প্রকাশিত : ০৫:২০
০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
✍️ রেজুয়ান আহম্মেদ
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি কেবল একটি নির্বাচনের তারিখ নয়; বরং এটি একটি জাতির আকাঙ্ক্ষা ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের অগ্নিপরীক্ষা। ২০২৪ সালের আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দেশ যখন দীর্ঘদিনের ক্ষত মেরামতের প্রক্রিয়ায় নিয়োজিত, তখন এই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নতুন দিগন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে সংস্কারের বীজ বপন করেছে, তার ফসল ঘরে তোলার দায়িত্ব এখন দেশের ১২ কোটি ৭৬ লাখ ভোটারের কাঁধে। তথ্য বিশ্লেষণ ও জনমত জরিপের সমীকরণ বলছে—ক্ষমতার এই মহাপরীক্ষায় স্পষ্টতই এক পালাবদলের প্রবল সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।
জনমতের দর্পণ ও প্রধান দলগুলোর অবস্থান
নির্বাচনী মাঠের হাওয়া কোন দিকে বইছে, তার আঁচ পাওয়া যায় সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন জনমত জরিপ থেকে। আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইনোভিশন কনসাল্টিং’-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৪১.৩০ শতাংশ ভোটারের প্রথম পছন্দ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ তার সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে যে, তারেক রহমান এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী দাবিদার। দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকলেও বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের সাংগঠনিক শক্তি যে এখনো অটুট, তা জনমতের এই হার থেকেই স্পষ্ট।
তবে এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দীর্ঘ সময় চরম দমন-পীড়নের শিকার হওয়া এই দলটি এখন অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে মাঠে ফিরেছে। বিভিন্ন জরিপ বলছে, প্রায় ৩০.৩০ শতাংশ থেকে ৩৩.৫ শতাংশ মানুষের সমর্থন তাদের পক্ষে রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যানের মতে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এবং যারা আওয়ামী লীগের বিকল্প খুঁজছেন, তারা জামায়াতের দিকে ঝুঁকছেন। বিএনপির সাথে জোটবদ্ধ না হয়ে জামায়াত এবার ৩০০ আসনের মধ্যে ২৪৩টিরও বেশি আসনে প্রার্থী দিয়ে তাদের শক্তি প্রদর্শনের প্রস্তুতি নিয়েছে।
তরুণ ভোটার ও এনসিপির প্রভাব
এবারের নির্বাচনের প্রধান নিয়ামক শক্তি হলো প্রায় ৪০ শতাংশ তরুণ ভোটার, যারা গত দেড় দশকে কখনোই একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। জুলাই অভ্যুত্থানের গর্ভ থেকে জন্ম নেওয়া নতুন রাজনৈতিক শক্তি ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) এই তরুণদের প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও জরিপে তাদের সমর্থনের হার ৪.৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তবুও ১০৪টি আসনে প্রার্থী দিয়ে তারা নির্বাচনে একটি গুণগত পরিবর্তনের ডাক দিয়েছে। বিশেষ করে ভোটারের ন্যূনতম বয়স ১৬ বছরে নামিয়ে আনা এবং এক কোটি কর্মসংস্থানের যে প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছে, তা তরুণদের মধ্যে যথেষ্ট কৌতূহল সৃষ্টি করেছে।
আওয়ামী লীগহীন নির্বাচনের শূন্যতা ও চ্যালেঞ্জ
শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও আওয়ামী লীগের নির্বাচনী কার্যক্রম স্থগিত থাকায় এই নির্বাচনের প্রেক্ষাপট জটিল হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগের সেই ১৮.৮০ শতাংশ ভোটার শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেবেন? বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ভোটারদের একটি বড় অংশ হয়তো ভোটদান থেকে বিরত থাকবেন; তবে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক সমীকরণে তাদের একাংশ জামায়াত বা বিএনপির দিকেও ঝুঁকতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক জিল্লুর রহমানের মতে, একটি বড় রাজনৈতিক শক্তিকে বাইরে রেখে নির্বাচন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে তা নিয়ে সংশয় থাকলেও, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি ‘আদর্শ নির্বাচন’ উপহার দিতে বদ্ধপরিকর।
সংস্কারের সনদ ও গণভোটের গুরুত্ব
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভোটাররা কেবল সংসদ সদস্যই নির্বাচন করবেন না, বরং তারা দেশের ভবিষ্যৎ সংবিধানের রূপরেখাও নির্ধারণ করবেন। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের ওপর এই দিনে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। জনমত জরিপ বলছে, প্রায় ৫৯.৫ শতাংশ ভোটার এই সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে, অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে প্রস্তুত। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর বা দুই মেয়াদে সীমাবদ্ধ করা এবং উচ্চকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠনের মতো প্রস্তাবগুলো সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।
ক্ষমতার পাল্লা কার দিকে?
সার্বিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৬ সালের নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এককভাবে ক্ষমতায় যাওয়ার সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ‘দ্য ইকোনমিস্ট’সহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পূর্বাভাস অনুযায়ী, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নিজেকে যেভাবে আধুনিক ও সংস্কারপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করছে, তা সাধারণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে এই সমীকরণটি সরল নয়। জামায়াতে ইসলামীর অভাবনীয় উত্থান এবং তরুণদের নতুন দল এনসিপির উপস্থিতি নির্দেশ করছে যে, কোনো দলের পক্ষেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সহজ হবে না। যদি বিএনপি এককভাবে ১৫১টি আসন পেতে ব্যর্থ হয়, তবে জামায়াত হয়ে উঠতে পারে ক্ষমতার ‘কিংমেকার’। শেষ পর্যন্ত ১২ ফেব্রুয়ারির ব্যালটই বলে দেবে, শহীদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই নতুন বাংলাদেশ কোন পথে হাঁটবে। তবে বিজয়ী যেই হোক না কেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও রাষ্ট্র সংস্কারের অঙ্গীকার রক্ষা করাই হবে আগামী সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।