প্রকাশিত : ০৫:৪২
১১ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন নির্বাচন খুব কমই এসেছে, যাকে ঘিরে প্রজন্মগত পরিবর্তন নিয়ে এতো তীব্র আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এবারের জাতীয় নির্বাচনকে অনেক বিশ্লেষক 'জেনারেশন জেড প্রভাবিত' নির্বাচন বলে অভিহিত করছেন। এটি কেবল একটি শব্দচয়ন নয়; বরং বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার গভীর রূপান্তরেরই প্রতিফলন। যে তরুণেরা একদলীয় কর্তৃত্ব, ভোটাধিকারের সংকট, বেকারত্বের দীর্ঘ ছায়া এবং বৈশ্বিক ডিজিটাল সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বড় হয়েছে, তারা আজ ব্যালট বক্সের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বাংলাদেশের মোট ভোটারের বড় একটি অংশ এখন ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী। এদের অনেকেরই ২০০৮ সালের পর কোনো অবাধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার অভিজ্ঞতা নেই। ফলে তাদের রাজনৈতিক চেতনা গড়ে উঠেছে এক ধরনের বঞ্চনা ও প্রত্যাশার মিশ্রণে। তারা দলীয় আনুগত্যের চেয়ে কাঠামোগত সংস্কার, সুশাসন, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে অনেক বেশি সচেতন।
এই প্রজন্ম ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স (টুইটার), টিকটকের যুগে বেড়ে উঠেছে। তারা তথ্য যাচাই করে, বক্তৃতার ভাষা বিশ্লেষণ করে, নীতির তুলনা করে। প্রচারণার চাকচিক্য দিয়ে তাদের দীর্ঘদিন আটকে রাখা কঠিন। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—তরুণদের সঙ্গে একটি বিশ্বাসযোগ্য সংলাপ গড়ে তোলা।
জামায়াত-সমর্থিত জোটে তরুণ নেতৃত্বের উপস্থিতি একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ। ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী কয়েকজন মুখ এখন জাতীয় রাজনীতির মঞ্চে উঠে এসেছেন। তারা নিজেদের ‘পরিবর্তনের প্রতিনিধি’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাদের এই উপস্থিতি জামায়াতের দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল ভাবমূর্তিকে আংশিকভাবে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি করেছে। তরুণ ভোটারদের একটি অংশ মনে করছে, অন্তত তারা পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে গিয়ে কিছু চিন্তা করতে চায়।
তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই তরুণ নেতৃত্ব নীতিনির্ধারণে কতটা প্রভাব ফেলতে পারবে? তারা কি কেবল প্রতীকী উপস্থিতি, নাকি প্রকৃত ক্ষমতার অংশীদার? তরুণ ভোটাররা এখন আর কেবল বুলিতে সন্তুষ্ট নয়; তারা কাঠামোগত পরিবর্তনের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা চায়।
অন্যদিকে, বিএনপিও তরুণদের গুরুত্ব অনুধাবন করেছে। তাদের ইশতেহারে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আইটি খাতের প্রসার, স্টার্টআপ সহায়তা ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও দলটি এখন ডিজিটাল অর্থনীতি, দক্ষতা উন্নয়ন, বৈশ্বিক বাজারে সংযুক্তি—এসব নতুন ভাষা ব্যবহার করার চেষ্টা করছে।
কিন্তু তরুণ প্রজন্মের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন সহজ নয়। তারা জানতে চায়—ক্ষমতায় গেলে কীভাবে দুর্নীতি কমানো হবে? কীভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা হবে? কীভাবে যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পাওয়া যাবে? কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তবায়নের সক্ষমতা প্রমাণ করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের তরুণেরা আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে তারা বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত—তারা কোরিয়ার পপ সংস্কৃতি থেকে শুরু করে আমেরিকার স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম পর্যন্ত সবকিছু সম্পর্কে জানেন। অন্যদিকে, দেশের ভেতরে তারা বেকারত্ব, মুদ্রাস্ফীতি, সীমিত সুযোগ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে পথ খুঁজছেন। এই বৈপরীত্য তাদের মনে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
বেকারত্বের হার নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পরিসংখ্যানে ভিন্নতা থাকলেও শিক্ষিত তরুণদের হতাশা স্পষ্ট। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বহু তরুণ বছরের পর বছর চাকরি খুঁজছেন। কেউ বিদেশমুখী হচ্ছেন, কেউ ফ্রিল্যান্সিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন, কেউবা সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছেন। এই বাস্তবতা রাজনীতির ভাষা বদলে দিয়েছে। তরুণদের কাছে এখন মূল প্রশ্ন—কে চাকরি দেবে? কে দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি করবে?
