নয়, সংলাপ; বিভাজন নয়, সমন্বয়।
শেষ পর্যন্ত সূচকের গ্রাফ প্রতিদিন বদলাবে। কিন্তু ইতিহাস মনে রাখবে—সংকটে যাঁরা আস্থার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, যাঁরা সমন্বয়ের ডাক দিয়েছিলেন। পুঁজিবাজারের ভবিষ্যৎ সেই আস্থার ভিত্তিতেই নির্মিত হবে।