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণায় তাই কর্মসংস্থান এখন কেন্দ্রীয় ইস্যু। কিন্তু কর্মসংস্থান কেবল সরকারি চাকরির সংখ্যা বাড়ানো নয়; এটি বিনিয়োগের পরিবেশ, শিল্পায়ন ও উদ্যোক্তা সৃষ্টির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তরুণেরা এখন এই সামগ্রিক চিত্র বুঝতে শুরু করেছে। ফলে তারা স্লোগানের চেয়ে নীতির গভীরতা খোঁজে।
আরেকটি বড় পরিবর্তন হলো রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ধরন। আগের প্রজন্ম যেখানে দলীয় পতাকার নিচে সংগঠিত হতো, আজকের তরুণেরা ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনে বেশি সক্রিয়। পরিবেশ, নারীর অধিকার, বাকস্বাধীনতা, দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন—এসব ইস্যুতে তারা দ্রুত সংগঠিত হতে পারে। ফলে যে দল তাদের কণ্ঠস্বরকে স্বীকৃতি দেবে, তারাই লাভবান হবে।
তরুণদের একটি বড় অংশ আবার রাজনৈতিকভাবে সংশয়ী। তাদের ধারণা, ক্ষমতা বদলালেও সংস্কৃতি বদলায় না। এই নিরাশা দূর করা না গেলে ভোটার উপস্থিতি কমে যেতে পারে। আর কম উপস্থিতির অর্থ হলো সংগঠিত ভোটব্যাংকের সুবিধা বৃদ্ধি পাওয়া।
সংখ্যালঘু তরুণ, নারী তরুণ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর তরুণদের প্রত্যাশা আলাদা মাত্রা যোগ করেছে। তারা নিরাপত্তা, সমতা ও মর্যাদার প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান দেখতে চায়। কোনো দল যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনীতির স্পষ্ট বার্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তরুণদের বড় একটি অংশ সরে যেতে পারে।
ডিজিটাল প্রচারণাও এই নির্বাচনে বড় ভূমিকা রাখছে। ডিপফেক ভিডিও, ভুয়া খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য—এসব কিছু তরুণদের সামনে নিয়মিত হাজির হচ্ছে। তবে এই প্রজন্ম তথ্য যাচাই করতে শিখেছে। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য স্বচ্ছতা বজায় রাখা এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শেষ পর্যন্ত, প্রশ্নটি সরল হলেও এর তাৎপর্য গভীর—কে তরুণদের আস্থা অর্জন করতে পারবে? আস্থা মানে কেবল জনপ্রিয়তা নয়; এটি নীতি, ভাষা ও আচরণের সামঞ্জস্য। যে দল তরুণদের ভবিষ্যৎ স্বপ্নের সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক দর্শনকে যুক্ত করতে পারবে, ভবিষ্যতের ক্ষমতার চাবিকাঠি তার হাতেই থাকবে।
এই নির্বাচন তাই কেবল দুই বা ততোধিক দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়; এটি পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নতুন প্রজন্মের প্রত্যাশার সংঘাত। তরুণেরা যদি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে।
গণতন্ত্রের শক্তি তখনই বাড়ে, যখন নতুন প্রজন্ম তার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তরুণ ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—বাংলাদেশ কি অতীতের পুনরাবৃত্তিতে ফিরে যাবে, নাকি এক নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা করবে। ব্যালটের ভেতরেই লুকিয়ে আছে সেই উত্তর।